নেতাজি ইন্ডোরে তৃণমূলের সভা থেকে ছত্রে ছত্রে বিজেপিকে বিঁধলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার বদনাম করার জন্য বিজেপি বারবার এজেন্সি পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ মমতার। সব ঠিক থাকলে সামনের বছরেই বিধানসভা নির্বাচন। এ দিন মমতার তোপ, ‘নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এজেন্সির তৎপরতা বাড়বে। সব মিডিয়াকে কন্ট্রোল করে। সবাইকে ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়।’
বরাবরই মমতা অভিযোগ করে এসেছেন, নির্বাচনের আগে তৃণমূলকে টার্গেট করা হয় এজেন্সি দিয়ে। এ দিনও সেই অভিযোগ করে মমতা বলেন, ‘ইলেকশন এলেই মনে পড়ে তৃণমূলের চার্জশিট দিতে হবে। তৃণমূলের কাকে কাকে চোর বলা হবে। কাকে কাকে জেলে ঢোকানো হবে।’
তবে এর সঙ্গেই বিজেপির আয়ু নিয়েও সাফ ভবিষ্যবাণী করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার তোপ, ‘২০২৭-২৯-এর মধ্যে বিজেপির ক্ষমতা শেষ। আর ২-৩ বছর আয়ু আছে। তারপরে আর নেই। এর মধ্যেই ওরা বাংলাকে টার্গেট করবে।’
এ দিন সভা থেকে মমতা স্পষ্ট বার্তা দেন কর্মীদের কী কী করতে হবে। সবার আগে ভোটার লিস্ট যাচাই করার জন্য বুথস্তরের কর্মীদের ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। ভোটার তালিকায় কারচুপি ধরার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এখন থেকেই সেই কাজ করতে হবে, ৩ দিন পরপর দলীয় অফিসে তথ্য দিতে হবে। তার পরে সাত দিনের মধ্যে একটি কোর কমিটি করে দেওয়া হবে। রাজ্যস্তরে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজ দেখভালের জন্য রাজ্যস্তরে একটি কমিটি গড়ে দিয়েছেন মমতা।
সুব্রত বক্সির নেতৃত্বে ওই কমিটিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, সুজিত বসু, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরবাহা হাঁসদা, সায়নী ঘোষ, তৃণাঙ্কুর, দেবাংশু-সহ আরও অনেকে রয়েছেন।
নেতাজি ইন্ডোরের সভা থেকে কার্যত আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজিয়ে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বক্তব্যের ছত্রে ছত্রে বিজেপিকে বিঁধে ভোটার তালিকা নিয়ে তৃণমূল কর্মীদের সতর্ক করলেন দলনেত্রী। বৃহস্পতিবার নেতাজি ইন্ডোরের সভায় মমতার নিশানায় ছিল ভারতের নির্বাচন কমিশনও। বাংলায় ভোটে জেতার জন্য নির্বাচন কমিশন এবং আরও কিছু এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে এই রাজ্যের ভোটার তালিকায় ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের নাম ঢোকানো হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।
ভোটার তালিকায় গরমিল করেই দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে বিজেপি জিতেছে বলেও ইঙ্গিত মমতার। তিনি এ দিন বলেন, ‘দিল্লি পারেনি, মহারাষ্ট্র পারেনি, বাংলায় আমরা ধরব, জবাব দেবো।’ মঞ্চ থেকেই বেশ কিছু নথি সামনে এনে ভোটার তালিকায় গরমিলের অভিযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার ভোটারদের এপিক নম্বরে গুজরাট বা হরিয়ানার বাসিন্দা কোনও ব্যক্তির নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সদ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার বেছে নেওয়া হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ নিয়েও তোপ দেগেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘সদ্য ইলেকশন কমিশনার কে হয়েছে জানেন? মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যিনি মাননীয় সচিব ছিলেন, তাঁকেই চিফ ইলেকশন কমিশনার করেছেন। সব বিজেপির লোক দিয়ে ভরা। এই নির্বাচন কমিশন যত দিন নিরপেক্ষ না হবে তত দিন বদনাম থেকে যাবে।’
