Desher Samay
প্রচ্ছদকলকাতাজেলাপশ্চিমবঙ্গউত্তরবঙ্গদেশবাংলাদেশআন্তর্জাতিকই-পেপারফটো গ্যালারিসম্পাদকের পছন্দসরাসরিইউটিউব

Nayak-Uttam Kumar  স্মরণে মহানায়ক: আজও যাঁর হাসিতে প্রেমে পড়ে বাঙালি, উত্তম কুমার নিজেই নিজের প্রতিচ্ছবি : গোপাল শেঠ

deshersamay

Share article:

দেশের সময় : বনগাঁ নীলদর্পণ অডিটোরিয়াম হলে মহানায়ক উত্তম কুমারের স্মৃতিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উত্তম কুমারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পুরসভার চেয়ারম্যান গোপাল শেঠ বলেন, “উত্তম কুমার আমাদের দেশের, জাতির গর্ব। উনি প্রত্যেকটা গানে লিপ দিতেন, আর হাসিটা ওনার সৌন্দর্য ।

ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে পুরপ্রধান বলেন, ‘আমাদের বনগাঁয় অনেকগুলো সিনেমা হল ছিল,বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম উত্তম কুমারের প্রায় ছবি সে সব সিনেমা হলে দেখেছি ।উত্তম কুমার নিজেই নিজের প্রতিচ্ছবি ।ছোটবেলায় শোনা সেই গানগুলো আজও ঠোঁটস্থ। কারণ, স্বর্ণযুগের বাংলা গানের বাজার কিন্তু কখনও ফুরবে না। তখনকার বাংলা গানের মাধুর্য্য, সংস্কৃতি, সুর এখনও অনবদ্য। তাই এদিনের অনুষ্ঠানে সেই সব পুরনো দিনের গান ও  ছবির বিশেষ বিশেষ অংশ দিয়ে সাজিয়ে  মহানায়ক সম্মান জানানো হয়।

উত্তম কুমারের ‘নায়ক’ হয়ে ওঠার যাত্রাটা সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয়। ১৯৫১ সালে জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক পত্রিকা অচলপত্র-তে প্রকাশিত হয় একটি কার্টুন—‘বেঙ্গলের হিরো’। সেখানে একটি হাঁটতে থাকা শিশুর মুখে ছিল এক নবাগত অভিনেতার চেহারা, যিনি প্রেমিকার গলায় ঝুলে বলছেন, “ডার্লিং, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” সেই মুখটি ছিল উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়ের—তখন মাত্র ২৫ বছরের এক অচেনা যুবক। ক্যালকাটা পোর্ট কমিশনার অফিসের কেরানি তিনি, রাতদিন ছুটছেন সিনেমায় ঘাঁটি খুঁজতে। পাশে ছিল না কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, সামনে ছিল না সম্ভাবনার আলো।

ফলাফল? ব্যর্থতা আর বিদ্রূপ।
কিন্তু মাত্র ছ’বছর পর চিত্রটাই পালটে যায়। ১৯৫৭ সালে মুক্তি পায় ‘হারানো সুর’—এক রোমান্টিক মেলোড্রামা, যার গল্পের সূত্র Random Harvest থেকে। ছবিটি বিশাল জনপ্রিয়তা পায়, এবং জাতীয় পুরস্কারও জেতে। পুরস্কার নিতে উত্তমকে দিল্লি যেতে হবে শুনে হাওড়া স্টেশন জড়ো হয়ে যায় হাজার-হাজার অনুরাগী। এমন ভিড় যে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। স্টেশনের উল্টো গেট দিয়ে তাঁকে প্রবেশ করিয়ে ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়, আর চারদিকে শুধু একটাই নাম ধ্বনিত হচ্ছিল—উত্তম কুমার।

স্মৃতির পাতায় আজও জ্বলজ্বলে তাঁর মুখ। একটাই নাম—উত্তম কুমার। বাংলা সিনেমার মহারাজ, যাঁর একঝলক হাসি, সংলাপের ভঙ্গি, রোমান্স, কোটি-কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল গাঁথা হয়ে আছে। আজ, তিনি নেই। প্রয়াণ দিবস আজই। কিন্তু কী আশ্চর্য, মনে হয় তিনি যেন কোথাও যাননি। বরং প্রতিটি দৃশ্যে, প্রতিটি গানে, প্রতিটি ভালোবাসার কথায় তিনি আজও বর্তমান। আজকের দিনে ফিরে দেখা যাক উত্তম কুমারের জীবনের কিছু কম আলোচিত, অথচ গভীর আবেগমথিত অধ্যায়।

১৯৫৪ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর অনবদ্য রসায়ন দেখে গোটা বাংলা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছবির পোস্টারে লেখা ছিল, ‘অগ্নিপরীক্ষা আমাদের চিরন্তন প্রেমের সাক্ষী।’ সেই পোস্টার ঘিরেই একসময় গুঞ্জন শুরু—উত্তমের স্ত্রী গৌরীদেবী ও সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ এই প্রচারে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এই পোস্টার আবার নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছিল উত্তম-সুচিত্রা জুটিকে ঘিরে সেই রহস্যময় প্রেমগল্পের।

