আর্জেন্টিনা –  (৩) (মেসি-২, ডি মারিয়া)  ফ্রান্স –  (৩) (এমবাপে-হ্যাটট্রিক)

দেশের সময় ওয়েবডেস্কঃ বিশ্বকাপ মেসির। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। অবশেষে মারাদোনাকে ছুঁলেন মেসি। রবিবাসরীয় রাতে দোহার লুসেইল স্টেডিয়ামে ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতল আর্জেন্টিনা।

গঞ্জালো মন্টিয়েল টাইব্রেকারে চতুর্থ শটে গোল করতেই মাঠের হাফ সার্কেলে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন মেসি। দু’হাত শূন্যে। চারদিকে তাঁকে ঘিরে পারেদেজ, আকুনা, মার্টিনেজরা।‌ অবশেষে স্বপ্নপূরণ। আট বছর আগের সেই রাতটা হয়তো স্বয়ং মেসিরও মনে পড়ে যাচ্ছিল। ব্রাজিলের মারাকানায় জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্ন চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সেবার  গোল্ডেন বল নিতে মঞ্চে ওঠার সময় বিশ্বকাপের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন মেসি। এদিন সোনার বল নিয়ে মঞ্চ ছাড়ার আগে স্ট্যান্ডে রাখা বিশ্বকাপে চুম্বন শতাব্দীর অন্যতম সেরা ফুটবলারের। কাতার বিশ্বকাপের সেরা মুহূর্ত এটাই। তার আগে অবশ্য শিশুর মতো উৎসবে মাতেন লিও। জেতার পর গ্যালারির সামনে গিয়ে দলের বাকি সতীর্থদের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে গান গাইলেন মেসি।

টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন মেসি, ডিবালা, পারেদেজ এবং মন্টিয়েল। ফ্রান্সের গোলদাতা এমবাপে এবং কোলোমুয়ানি। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ। রোমাঞ্চকর। রোম খাড়া করে দেওয়া ফাইনাল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ফাইনাল বললে ভুল হবে না। আর্জেন্টিনা দু’বার এগিয়েও অতিরিক্ত সময়ের শেষে ৩-৩। এককথায় অবিশ্বাস্য! নাটক, রহস্যে মোড়া ফাইনাল। ৯০ মিনিটের শেষে ২-২। অতিরিক্ত সময়ের শেষে ৩-৩। শেষমেষ টাইব্রেকারে ৪-২। ভাগ্যের জোরে জিতলেন মেসি। নির্ধারিত সময় আর্জেন্টিনার হয়ে জোড়া গোল করেন লিও। অন্য গোল অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার। হ্যাটট্রিক করেন কিলিয়ান এমবাপে। কাতার বিশ্বকাপে মোট আট গোল। দুই মহাতারকার দ্বৈরথে হয়তো মেসিকে ছাপিয়ে গেলেন ফরাসি প্লেমেকার। কিন্তু শেষ হাসি হাসলেন মেসি। ব্যাক টু ব্যাক বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিলকে ছোঁয়া হল না ফ্রান্সের। রানার্স হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল রাশিয়া বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নদের।

মাঠে আর্জেন্টাইন তারকাকে অলআউট যেতে দেখা নতুন নয়। কিন্তু আবেগের লাভাস্রোতে বইতে সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু বিশ্বকাপ জেতার পর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। আবেগের বিস্ফোরণেও অলআউট মেসি। সতীর্থ, কোচ, কোচিং স্টাফদের আলিঙ্গনের পর পরিবারের লোকজনের সঙ্গে আবেগ ভাগ করে নিলেন সদ্য বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক। জড়িয়ে ধরলেন স্ত্রী আন্তনেলাকে। তিন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কোলে তুলে নেন মেসি। মায়ের সঙ্গে আদরের আলিঙ্গন ক্যামেরাবন্দী হল। বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার হলেন মেসি।  সাতটি গোল করার পাশাপাশি তিনটে অ্যাসিস্ট।‌ ২০১৪ সালের পর দ্বিতীয়বার জিতলেন সোনার বল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দু’বার এই প্রথম।

আট গোল করে গোল্ডেন বুট পান এমবাপে। গোল্ডেন গ্লাভস এমিলিয়ানো মার্টিনেজের। উঠতি তারকা এনজো ফার্নান্দেজ। এদিন মেসি আরও একবার দেখালেন, বয়সের ভারে ধার কমেনি।

