‘প্রার্থনা করার জন্য উঠেছিল, তারপরই !হাড়হিম করা ঘটনা… ’ ফ্লাইদুবাইয়ের ককপিটের ভিতরে ঠিক কী হয়েছিল, বললেন ক্যাপ্টেন স্মিত
deshersamay

দুবাই থেকে ইজরায়েলের তেল আবিব যাওয়ার পথে ফ্লাইদুবাই বিমানের ককপিটে যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল, তার বর্ণনা দিয়েছেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার । সঙ্গে থাকা সহ-পাইলট আচমকা তাঁর ওপর মারাত্মক হামলা চালানোয় তিনি ভীষণভাবে আহত হন। তবুও সেই বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে সাহসের সঙ্গে লড়াই করে তিনি ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচান। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার সময় স্মিত জানান, একেবারে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কীভাবে তিনি শেষ চেষ্টাটুকু করেছিলেন।

ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার জানান, বিমানটি স্বাভাবিকভাবেই উড়ছিল । সহ-পাইলট নামাজ পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় স্মিত সম্মান জানিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু ৪-৫ মিনিট পরই আচমকা তাঁর মাথার পেছনে প্রচণ্ড আঘাত আসে। প্রথম আঘাত পাওয়ার পর স্মিত ভেবেছিলেন বিমানে হয়তো বড় ধরনের কোনো যান্ত্রিক বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পরপর আঘাত আসতে থাকায় তিনি বুঝতে পারেন ককপিটে থাকা অন্য ব্যক্তিটিই তাঁর ওপর হামলা চালাচ্ছে।

আঘাতের চোট সামলাতে না পেরে স্মিতের চোখ প্রায় ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। সেই অবস্থাতেই তিনি বুঝতে পারেন বিমানটি খুব দ্রুত নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে। ককপিটের মেঝেময় রক্ত, তার মধ্যেই যাত্রীদের চিৎকার শুনে স্মিত বোঝেন—যে করেই হোক সবাইকে বাঁচানোর এটাই তাঁর শেষ চেষ্টা। গায়ের সবটুকু জোর এক করে তিনি ককপিটের দরজাটি খুলে দেন, যাতে বাইরে তৈরি থাকা যাত্রীরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটকে দিতে পারেন।

ফ্লাইদুবাইয়ের বিজিএম-৭৩৭-৮ (FZ1073) বিমানটিতে ২৭টি শিশুসহ মোট ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন। ৩৪,০০০ ফুট উঁচুতে উড়তে থাকা অবস্থায় বিমানটি আচমকা ১৭,০০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে যায়। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানান, এক ইজরায়েলি যাত্রী ও ক্রু সদস্য ককপিটের ভেতরে ঢুকে জরুরি কুঠার দিয়ে হামলা চালানো ওই সহ-পাইলটকে ধরে ফেলেন। পরে বিমানটিকে ঘুরিয়ে সৌদি আরবের তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদেল আজিজ বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়।

মুম্বইয়ের ঘাটকোপারের বাসিন্দা সাড়ে ৩০ বছর বয়সী স্মিত মাচ্ছারের বাণিজ্যিক বিমান চালানোর ১৩ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্পাইসজেটে এক দশকেরও বেশি সময় কাজ করার পর ২০২২ সালে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। ৯,৫০০ ঘণ্টারও বেশি উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও ফোন করে স্মিতের এই অসাধারণ সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

তদন্তে জানা গেছে, আক্রমণকারী সহ-পাইলট হলেন ওমানের নাগরিক হামাম আল-হামামি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, তদন্তের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এটি একটি ‘জঙ্গি হামলা’র চেষ্টা ছিল। উগ্রপন্থী ভাবধারার কারণে ইতিপূর্বে তাঁকে ওমানে বিমান চালানো থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে মাত্র ৮ মাস আগে কীভাবে তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে চাকরি পেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলার সময় গোটা ঘটনার বিবরণ দেন মচ্ছর। তাঁর সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করে তাঁকে ‘হিরো’ বলেন নেতানিয়াহু। একইসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁকেও ইজরায়েলের পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মান জানানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
কথোপকথনের শেষে মচ্ছরকে বিশেষ সম্মান জানানোর ঘোষণা করেন নেতানিয়াহু। তিনি ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইজরায়েলের পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

নেতানিয়াহু জানান, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সাধারণত ইজরায়েলের নাগরিকদেরই এই সম্মান দেওয়া হয়। তবে মচ্ছরের সাহসিকতার জন্য তাঁকে এই বিশেষ সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘটনার সময় পাওয়া চোট থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট, কয়েক মিনিটের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন তিনি।