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী’ ছিল উত্তম কুমারের কেরিয়ারের এক মোড় ঘোরানো ছবি। সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা থেকে নেওয়া এই কাহিনি ছিল বিদেশি অ্যান্টনির বাংলার প্রতি ভালোবাসার গল্প। লোকগান ও বাঙালিয়ানা তাঁকে এতটাই আপন করে তোলে যে তিনি নিজের জীবনটাই উৎসর্গ করেন এই মাটিকে। কিন্তু সমাজের কুপ্রথা তাঁর ভালোবাসাকে ঠেকাতে পারে না—বরং তার নিষ্ঠুর পরিণতি হয় তাঁর স্ত্রী নিরুপমার মৃত্যুতে। এই ছবির গান, অভিনয় এবং মর্মস্পর্শী গল্প আজও দর্শকের চোখে জল এনে দেয়। কিন্তু সমাজের কুপ্রথা তাঁর ভালোবাসাকে ঠেকাতে পারে না—বরং তার নিষ্ঠুর পরিণতি হয় তাঁর স্ত্রী নিরুপমার মৃত্যুতে। এই ছবির গান, অভিনয় এবং মর্মস্পর্শী গল্প আজও দর্শকের চোখে জল এনে দেয়।

‘দেয়া নেয়া’তে তনুজার সঙ্গে উত্তমের জুটি মন জয় করেছিল বাঙালির। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই ছবির প্রযোজক ও সুরকার ছিলেন কিংবদন্তি শ্যামল মিত্র। প্রেম, কৌতুক ও সংগীতে ভরা এই ছবি আজও এক ক্লাসিক প্রেমের কাহিনি।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে উত্তমের প্রথম কাজ ছিল ‘নায়ক’। কিন্তু এই সম্পর্ক শুরু হওয়ার বহু আগেই রায় তাঁকে ‘ঘরে বাইরে’ ছবির জন্য ভাবেন। সন্দীপ চরিত্রে তাঁকে কাস্ট করার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু নেতিবাচক মনে হওয়ায় উত্তম সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। যদিও পরবর্তীতে পরিচালক-মহানায়কের যুগলবন্দি বাঙালিকে উপহার দেয় শিল্পের এক অমূল্য রত্ন!

‘সপ্তপদী’ ছবিটি এক ভিন্ন ধর্মের প্রেমের গল্প হলেও, তার ব্যাকস্টোরি ছিল বেদনাদায়ক। বলা হয়, তখন ইন্ডাস্ট্রির একাংশ সুচিত্রা সেনকে বোঝাতে চেয়েছিল যে উত্তমের পাশে তিনি ম্লান হয়ে যাবেন। কিন্তু এসবের চেষ্টার পরেও দু’জন একসঙ্গে কাজ করেন, আর ছবিটি হয়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের এক রত্নভাণ্ডার।

‘সাথীহারা’ ছবির গানে কাজ করতে এসে সরোজ খান উত্তম কুমারের অসুস্থতার কারণে তাঁকে দেখতে পাননি। সেই আফসোস তিনি জীবনের শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যান। উত্তম কুমারের উপস্থিতি যে কীভাবে জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারত, সেই হাহাকার আজও রয়ে যায় বলিউডের বিখ্যাত কোরিওগ্রাফারের স্মৃতিতে।

‘মেমসাহেব’ ছবিতে অপর্ণা সেনের সঙ্গে উত্তমের রসায়ন ছিল অনবদ্য। একজন রাজনৈতিক সাংবাদিক ও একজন তরুণী অধ্যাপিকার ভালবাসার গল্প, যার পরিণতিতে আসে হতাশা। প্রেম আর সময়ের সংঘাতে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোর হাহাকার যেন আজও কানে বাজে।

‘হার মানা হার’ ছবির শুটিং চলাকালীন চন্ডিপুরে সুচিত্রা ও উত্তমের নাচের দৃশ্যের সময় এক মজার মুহূর্ত তৈরি হয়। সুচিত্রা হাসতে হাসতে সুপ্রিয়া দেবীকে জিজ্ঞেস করেন, “তুই কি হিংসে করছিস?” জবাবে সুপ্রিয়া বলেন, “এই দৃশ্য তো বহুবার পর্দায় দেখেছি, এখন স্বাভাবিক লাগে।” কত সহজ আর হৃদয় ছোঁয়া বন্ধুত্ব ছিল দুই তারকাদের মধ্যে!

উত্তম কুমার শুধু অভিনয় করেননি, তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তিনি ম্যাজিক, এক আবেগের অন্য নাম। তাঁর চলে যাওয়া কোনও অধ্যায়ের শেষ নয়, বরং একটি চিরন্তন আলোয় মিশে যাওয়া। উত্তম কুমার নেই, কিন্তু তাঁর ছায়া জীবনের প্রতিটি ফ্রেমে রয়ে গিয়েছে।  তিনি আজও বেঁচে আছেন ভালোবাসায়, গানের কথায়, চোখের জলে, আর সেই সিলভার স্ক্রিনে যা কোনওদিন নিভে যাবে না। কারণ উত্তম কুমার শুধু এক অভিনেতা ছিলেন না—তিনি ছিলেন, আছেন, এবং থাকবেন বাঙালির চিরন্তন প্রেমকাব্যে।

Tags: News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Home Search Gallery
Menu
© 2026 Desher Samay.