আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারংবার দাবি করে আসছেন যে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাত তিনি থামিয়েছেন। ট্রাম্পের এও বক্তব্য ছিল, পরমাণু যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি চলে যাচ্ছিল, তিনি বাণিজ্যের কথা বলে তা সামলেছেন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আগেই এই দাবি খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার এই নিয়ে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও । তিনিও স্পষ্টত জানালেন, তৃতীয় কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ ছিল না।
মঙ্গলবার সংসদে সিঁদুর অভিযান প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই জানান, ”তৃতীয় কোনও দেশ ভারতকে যুদ্ধ থামাতে বলেনি।” তবে আমেরিকার তরফে যে তাঁকে ফোন করা হয়েছিল, সেটা বলেন মোদী। শুধু তাই নয়, দু-পক্ষের কী কথা হয়েছে তাও খোলসা করেন।
মোদী অবগত করেন, ”৯ মে রাতে আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। বেশ কয়েকবার ফোন করলেও আমি সেনার সঙ্গে বৈঠকে থাকায় তাঁর ফোন ধরতে পারিনি। পরে আমি নিজে ফোন করি। তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, পাকিস্তান বড় হামলা করতে চলেছে। সেটা শুনে আমার জবাব ছিল, যদি ওদের এই ইচ্ছা থাকে, তা হলে ফল ভুগতে হবে।”
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যে স্পষ্ট, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সেই মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি নিয়ে তাঁর কোনও কথা হয়নি। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, সংসদের ভাষণ থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি বার্তা দিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।
সোমবারই সংসদে এই প্রসঙ্গে মুখ খুলেছিলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে ভারত-আমেরিকা সেভাবে কোনও আলোচনাই হয়নি বলে জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এও স্পষ্ট করেন, পরবর্তী সময়ও আলোচনায় বাণিজ্যের কোনও ভূমিকা ছিল না। লোকসভায় বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বক্তব্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতবারই দাবি করুন না কেন যে তিনি বাণিজ্যচাপে ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ থামিয়েছেন, বাস্তবে তার কোনও ভিত্তি নেই।
জয়শঙ্কর এও বলেন, ২২ এপ্রিল (পহেলগাম হামলার দিন) থেকে ১৭ জুন (ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার দিন) পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে কোনও ফোনালাপই হয়নি। তাঁর কথায়, ‘শুধু ১০ মে আমরা একটা ফোন পাই। জানানো হয়েছিল, পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতিতে রাজি। আমরা বলেছিলাম, ডিজিএমও চ্যানেলে এ কথা বলতে হবে পাকিস্তানকে।’
এদিন পাকিস্তানের ফোন নিয়ে সংসদে বিস্তারিত জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ”৯ মে মধ্যরাত থেকে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তানের কোণে কোণে হামলা করেছে। তারপরই ডিজিএমওকে ফোন করে পাকিস্তান বলে, ‘ব্যাস থামাও, অনেক মেরেছো। আর সহ্য করতে পারছি না।”’ পাকিস্তানের তরফে পরমাণু হামলার হুঁশিয়ারি এসেছিল বলেও এদিন জানান প্রধানমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে পাক সেনাকে কার্যত খোঁচা দিয়ে তিনি এও বলেন, পাকিস্তানের বায়ুসেনাঘাঁটিতে বড় ক্ষতি হয়েছে। এখনও কয়েকটি এয়ারবেস আইসিইউতে রয়েছে! পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দেন, অপারেশন সিঁদুর এখনও চলছে। পাকিস্তান যদি আবার এমন কিছু হামলার ছক কষে, তাহলে কড়া জবাব পাবে।
গত ২২ এপ্রিল জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার (Pahalgam Attack) ঘটনা ঘটেছিল। তারপর পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংসের জন্য ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযান (Operation Sindoor) করেছিল ভারতীয় সেনা (Indian Army)। সেই অভিযান নিয়ে মঙ্গলবার সংসদে (Parliament) বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। বলেন, ”এমন হামলা করেছি যে কেউ কখনও ভাবতেও পারেনি।”
ভারতীয় সেনাকে প্রশংসায় ভরিয়ে নরেন্দ্র মোদী বলেন, ”১০০ শতাংশ সফল হয়েছে সেনা। যে ভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেভাবেই হামলা করা হয়েছে। এমন এমন জায়গায় হামলা হয়েছে যেখানে আগে কেউ ঢোকার কল্পনা পর্যন্ত করেনি।” মোদীর আরও সংযোজন, ”জঙ্গি আক্রমণ আগেও হয়েছে দেশে। সে সময় জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে নিশ্চিন্ত থাকত। কারণ জানত, পাল্টা আক্রমণ হবে না। বরং তারা পরবর্তী হামলার প্রস্তুতি নিত। আর এখন, জঙ্গিরা ঠিক মতো ঘুমোতে পারে না। কারণ জানে, ভারত আসবে, পাল্টা মেরে চলে যাবে।”
পাকিস্তানের তরফে পরমাণু হামলার হুঁশিয়ারি এসেছিল বলেও এদিন জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ”পরমাণু হুমকি এসেছিল। ৬ মে রাত এবং ৭ মে সকালে ভারত যা স্থির করেছিল, তা করে। পাকিস্তান কিছু করতে পারেনি। পাকিস্তানের কোণে কোণে জঙ্গিদের আড্ডা ধ্বংস করা হয়েছে।” এই প্রসঙ্গে পাক সেনাকে কার্যত খোঁচা দিয়ে তিনি এও বলেন, পাকিস্তানের বায়ুসেনাঘাঁটিতে বড় ক্ষতি হয়েছে। এখনও কয়েকটি এয়ারবেস আইসিইউতে রয়েছে! পাশাপাশি এটাও মনে করিয়ে দেন, অপারেশন সিঁদুর এখনও চলছে। পাকিস্তান যদি আবার এমন কিছু হামলার ছক কষে, তাহলে কড়া জবাব পাবে।
সেনার অভিযান সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, আত্মনির্ভর ভারতকে দুনিয়া চিনেছে। তাঁর বক্তব্য, ”মাত্র তিনটি ছাড়া পৃথিবীর কোনও দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযানে ভারতকে আটকায়নি। অন্যদিকে পাকিস্তান বুঝে গেছে, ভারতের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র কী করতে পারে।” এই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর সাফ কথা, ভারত কী করবে তার লক্ষ্য ঠিক ছিল। সেটাই হয়েছে।
সংসদের বক্তব্য থেকে পাকিস্তানের উদ্দেশেও কড়া বার্তা দেন নরেন্দ্র মোদী। স্পষ্টত বলেন – ভারত হামলা হলে নিজের মতো করে, নিজের শর্তে, নিজের সময়ে জবাব দিয়ে ছাড়ব। কোনও পরমাণু অস্ত্র দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করা চলবে না। ভারত ঝুঁকবে না।



