মমতার হাত থেকে ‘জোড়াফুল’চলে গেল,তৃণমূলের প্রতীক ফ্রিজ় করল কমিশন ,আর ফিরে পাবেন কি!
deshersamay

কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৯৮ সালে পৃথক দল গঠন করেছিলেন তিনি। নিচুতলার এক ঝাঁক তরুণ কংগ্রেসি নেতার মনে লড়াইয়ের তেজ বপন করে নাম দিয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস। ২৯ বছর পর সেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকই হাতছাড়া গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। চাকরি বিক্রি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, আরজি কর কাণ্ড যার উপর্যুপরি ঘটনায় বিরক্ত বাংলার গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ তাঁর সরকারকে ছুড়ে ফেলার মাত্র চার মাসের মধ্যে বড় ধাক্কা খেল কালীঘাট।

বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মমতা বা অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন কোনও শিবিরই ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি সরাসরি ব্যবহার করতে পারবে না। ব্যবহার করতে পারবে না দলের সংরক্ষিত জোড়াফুল প্রতীকও।
এটি অবশ্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ। চূড়ান্ত রায় নয়। তবে এই অন্তর্বর্তী নির্দেশই বড় প্রশ্ন তুলে দিল আদৌ কি আর কখনও জোড়াফুল ফিরে পাবেন মমতা? নাকি প্রতীক হারিয়ে তাঁরও অবস্থা উদ্ধব ঠাকরের মতোই হবে।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, নির্বাচনী প্রতীক নির্দেশিকার ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোন গোষ্ঠী প্রকৃত তৃণমূল, তা নির্ধারণের পরে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কমিশনই। সেই রায়ে কমিশন চাইলে কোনও শিবিরকেই মূল দল হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে প্রতীক চিরতরে ফ্রিজ রাখার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।

১৭ সেপ্টেম্বর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধুর বেঞ্চ ১৪ পাতার অন্তর্বর্তী আদেশটি দিয়েছে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী—
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটি সরাসরি ব্যবহার করতে পারবে না।

অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরও ওই নাম ব্যবহার করতে পারবে না।
কোনও শিবিরই তৃণমূলের সংরক্ষিত ‘ফুল ও ঘাস’ বা জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।
দুই শিবির নিজেদের জন্য আলাদা নাম বেছে নিতে পারবে। চাইলে সেই নামের সঙ্গে মূল দল তৃণমূল কংগ্রেসের যোগসূত্র উল্লেখ করা যেতে পারে।
উপনির্বাচনে দুই গোষ্ঠীকে পৃথক মুক্ত প্রতীক বরাদ্দ করা হবে।
কমিশন দুই শিবিরকেই ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টার মধ্যে সম্ভাব্য তিনটি নাম এবং পছন্দের তিনটি মুক্ত প্রতীকের তালিকা জমা দিতে বলেছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তালিকাটি দিতে হবে। সেখান থেকে একটি নাম ও একটি প্রতীক অনুমোদন করতে পারে কমিশন।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্র এবং অসমের নগাঁও লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের মনোনয়ন ঘিরেই সমস্যাটি জরুরি হয়ে ওঠে। রেজিনগরে একই দলের প্রার্থী হিসেবে দু’জন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। অরূপ রায়ের স্বাক্ষরিত ‘ফর্ম বি’ নিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন সফিউজ্জামান শেখ। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদন নিয়ে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন রবিউল আলম চৌধুরী।
নন্দীগ্রামেও একই পরিস্থিতি। অরূপ রায়ের অনুমোদিত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন এহতেশমুল হক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত ‘ফর্ম বি’ নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন সঞ্চিতা প্রধান দে। অসমের নগাঁও লোকসভা কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদিত তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন আব্দুল সালাম।
একই দলের নাম ও প্রতীক দাবি করে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দেওয়ায় রিটার্নিং অফিসারদের সামনে জটিলতা তৈরি হয়। কার ‘ফর্ম বি’ বৈধ এবং কে তৃণমূলের সরকারি প্রার্থী—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রতীক-বিরোধের পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষ করার মতো পর্যাপ্ত সময় কমিশনের হাতে ছিল না। উপনির্বাচনের মনোনয়ন, যাচাই, প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দের নির্দিষ্ট আইনি সময়সীমা রয়েছে। তাই দুই পক্ষকে আপাতত সমান জায়গায় রাখতে দলের নাম ও প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, তাদের সামনে থাকা সমস্ত তথ্য ও নথি বিবেচনা করে স্পষ্ট হয়েছে যে, অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী রয়েছে। একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যটির নেতৃত্বে অরূপ রায়। দুই পক্ষই নিজেদের প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস বলে দাবি করছে।
অরূপ রায় শিবিরের হয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে গোটা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরাই প্রথম দাবি করেছিলেন, পুরনো জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেওয়া সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কোনও বৈধতা নেই।
গত ২২ জুন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে জানান, তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মেয়াদ উত্তীর্ণ কর্মসমিতির নামে পরবর্তী সময়ে করা নিয়োগ বা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বৈধ নয় বলে তিনি দাবি করেন।
ঋতব্রতের বক্তব্য ছিল, দলের সাংগঠনিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে ২২ জুন কলকাতার একটি হোটেলে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। সেই অধিবেশনে অরূপ রায়কে তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করা হয়। কমিশনের কাছে বৈঠকের কার্যবিবরণী, নতুন পদাধিকারীদের তালিকা এবং অরূপ রায়ের নমুনা স্বাক্ষরও জমা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনকে জানান, ঋতব্রতদের দাবি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং দলের সংবিধানের পরিপন্থী। অরূপ রায়ের নির্বাচন এবং ওই বিশেষ অধিবেশনের কোনও সাংগঠনিক বৈধতা নেই বলেও তাঁর শিবির দাবি করে।
মমতা শিবিরের বক্তব্য, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন কমিটি ও পদাধিকারীদের মেয়াদ পাঁচ বছর। ২০২২ সালে সাংগঠনিক নির্বাচন হয়েছিল এবং পরবর্তী নির্বাচন ২০২৭ সালে হওয়ার কথা। ফলে জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালে শেষ হয়ে গিয়েছে বলে ঋতব্রতদের দাবি ঠিক নয়।
এর পর গত ১২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন আলাদাভাবে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে। অরূপ রায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে ছিলেন অরূপ রায়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং আমন ঝা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে কমিশনে যান কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাগরিকা ঘোষ, সাকেত গোখলে, ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং তাঁদের আইনজীবী।
১৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক শুনানিও হয়। প্রথমে অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির এবং পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনে কমিশন। মমতা শিবিরের শুনানিতে মহুয়া মৈত্রও উপস্থিত ছিলেন। দুই পক্ষই দলীয় সংবিধান, সাংগঠনিক নির্বাচন, জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ এবং বিভিন্ন আদালতের রায়ের নথি কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সামনে মূলত তিনটি পথ খোলা রয়েছে।
প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের সামনে সাংগঠনিক ও পরিষদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিস্তারিত প্রমাণ পেশ করে জোড়াফুল ফিরে পাওয়ার দাবি আরও শক্তিশালী করা। যা কার্যত কঠিন বললেও কম বলা হবে।
দ্বিতীয়ত, কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা। তবে আদালত সাধারণত নির্বাচন চলাকালীন কমিশনের প্রতীক সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে কতটা হস্তক্ষেপ করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তৃতীয়ত, বর্তমান উপনির্বাচনে কমিশনের নির্দেশ মেনে নতুন অস্থায়ী নাম ও মুক্ত প্রতীক নিয়ে লড়াই করা এবং একই সঙ্গে মূল মামলায় নিজেদের দাবি চালিয়ে যাওয়া।
চুম্বকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হল, আপাতত জোড়াফুল হারালেন মমতা। আদৌ তিনি কি প্রমাণ করতে পারে যে তারাই প্রকৃত তৃণমূল, সে প্রশ্নও ঝুলে রইল।
