রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সই করলেই বদলে যাবে ৭০ বছরের পুরনো আইন। ১৯৫৪ সালের আইনকে সংশোধন করে ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়েছিল ভারত সরকার।
৭০ বছরের পুরনো ওয়াকফ আইন সংশোধনের পথে আরও এক ধাপ এগোল কেন্দ্র। লোকসভার পর রাজ্যসভাতেও পাশ হয়ে গেল ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫’। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১২৮টি, বিপক্ষে ৯৫টি। এখন শুধুই রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের অপেক্ষা, তারপরেই কার্যকর হবে নতুন আইন।
১৯৫৪ সালের ওয়াকফ আইন সংশোধন করে ১৯৯৫ সালে বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। তবে এবারের পরিবর্তন আরও ব্যাপক। বিরোধীদের দাবি, নতুন সংশোধনে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা কার্যত খর্ব করা হয়েছে। দীর্ঘ ১২ ঘণ্টার বিতর্ক শেষে সংসদীয় ও সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বিলটি পেশ করেন। ভোটাভুটির পর মধ্যরাতেই ফল ঘোষণা হয়।

রাজ্যসভায় আলোচনার শুরুতেই রিজিজু বলেন, ওয়াকফ সম্পত্তির মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র, অনাথ শিশু ও মহিলাদের কল্যাণ। অথচ এত সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও আয় হচ্ছে সামান্যই। সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৬ সালে দেশে ৪.৯ লক্ষ ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল, যেখান থেকে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা থাকলেও আদতে আয় হয়েছিল মাত্র ১৬৩ কোটি। ২০১৩ সালে আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হলেও আয় খুব একটা বাড়েনি। নতুন আইন এই ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাবে বলে দাবি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর।
বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে, সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশেষত, বোর্ডে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিরোধীদের দাবি, এটি সংখ্যালঘুদের অধিকার খর্ব করার প্রয়াস। তবে সরকার পক্ষের যুক্তি, যেহেতু ওয়াকফ বোর্ড একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা, তাই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো বজায় রাখাই যুক্তিসঙ্গত।

২২ সদস্যের বোর্ডে সর্বোচ্চ চারজন অমুসলিম সদস্য থাকতে পারবেন, ফলে মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবেন।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়া ওয়াকফ বিলের পক্ষে সওয়াল করেন। সংসদে দীর্ঘ বিরতির পর বক্তৃতা দিতে এসে তিনি বলেন, এই বিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিবদের স্বার্থ রক্ষায় সাহায্য করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই আইন মুসলিম ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করছে না, বরং ওয়াকফ সম্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাপনার পথ প্রশস্ত করবে।
রাজ্যসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। রাজ্যসভার মোট সদস্যসংখ্যা ২৩৬, যেখানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১৯টি ভোট। এনডিএ-র হাতে রয়েছে ১১৭টি আসন। তবে ছয়জন মনোনীত সাংসদ ও দুই নির্দল সাংসদের সমর্থন পেয়ে শেষ পর্যন্ত বিলটি ১২৮-৯৫ ভোটে পাশ হয়ে যায়।
এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলেই এটি আইনে পরিণত হবে। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই আদালতের দারস্থ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ওয়াকফ বোর্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক চলবে আরও কিছুদিন।
১। ওয়াকফ থেকে ট্রাস্টকে পৃথক করা- মুসলিমদের তৈরি কোনও ট্রাস্ট কোনও আইনে ওয়াকফ বলে বিবেচ্য হবে না। ট্রাস্টের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম হবে।

২। ওয়াকফ সম্পত্তি কাকে বিবেচিত হবে- অন্তত পাঁচ বছর মুসলিম ধর্মান্তপ্রাণ ব্যক্তি ওয়াকফকে জমি ও সম্পত্তি দান করতে পারবেন। ২০১৩ সালের আগে আইনে এই বলবৎ ছিল।
৩। মহিলাদের অধিকার- ওয়াকফ ঘোষণার আগে মহিলাদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি দান করে দিতে হবে। এর মধ্যে বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্না এবং অনাথ মহিলাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৪। সরকারি জমি ও ওয়াকফ সম্পত্তি- জেলাশাসকের ঊর্ধ্বে কোনও অফিসার ওয়াকফ সম্পত্তি বিবাদের তদন্ত করতে পারবেন। ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালকে আরও শক্তিশালী করা।

৫। বার্ষিক অনুদানের পরিমাণ কমানো- ওয়াকফ সংস্থার বাধ্যতামূলক অর্থসাহায্যের পরিমাণ বার্ষিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা।
৬। বার্ষিক অডিট সংস্কার- ওয়াকফ সংস্থা যাদের রোজগার এক লক্ষ টাকার বেশি তাদের রাজ্য নির্দিষ্ট অডিটর কর্তৃক অডিট রিপোর্ট তৈরি করা বাধ্যতামূলক হবে।
৭। প্রযুক্তি ও কেন্দ্রীয় পোর্টাল- ওয়াকফ সম্পত্তি নিরূপণে ও বিবাদ-মীমাংসায় একটি কেন্দ্রীয় পোর্টাল গঠন করা হবে। এই পোর্টালে সম্পত্তির একটি অটোমেটেড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গঠন করে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে।৮। দুর্নীতিমুক্ত ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট- মুতাওয়ালিদের সম্পত্তির পরিমাণ ৬ মাসের মধ্যে পোর্টালে নথিভুক্ত করতে হবে।
সরকারের যুক্তি, বর্তমানে যে আইন রয়েছে, তাতে ওয়াকফের দখল করা জমি বা সম্পত্তিতে কোনও ভাবেই পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে না। কারও আপত্তি সত্ত্বেও জমি বা সম্পত্তি দখল করতে পারে ওয়াকফ বোর্ড। বিজেপির দাবি, ওয়াকফ সম্পত্তির সমস্ত সুবিধা ভোগ করছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মুসলিমরা। নতুন আইন কার্যকর হলে সাধারণ মুসলিমরা উপকৃত হবেন।