দিল্লি, মহারাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে এনে মমতার অভিযোগ, ভোটারদের কার্ডে রদবদল করে বাংলার ভোটে ভিন রাজ্য থেকে লোক নিয়ে এসে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বক্তব্য রাখার সময়ে, মুর্শিদাবাদের রানিনগরের এক বাসিন্দা সইদুল ইসলামের নাম তোলেন তিনি। তাঁর যে এপিক নম্বর রয়েছে, তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে হরিয়ানার কোনও এক সনিয়া দেবীর নাম। রানিনগরেরই আরও এক বাসিন্দা মহম্মদ আলি হোসেন, তাঁর এপিক নম্বরের সঙ্গেও একই কাণ্ড করা হয়েছে বলে উদাহরণ দেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, স্যাম্পল সার্ভে করে যা নথি হাতে এসেছে, তা চমকে দেওয়ার মতো। একই এপিক নম্বরে বাংলার ভোটারের জায়গায় বহু ক্ষেত্রে হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও বিহারের নাম ঢোকানো হয়েছে বলে অভিযোগ। আর এই কাজের পিছনে কিছু এআরও এবং ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের দিকে আঙুল তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘ডেটা অপারেটরদের উপর লক্ষ্য রাখুন। অনেক জায়গায় কিছু মিষ্টির প্যাকেট গিয়েছে। সবাই খারাপ এ কথা বলব না। যাঁরা এই কাজ করেছেন তাঁদের হাতেনাতে ধরব। কিন্তু তার জন্য আমার নথি-প্রমাণ চাই।’
এই সূত্র টেনেই দলের কর্মীদের ভোটার তালিকা যাচাই করার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। জেলাস্তরে এই ভোটার তালিকা যাচাই করার জন্য ডেডলাইনও বেঁধে দিয়েছেন। শুধু নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি। তার সঙ্গেই কমিটিও গড়ে দিয়েছেন। গোটা রাজ্যে ভোটার তালিকা নিয়ে সমস্যা হলে তা যদি জেলাস্তরে সমাধান না করা যায়, তা হলে বলতে হবে রাজ্যস্তরের ওই কমিটিকে। কমিটির মাথায় রাখা হয়েছে সুব্রত বক্সিকে। এ ছাড়াও কমিটিতে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজিত বসু, মলয় ঘটক, পার্থ ভৌমিক, ডেরেক ও’ব্রায়েন, অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, দেবাংশু ভট্টাচার্য, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূলের একঝাঁক প্রবীণ ও নবীন নেতা।
২০২৬-এ ভোট। আসনের টার্গেট বেঁধে দিলেন দলনেত্রী। বুঝিয়ে দিলেন দলকে ভাঙতে হবে দলেরই রেকর্ড। ২০২১-এর ২১৪-এর গণ্ডি টপকে অন্তত পেতে হবেই ২১৫ আসন। বেশি হোক, কম নয় কোনওমতেই। কর্মীরা কী করবেন, কী করবেন না, পয়েন্ট করে বুঝিয়ে দিলেন। একেবারে পরীক্ষার আগে শিক্ষক যেমন দেন ‘টিপস’, দলনেত্রী একেবারে এক ভঙ্গিতে নেতাজি ইনডোরে ক্লাস নিলেন দলীয় কর্মীদের।
কানাঘুষো ছিল, আইপ্যাক নিয়ে দলের মধ্যে অসন্তোষ। ভোটের আগে ভোটকৌশলী দল নিয়ে বার্তা দিলেন মমতা। বললেন পিকে-র আইপ্যাক এটা নয়। এটা নতুন টিম। এদের সঙ্গে কাজ করতে হবে, কাজে সহযোগিতা করতে হবে। এই দলের নামে অযথা উলটোপালটা কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ সতর্ক করলেন বেফাঁস নেতাদের।
তৃণমূলের দলনেত্রী বললেন, ‘মাথায় রাখবেন এটা বাংলা দখল করার খেলা। বহিরাগতদের বাংলা দখল করতে দেবেন না।‘ বৃহস্পতির বৈঠক থেকেই সমস্যার সমাধানের পথ বাতলে দিলেন মমতা। কীভাবে এই কারচুপির বিরুদ্ধে কাজ করবে দল? কাজ করতে হবে বুথের কর্মীদের। সরেজমিনে কাজ করতে হবে জোরকদমে। জেলায় জেলায় তৈরি হবে কোর কমিটি। কমিটি কাজ করবে ভোটার তালিকা নিয়ে। তিনদিন পর পর তথ্য দিতে হবে তৃণমূল ভবনে।
দলীয় কর্মী, কাউন্সিলর, জেলা সভাপতি থেকে সর্বস্তরের কর্মী, যাঁরা কাজে ফাঁকি দেন বলে খবর, এদিন তাঁদের সতর্ক করেন দলনেত্রী। সাফ বললেন, ‘মানুষ কাকে ভাল বলছে, কাকে খারাপ বলছে সব খবর রাখি।‘ ভাল কাজের গুরুত্ব রয়েছে দলে, বুঝিয়ে দিলেন তাও। পদে থেকে কাজ করতে হবে মানুষের জন্য। অন্যথায় হারাতে পারেন পদও, ভোটের আগে সতর্ক করলেন সেই বিষয়েও।
মমতা বললেন, ‘এই ভোট বিজেপি সিপিএম-এর জামানত জব্দ করার ভোট।‘
এলাকায় কে আসছে, না আসছে নজর রাখতে হবে দলীয় কর্মীদের। এলাকায় যাতে কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা না ঘটে, নজর রাখতে হবে সেদিকে, দলনেত্রীর বার্তা দলীয় কর্মীদের।সংগঠন আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলায় তৃণমূল সরকার হ্যাটট্রিক করেছে ইতিমধ্যে। তিনবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে মমতা। এই মুহূর্তে টার্গেট আরও একদফা ভোটে জয়। তার প্রস্তুতি যে দল শুরু করে দিয়েছে, বৃহস্পতিবারের সভা তারই প্রমাণ।