গতি কমলেও রক্ষণ চেরা পাস দেওয়ার জুড়ি নেই তাঁর। ফাইনালে প্রথম গোল করলেন পেনাল্টি থেকে। দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রে মুভটা শুরু হয়েছিল তাঁর পা থেকেই। তৃতীয় গোল নিজেই করলেন। তারপর টাইব্রেকারে প্রথম শটে আবার গোল করেন। বিশ্বকাপ ফাইনাল মেসিময়। বেশ কয়েকবার রক্ষণে নেমে দলকে বাঁচাতেও দেখা যায় আর্জেন্টিনার অধিনায়ককে। একেবারে যথার্থ নেতা।

একমাত্র পোল্যান্ড ম্যাচ ছাড়া কাতারে সব ম্যাচেই গোল করেছেন। সেদিন পেনাল্টি মিস না করলে সেই আক্ষেপও থাকত না। বিশ্বকাপ জয়ের পর অবশ্য সেই নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই মেসির। মঞ্চে ফিফা সভাপতির হাত থেকে বিশ্বকাপ নেওয়ার আগে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। যেন আর তর সইছে না। হবে নাই বা কেন! এর আগে চারবার বিশ্বকাপের আসর থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল। কিন্তু এবার ঈশ্বর দু’হাত ভরিয়ে দিলেন। বিশ্বকাপের পাশাপাশি গোল্ডেন বলেরও মালিক মেসি। মাথা উঁচু করে বিশ্বকাপকে বিদায় জানালেন আর্জেন্টাইন তারকা। নিশ্চয়ই স্বর্গ থেকে এককালীন ছাত্রের কীর্তি স্থাপন দেখলেন মারাদোনা। 

উল্লেখ্য, শেষবার ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ জিতেছিল অ্যালবিসিলেস্তেরা। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে ফুটবল দেবতা সহায় হলেন। ১৮৭৮, ১৯৮৬ এর পর আবার ২০২২। আরও একবার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিলেন মেসি। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা। কিন্তু বিশ্বকাপ না পেলে ফুটবল জীবন অপূর্ণ থাকত। মারাদোনার সঙ্গে তুলনায় কোথাও একটা পিছিয়ে থাকতেন। কিন্তু সেটা হল না। মেসির শেষ বিশ্বকাপে পোয়েটিক জাস্টিস। শেষ দশবারের মধ্যে বিশ্বকাপের ফাইনালে এগিয়ে যাওয়া দল ন’বার জিতেছে। সেই ট্রেন্ড বহাল থাকল। তবে ভাঙল গোল্ডেন বলের মিথ। শেষ ২০ বছর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের কোনও ফুটবলার সোনার বল পায়নি। এবার সেই ধারা বদলাল। কাতার বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল পেলেন লিওনেল মেসি।‌‌ বিশ্বকাপে একমাত্র ফুটবলার হিসেবে দু’বার এই শিরোপা পেলেন। রবি রাতে দশ মিনিটের খেল। তাতেই বদলে গিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য। মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের মধ্যে জোড়া গোল এমবাপের। ৮০ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে পিছিয়ে থাকার পর নব্বই মিনিটের শেষে ২-২। কিলিয়ান এমবাপের দৌলতে। অতিরিক্ত সময়ের ১০৯ মিনিটে মেসি ম্যাজিকে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তখন মনে হয়েছিল বিশ্বকাপ মেসিরই।‌ কিন্তু নাটক আরও বাকি ছিল। ১১৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে আবার সমতা ফেরান এমবাপে। ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। প্রথম শটে গোল করেন এমবাপে এবং মেসি। নেদারল্যান্ডস ম্যাচের পর আবার নায়ক আর্জেন্টাইন গোলকিপার। কোম্যানের দ্বিতীয় শট বাঁচিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

তৃতীয় শট বাইরে মারেন তোউচামেনি। সেখানেই গড়ে যায় বিশ্বকাপের ভাগ্য। অতিরিক্ত সময়ের অন্তিমলগ্নে ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে ম্যাচ শেষ করে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন কোলোমুয়ানি।‌ কিন্তু দুর্দান্ত সেভ মার্টিনেজের। দলকে টাইব্রেকার পর্যন্ত নিয়ে যান আর্জেন্টিনার গোলকিপার।

