

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ভারতের পণ্যের উপর শুল্ক চাপানোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, কিংবা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চিনা পণ্য দেশীয় বাজারে ঝড় তুলছে— তখন দু’জনকেই কার্যত বার্তা দিয়ে স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

রবিবাসরীয় বিকেলে জাতির উদ্দেশে ভাষণে ফের একবার আত্মনির্ভর ভারতের মন্ত্র উচ্চারণ করলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “আমাদের দোকানপাট সাজুক স্বদেশি পণ্যে। গর্ব করে বলুন, আমি স্বদেশি কিনি, আমি স্বদেশি বিক্রি করি। ভারতে উৎপাদিত যখন বিশ্বসেরা হয়ে উঠবে, তখনই প্রকৃত উন্নতি হবে দেশের।”
তবে তাঁর বক্তৃতা শেষ হতে না হতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? ২০১৪ সালে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। তার পর দশ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে আমেরিকাকে তোয়াজ করে চলতে। ভারত-চিন বাণিজ্য ঘাটতি যে আজ ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তাও হয়েছে মোদীর শাসনকালেই। ফলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অনেকেই বলছেন, ট্রাম্পের দাদাগিরির মুখে পড়ে এ হল নেতিবাচক পরিস্থিতিকে ঘোরানোর চেষ্টা। জাতীয়তাবাদ দিয়ে কূটনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকার প্রয়াস।

প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান অনেকের মনেই ফিরিয়ে এনেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই সময়কে, যখন স্বদেশি আন্দোলন হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক বড় অস্ত্র। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল বার্তা ছিল— বিদেশি পণ্য বর্জন করো, দেশীয় পণ্য ব্যবহার করো। সেসময়ে দেশজুড়ে বিদেশি কাপড় পোড়ানো, ইংরেজি পণ্যের দোকান বর্জন, দেশীয় তাঁতের কাপড় বা হস্তশিল্প ব্যবহারের প্রচার দেখা গিয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বাল গঙ্গাধর তিলক, অরবিন্দ ঘোষ-সহ বহু নেতা সেই সময় মানুষকে স্বদেশি শিল্প ও উৎপাদনকে সমর্থন করার ডাক দিয়েছিলেন। শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, এই আন্দোলন সাধারণ মানুষকে আত্মমর্যাদার বার্তাও দিয়েছিল। মোদীর স্বদেশি আন্দোলনের ডাক তাই কৌশলগত বলেই অনেকের মত।

