World Cup 2026: নকআউটে নেদারল্যান্ডস, গ্রুপে তৃতীয় হয়েও আগামীতে উঠতে পারে কোন কোন টিম?
deshersamay

গ্রুপে প্রথম বা দ্বিতীয় হওয়া মানেই নকআউট—এই স্বতঃসিদ্ধ সমীকরণ বদলে দিয়েছে চলতি বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)। এবার ১২টি গ্রুপের মধ্যে সেরা আটটি তৃতীয় স্থানাধিকারী দলও উঠবে শেষ বত্রিশে (Best Third Place Teams)। ফলে গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পরেও বহু দলের ভাগ্য ঝুলে রয়েছে (Round of 32 Qualification)। কারও অপেক্ষা অন্য গ্রুপের ফলাফলের দিকে, কেউ গোলপার্থক্যের হিসাব কষে চলেছে!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের আগে যেই দলগুলো ফেভারিট হিসেবে খেলতে নেমেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম নেদারল্যান্ডস। একবারও বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ডাচরা, তবে এ বার শক্তিশালী দল নিয়ে নেমেছে। আর সেখানে বারবার তাদের শক্তির পরিচয় দিল। গ্রুপ F-এর শেষ ম্যাচে তিউনিশিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টেবলের শীর্ষে থেকেই নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে ডাচরা। তিন ম্যাচে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। রাউন্ড অব ৩২-এ এবার নেদারল্যান্ডসের প্রতিপক্ষ ‘সি’ গ্রুপের রানার্স আপ মরক্কো।

গ্রুপ ‘এফ’-এর ফাইনাল ম্যাচ দুটোকে ছিল শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটেয়। ফলে এই ম্যাচ দুটোকে কেন্দ্র করে ছিল উত্তেজনা। কারণ এই গ্রুপে তিন দলই ছিল দৌড়ে এবং কোনও দলই শেষ ম্যাচের আগে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত জাপান-সুইডেন ম্যাচ ড্র এবং নেদারল্যান্ডস-তিউনিশিয়া ম্যাচ নেদারল্যান্ডস ৩-১ গোল জেতায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে গ্রুপের ফল। এই গ্রুপ থেকে তিনটে দল চলে গিয়েছে পরের পর্বে। নেদারল্যান্ডস, জাপান ও সুইডেন।
কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই তিউনিশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করে নেদারল্যান্ডস। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই আত্মঘাতী গোলে পিছিয়ে পড়ে আফ্রিকার দলটি। এলিয়েস স্কিরির দুর্ভাগ্যজনক গোল ডাচদের এগিয়ে দেয়।
এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফেলে নেদারল্যান্ডস। সপ্তম মিনিটে দুর্দান্ত ফিনিশে টুর্নামেন্টে নিজের তৃতীয় গোল করেন স্ট্রাইকার ব্রায়ান ব্রোবি। এরপরও একের পর এক আক্রমণে তিউনিশিয়ার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে ডাচরা। যদিও প্রথমার্ধে আর গোলের দেখা মেলেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। পিছিয়ে পড়ার পর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিউনিশিয়া। তারই ফল হিসেবে ৫৪ মিনিটে হাজেম মাস্তুরির গোলে ব্যবধান ২-১ হয়। বিশ্বকাপে এবারের আসরে এটিই ছিল তিউনিসিয়ার প্রথম গোল। বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর এই গোলই তাদের কাছে একমাত্র পাওনা।

তবে তিউনিশিয়া চলতি বিশ্বকাপে প্রথম গোল পেয়ে যতটা আনন্দে ছিল সেই আনন্দ খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬২ মিনিটে কর্নার থেকে ইয়ান পল ফন হেক হেড দিয়ে ম্যাচের ফল ৩-১ করে দেন। শেষ পর্যন্ত ৩-১ ব্যবধানেই জয় নিশ্চিত করে ডাচরা।
জাপানের বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল। এর পর শক্তিশালী সুইডেনকে ৫-১ গোলে ওড়ায় তারা। এ বার শেষ ম্যাচে তিউনিশিয়ার বিপক্ষেও ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে অপরাজিত থেকেই নকআউটে পা রাখল ডাচরা। পাশাপাশি তিন ম্যাচে ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম আক্রমণাত্মক দল হিসেবেও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ডাচরা। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে ভারসাম্য—সব মিলিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে তারা যে অন্যতম দাবিদার, গ্রুপ পর্বেই তার স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছে।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে রাউন্ড অব ৩২-এ মরক্কোর মুখোমুখি হবে নেদারল্যান্ডস। ভারতীয় সময় আগামী মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টায় মন্তেরেইয়ে অনুষ্ঠিত হবে সেই ম্যাচ। মরক্কো এ বারের বিশ্বকাপেও সংগঠিত ফুটবল ও দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে নজর কাড়লেও, বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় ডাচরাই এগিয়ে থাকবে।

