

বিধানসভা ভোটের দিনক্ষণ এখনও ঘোষিত হয়নি। তার আগেই কার্যত ভোটের দামামা বাজিয়ে দিল বিজেপি । কলকাতা হাইকোর্ট শর্তসাপেক্ষে ‘ পরিবর্তন যাত্রা’র অনুমতি দেওয়ার পরই সাংবাদিক বৈঠক করে কর্মসূচির বিস্তারিত ঘোষণা করলেন শমীক ভট্টাচার্য , সুকান্ত মজুমদার ও শুভেন্দু অধিকারী । একইসঙ্গে প্রকাশ্যে আনা হয় যাত্রার টিজার।

আর কয়েকদিন পরেই রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে নেমে পড়তে চলেছে এরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি। আর সেই আবহেই রাজ্যে পালাবদল চেয়ে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ করতে চলেছে বঙ্গ বিজেপি। যেখানে এরাজ্যর গেরুয়া শিবিরের বড় নেতারা তো বটেই সামিল হবেন মেজো, সেজো, ছোট নেতারাও। সামিল হতে চলেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রের মন্ত্রীরাও। উত্তর থেকে দক্ষিণ, দুই বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় হওয়া এই উপলক্ষে বিজেপি যে কর্মসূচি পালন করতে চলেছে সেখানে যোগ দেবেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন বঙ্গ বিজেপির প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ। মোট ২৫০টি বিধানসভার উপর দিয়ে যাওয়া এই যাত্রা শেষ হবে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা দিয়ে।

রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে কার্যত কোনও সরকার নেই। তাঁর কথায়, বর্তমান প্রশাসন এক ‘জীবন্ত জীবাশ্ম’-এর মতো। তৃণমূল সরকার রাজ্যের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করেছে, সরকারি চাকরি বাজারে বিক্রি হয়েছে, এমন অভিযোগও তোলেন তিনি। দুর্নীতি এখন শাসকদলের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শমীক।

এই কর্মসূচিকে তিনি সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর আহ্বান, শুধু বিজেপি সমর্থক নয় – তৃণমূলের হতাশ কর্মী, এমনকি বাম ও কংগ্রেসের সমর্থকরাও এই যাত্রায় শামিল হোন।

শুভেন্দু অধিকারী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ‘হৃত গৌরব’ পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য বহু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের পাশাপাশি ধর্মীয় ভারসাম্য বদলে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। দেশজুড়ে ধরা পড়া জঙ্গিদের ভোটার কার্ড এই রাজ্যে তৈরি হয়েছে – এমন অভিযোগও তোলেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় না হলে দেশের রাজনৈতিক লড়াই সম্পূর্ণ হবে না।
সুকান্ত মজুমদারও আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শাসকদলকে নিশানা করেন। তাঁর কথায়, এই যাত্রা কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, পরিবর্তনের দাবিতে মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন। এমনকি ভবানীপুরের মতো এলাকাতেও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ভোট দিতে পারব কিনা, ভোট গণনা সঠিক হবে কিনা – এই সংশয় দূর করতেই যাত্রার উদ্দেশ্য বলে জানান সুকান্ত।
বিজেপি সূত্রে জানা গেছে, যাত্রার সমাপ্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি বৃহৎ সমাবেশ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্য বিজেপি সূত্রে খবর ব্রিগেডে মোদীর সভার জন্য তিনটে দিন পাঠান হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে। মার্চ মাসের ১৩, ১৪ অথবা ১৫ তারিখ এই সভা করতে চাইছে রাজ্য বিজেপি।
এই তিনটে দিনের মধ্যে কোনও একটি দিন পিএমও থেকে জানিয়ে দেওয়া হবে বলেই মনে করছে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। অন্যথায় পিএমও থেকে আলাদা দিনও ঠিক করে দিতে পারে। তবে রাজ্য বিজেপি চাইছে এই পরিবর্তন যাত্রা শেষের (১০ মার্চ) এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ব্রিগেডে সভা করতে।
মোট ৯টি পৃথক যাত্রা আয়োজন করা হয়েছে। ১ ও ২ মার্চ থেকে শুরু হবে এই কর্মসূচি। প্রথম দিনে কোচবিহার দক্ষিণ, কৃষ্ণনগর দক্ষিণ, কুলটি, গড়বেতা ও রায়দিঘি থেকে যাত্রার সূচনা হবে। ২ মার্চ ইসলামপুর, সন্দেশখালি, হাসান এবং আমতা থেকেও আরও চারটি যাত্রা বেরোবে। দোল উৎসবের কারণে ৩ ও ৪ মার্চ কোনও কর্মসূচি রাখা হয়নি। ৫ থেকে ১০ মার্চের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়েছে দল।

বিজেপির লক্ষ্য, প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্য দিয়ে এই যাত্রাকে নিয়ে যাওয়া। কর্মসূচির আওতায় থাকবে ৬০টি বড় জনসভা এবং আনুমানিক ৩০০টি ছোট সভা। বৃহত্তর কলকাতার ২৯টি বিধানসভা এলাকায় আলাদা করে ট্যাবলো বের করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্ট শুক্রবারের নির্দেশে জানিয়েছে, যাত্রায় একসঙ্গে এক হাজারের বেশি মানুষের জমায়েত করা যাবে না। ১ মার্চ থেকে ৬ মার্চের মধ্যে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হবে। শব্দবিধি সংক্রান্ত সমস্ত আইন কঠোরভাবে মানার কথাও জানানো হয়েছে।
বক্তব্য নিয়েও সতর্কতা জারি করেছে আদালত। কোনও রকম কুরুচিকর বা উত্তেজনামূলক মন্তব্য করা যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে – এমন মন্তব্য বা কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। কর্মসূচির জেরে যানজট তৈরি করা যাবে না। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে হবে। পাশাপাশি, অন্তত ২০ জন স্বেচ্ছাসেবকের নাম ও ফোন নম্বর আগে থেকেই পুলিশ প্রশাসনের কাছে জমা দিতে হবে, যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়।
সরকারি, বেসরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনও ক্ষতি করা চলবে না বলেও নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি কোনওভাবে সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়, তার দায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকেই নিতে হবে।
বিজেপি জানিয়েছে ১ মার্চ চারটি এবং ২ মার্চ পাঁচটি কর্মসূচি এই যাত্রা উপলক্ষে গ্রহণ করা হয়েছে। বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে ১ মার্চ কোচবিহারে কেন্দ্রীয় সভাপতির সঙ্গে থাকবেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। কৃষ্ণনগরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে থাকবেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা। গড়বেতায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে থাকবেন শুভেন্দু অধিকারী। কুলটিতে দুই কেন্দ্রীয় নেত্রী আর অন্নপূর্ণা দেবী এবং স্মৃতি ইরানি’র সঙ্গে থাকবেন প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ।
২ মার্চ পাঁচটি কর্মসূচি পালন করা হবে। ইসলামপুরে নীতিন নবীনের সঙ্গে থাকবেন দিলীপ ঘোষ। মথুরাপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-র সঙ্গে থাকবেন সুকান্ত মজুমদার। আমতায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে থাকবেন শমীক ভট্টাচার্য। তারাপীঠে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফরনবীশের সঙ্গে থাকবেন মিঠুন চক্রবর্তী এবং সন্দেশখালিতে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে থাকবেন শুভেন্দু অধিকারী। মোট পাঁচ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে এই যাত্রা।