বস্তত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে যে নতুন হারে জিএসটি লাগু হতে চলেছে সেই ঘোষণা নতুন নয়। এদিন প্রকারান্তরে তার রাজনৈতিক কৃতিত্ব দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতির উদ্দেশে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জিএসটি সাশ্রয় উৎসব শুরু হয়ে যাবে। এই সাশ্রয় উৎসবে আপনার সাশ্রয় বাড়বে। পণ্য কেনায় সুরাহা হবে। গরিব, মহিলা, ব্যবসায়ী, দোকানদার, নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক ফায়দা হবে। তার মানে উৎসবের এই মরশুমে সবার মুখ মিষ্টি হবে। দেশের কোটি কোটি জনতাকে নেক্সট জেনারেশন জিএসটি রিফর্মের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছি”।
তাঁর কথায়, তিনি ক্ষমতায় আসার আগে দেশে টোল আর ট্যাক্সের জঞ্জাল ছিল। একশো রকমের কর ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পাঠাতে গেলে হাজারো ফর্ম ফিল আপ করতে হত বা কর দিতে হত। তাই ক্ষমতায় এসেই পণ্য পরিষেবা কর তথা জিএসটি-কে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। সব রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীন ভারতে সবচেয়ে বড় সংস্কার সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “সংস্কার একটা অনবরত প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন বদলায়। তখন নেক্সট জেনারেশন রিফর্ম দরকার হয়। জিএসটি ব্যবস্থায় এখন স্রেফ ৫ ও ১৮ শতাংশ স্ল্যাব রয়েছে। তার মানে রোজকারের দরকারি পণ্য আরও সস্তা হবে। ব্রাশ, পেস্ট, সাবান, স্বাস্থ্য বিমা সহ পণ্য ও বহু পরিষেবা এখন সস্তা হবে বা কর মুক্ত হবে।”
সার্বিক এই সাশ্রয়কে ডবল বোনানজা বলে আখ্যা দিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, “এ বছর ব্যক্তিগত আয়করে ছাড় আর জিএসটি সংস্কারের ফলে সাধারণ মানুষের আড়াই লক্ষ কোটি টাকার সাশ্রয় হবে। তাই তো বলছি এটা হল সাশ্রয়ের উৎসব।”
এর পরেই স্বদেশি আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “বহু বিদেশি পণ্য আমাদের রোজকারের জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেছে। আমাদের এর থেকে মুক্তি পেতে হবে। আমাদের সেই জিনিস কিনতে হবে যাতে আমাদের দেশের মানুষের শ্রম রয়েছে। ঘাম রয়েছে। সব দোকানকে স্বদেশিতে সাজাতে হবে। গর্বের সঙ্গে বলুন আমি স্বদেশি কিনি, আমি স্বদেশি বিক্রি করি। যখন এটা হবে, তখন দেশের উন্নতিও দ্রুত হবে”। দেশের সব রাজ্যকে স্বদেশি পণ্য উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তোলারও আহ্বাণ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানালেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
জিএসটি নিয়ে ফের প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে তিনি দাবি করলেন, কেন্দ্রের কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই। কেন্দ্র-রাজ্য রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই ফের তীব্র হল বিতর্ক।
জিএসটি-তে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও কনট্রিবিউশন নেই ভাষণ দেওয়া ছাড়া। যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লীর পুজো উদ্বোধনে গিয়ে বললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার থেকেই নতুন জিএসটি লাগু হচ্ছে দেশজুড়ে।
একদিকে যখন প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে অর্থ সাশ্রয় উৎসবের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, অন্যদিকে তখন দুর্গাপুজো উদ্বোধনে ব্যস্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর কান এড়িয়ে যায়নি প্রধানমন্ত্রীর কথা। তিনি সেই সূত্র ধরেই গেরুয়া শিবির ও কেন্দ্রকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেন, ‘জিএসটি নিয়ে কেউ কেউ ভাষণ দিচ্ছেন, আমি একটাই কথা বলছি, ইন্সুরেন্স থেকে জিএসটি কমানো, এটা নিয়ে প্রথম আমিই কথা বলি। এর জন্য ক্রেডিট আমাদের, ভাষণ দিচ্ছে অন্য কেউ। লোকসান আমাদের হচ্ছে, কখনও সাইকেল দিই, ট্যাব দিই, কত কী দিই রাজ্যবাসীকে। তাও আমরা বলেছি, বিমার টাকা যেন না বাড়ে, শুধু এটার জন্য আমাদের লোকসান হচ্ছে ৯০০ কোটি টাকা।’
চার ধাপের বদলে জিএসটি দুধাপ হওয়ায় মেডিক্লেম-সহ একাধিক খরচ বাঁচবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও কনট্রিবিউশন নেই এক্ষেত্রে। টাকাটা কেটেছে রাজ্যের জিএসটি থেকে। বদলে ক্ষতিপূরণ মেলেনি। টাকাও আসেনি। তৃণমূল সুপ্রিমোর অভিযোগ, এমন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর সঙ্গে হলে মোটেও পরিস্থিতি এমন হত না। তারা নাকি ঘুরিয়ে ঠিক টাকা পেয়ে যেত।

সম্প্রতি একাধিক বিষয়ে রাজ্যে কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল এসেছে, সেই বিষয়টিকেও এদিন কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘এখানে টিকটিক দৌড়ালেও একাধিক কমিটি চলে আসে। এদের চোখে ন্যাবা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে কিছু হলে দেখতে পায় না। ন্যাবা মানে ডন্ডিস, এদেরও হয়েছে তাই। আমাদের রাজ্যবাসী যে বেনিফিট পাবে তার জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা আমাদের লস হচ্ছে। এটা স্টেটের জিএসটি, সেন্ট্রালের নয়।’
সকলকে পুজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে আবারও মনে করিয়ে দেন, কেন্দ্র কীভাবে বিভিন্ন সুবিধা থেকে বাংলাকে বঞ্চিত রেখেছে। বলেন, ‘মানুষের ভাল হলে খুশি হই আমি। কিন্তু আমাদের টাকাগুলো দাও। আমাদের তো টাকা পয়সা মাসের হিসাব থাকে। গুছিয়ে করতে হয়। সংসার থেকে যদি সব টাকাই কেটে নেওয়া হয়, তাহলে কী হবে। কাটল টাকা আমাদের, প্রচার করছে ওরা।’
মুখ্যমন্ত্রী সত্যি বলেন তাই বিরোধী শিবিরের অনেকেই তাঁকে পছন্দ করেন না বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। ওঠে বাঙালিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের প্রসঙ্গও।