গ্রুপে তৃতীয় হয়েও ইতোমধ্যে নকআউটে উঠেছে এবং আগামীতে উঠতে পারে কোন কোন টিম?
নিয়ম খুব স্পষ্ট। তৃতীয় হওয়া দলগুলিকে প্রথমে পয়েন্ট, তারপর গোলপার্থক্য, তারপর গোলসংখ্যা, তার পর শৃঙ্খলাভঙ্গের রেকর্ড এবং সবশেষে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সাজানো হবে (World Cup Standings)। সব গ্রুপের খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হবে না।
এখন পর্যন্ত তৃতীয় হয়ে শেষ বত্রিশে জায়গা নিশ্চিত করেছে তিন দল—ইকুয়েডর (Ecuador Football Team), বসনিয়া-হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina) এবং সুইডেন (Sweden Football Team)।
ইকুয়েডর চার পয়েন্ট ও শূন্য গোলপার্থক্য নিয়ে উঠে এসেছে। প্রথমে আইভরি কোস্টের কাছে হার, তারপর কুরাসাওয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র। সেখান থেকে শেষ ম্যাচে জার্মানিকে ২-১ হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তারা। সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ মেক্সিকো। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার ঝুলিতে চার পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১। তারাও শেষ বত্রিশে নিশ্চিত। তাদের সামনে যুক্তরাষ্ট্র। সুইডেনও চার পয়েন্ট ও শূন্য গোলপার্থক্য নিয়ে জায়গা পাকা করেছে। নেদারল্যান্ডসের কাছে ১-৫ হারের ধাক্কা সামলেও শেষ ম্যাচে জাপানের বিরুদ্ধে ১-১ ড্র তাদের টিকিট নিশ্চিত।
সবচেয়ে আলোচনায় দক্ষিণ কোরিয়া। তিন পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১। শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ০-১ পরাজয়ের ফলে সরাসরি ওঠা হয়নি। অধিনায়ক সন হিউং-মিনকে প্রথমার্ধে বেঞ্চে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে কোণঠাসা কোচ। তবু বর্তমান হিসাব বলছে, তাদের নকআউটে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় ৮৩ শতাংশ।
ক্রোয়েশিয়ারও তিন পয়েন্ট ও গোলপার্থক্য -১। এখনও ঘানার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ বাকি। দ্বিতীয় হওয়ার সম্ভাবনা ৪৮ শতাংশ, তৃতীয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ৩৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে শেষ বত্রিশে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯১ শতাংশ।
আলজেরিয়ার তিন পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -২। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ জিতলে সরাসরি দ্বিতীয় হওয়ার সুযোগ থাকবে। তৃতীয় হয়েও ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট। প্যারাগুয়ের অবস্থাও একই রকম। তিন পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -২। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচই ভাগ্যনির্ধারক। দ্বিতীয় হওয়ার সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ। তৃতীয় হয়েও ওঠার সম্ভাবনা ৩৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ।
কেপ ভার্দের মাত্র দুই পয়েন্ট। তবে এখনও দ্বিতীয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ জিতলে ইতিহাস গড়তে পারে আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি। তৃতীয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম, মাত্র ৮ শতাংশ। বেলজিয়ামেরও দুই পয়েন্ট। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ থাকায় দ্বিতীয় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। নকআউটে ওঠার সুযোগ প্রায় ৯০ শতাংশ।
এই বিশ্বকাপের নতুন কাঠামোয় খুব কম দলই শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগেই বিদায় নিশ্চিত করেছে। ৪৮ দলের মধ্যে ৩৬ দল শেষ ম্যাচে অন্তত তাত্ত্বিকভাবে নকআউটে ওঠার সুযোগ নিয়ে নেমেছে। শুধু নিজের গ্রুপের হিসাব করলেই হবে না। অন্য গ্রুপে তৃতীয় হওয়া দল কত পয়েন্ট পেল, গোলপার্থক্য কত, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্কটল্যান্ড বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দলগুলির সমর্থকদের এখন শুধু নিজেদের নয়, অন্য গ্রুপের ম্যাচের দিকেও চোখ রাখতে হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত তৃতীয় হয়ে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত:
ইকুয়েডর — ৪ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য ০
বসনিয়া-হার্জেগোভিনা — ৪ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১
সুইডেন — ৪ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য ০
তৃতীয় হয়ে এখনও অপেক্ষায়:
দক্ষিণ কোরিয়া — ৩ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১
ক্রোয়েশিয়া — ৩ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১ (এক ম্যাচ বাকি)
আলজেরিয়া — ৩ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -২ (এক ম্যাচ বাকি)
প্যারাগুয়ে — ৩ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -২ (এক ম্যাচ বাকি)
কেপ ভার্দে — ২ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য ০ (এক ম্যাচ বাকি)
বেলজিয়াম — ২ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য ০ (এক ম্যাচ বাকি)
ডিআর কঙ্গো — ১ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -১ (এক ম্যাচ বাকি)
সেনেগাল — ০ পয়েন্ট, গোলপার্থক্য -৩ (এক ম্যাচ বাকি)