প্রথমার্ধে দাঁড়াতেই পারেনি ফ্রান্স। বল পজেশন থেকে পাসিং, সবেতেই আধিপত্য ছিল আর্জেন্টিনার। বল ধরতেই পারছিলেন না এমবাপে, গ্রিজম্যান, জিরুরা।‌ একেবারে ব্যাকফুটে চলে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। গাঢ় নীল জার্সি ছাড়া খেলা দেখে বোঝা দায় ছিল যে ফ্রান্স খেলছে। জঘন্য ফুটবল দেশঁ দলের। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে দু’বার গোলে শট নেন জুলিয়ান আলভারেজ। ম্যাচের ১৭ মিনিটে পোস্টের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দেন ডি মারিয়া। ফ্রান্সের একটা মাত্র হাফ চান্স ২০ মিনিটে। গ্রিজম্যানের ফ্রিকিক থেকে জিরুর হেড বক্সের ওপর দিয়ে যায়। প্রথমার্ধের বাকি সময়টা পুরোই আর্জেন্টিনার। ম্যাচের ২৩ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের মধ্যে ডি মারিয়াকে ফাউল করেন ডেম্বেলে। পেনাল্টি দিতে দেরী করেননি রেফারি। স্পট কিক থেকে কাতার বিশ্বকাপে নিজের ছ’নম্বর গোল করেন মেসি। কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে সেলিব্রেট করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ভিআইপি বক্সে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠতে দেখা যায় মেসির স্ত্রী আন্তনেলা রকুজোকে। এরপরও ফ্রান্সের খেলা দেখে মনে হয়নি তাঁরা ম্যাচে ফিরতে পারবে। এমবাপেকে বোতলবন্দী করে রাখেন মোলিনা, ডি পলরা।‌ পুরোপুরি একপেশে খেলা হচ্ছিল। ৩৬ মিনিটে আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন ডি মারিয়া। কাউন্টার অ্যাটাকে গোল। মেসির ফ্লিক থেকে বল পান অ্যালিয়েস্টার।‌ ডান দিক দিয়ে উঠে ডি মারিয়াকে বল বাড়ান। বাঁ পায়ের শটে বল জালে রাখেন আর্জেন্টাইন তারকা।

১৯৫৪ সালে ফাইনালে শেষবার বিরতির আগে দুই গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ওয়েস্ট জার্মানি। ম্যাচে তাঁরাই জিতেছিল। এবারও তেমনই প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে প্রথমার্ধে আর্জেন্টাইনদের দাপটে যেখানে ম্যাচ থেকে উবে গিয়েছিল ফরাসিরা। ম্যাচের ৪১ মিনিটে জিরু এবং ডেম্বেলেকে তুলে থুরাম ও কোলোমুয়ানিকে নামান দিদিয়ের দেশঁ‌। তাতেও ভাগ্য ফেরেনি। বিরতির পরও দাপট ছিল অ্যালবিসিলেস্তেদের। ৮০ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে পিছিয়ে ছিল ফ্রান্স। শেষ দশ মিনিটে এমবাপে ম্যাজিকে ম্যাচে ফেরে ফরাসিরা। ৭৯ মিনিটে কোলোমুয়ানিকে বক্সের মধ্যে ফাউল করেন ওটামেন্ডি। পেনাল্টি দেন রেফারি। ৮০ মিনিটে ২-১ করেন এমবাপে। তার ৯৭ সেকেন্ডের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে ২-২। ম্যাচের ৮১ মিনিটে কোম্যান হয়ে থুরামের পাস থেকে চলন্ত বলে ডান পায়ের ভলিতে অনবদ্য গোল ফরাসি তারকার। এক্সট্রা টাইমে ৩-৩। প্রথমে আবার আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন মেসি। আবার সমতা ফেরান এমবাপে। এরপরও দুই দলই গোলের সুযোগ পেয়েছিল। ম্যাচটা ১২০ মিনিটেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল টাইব্রেকারে জয়। অপেক্ষা বাড়লেও স্বপ্নপূরণ হল লিওনেল মেসির। একেবারে রূপকথার সমাপ্তি। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here