এনসিপি-তে তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ, ‘বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি নয়’, ‘বিদ্রোহী’দের বৈঠকের মাঝেই স্পিকারকে চিঠি অভিষেকের
deshersamay


দিল্লিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদেরা বৈঠকে বসেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে জল্পনা, এই বৈঠকের পরেই তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদেরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাড়িতে গিয়ে আলাদা ব্লক গড়ার সই করা চিঠি দিয়ে আসবেন। তার মাঝেই প্রকাশ্যে এল স্পিকার বিড়লাকে দেওয়া তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি। যে চিঠিতে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদের আর্জি, দলের কোনও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে যেন স্বীকৃতি না দেওয়া হয়!

হবে হবে করছিল, জল্পনা সত্যি করে হলও তাই। লোকসভায় আলাদা সংসদীয় দল বা ব্লক গড়ার ক্ষেত্রে যে সমস্ত আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে, তা এড়াতে ‘ন্যাশনলিস্ট সিটিজেন পার্টি’র সঙ্গে মিশে গেলেন তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ।
সূত্রের খবর, এই নতুন দলের মূল রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র বা ফোকাস হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরা। সূত্রে খবর, এই দলে যোগ দিলেও বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ-কেই সমর্থন করবেন বিদ্রোহীরা তৃণমূল সাংসদরা।
ত্রিপুরার রাজনৈতিক মহলে খুব একটা পরিচিত নাম নয় ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (এনসিপিআই)।

এমনকি রাজ্যের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছেও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো বা নেতৃত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য নেই।
তবে ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে এই দলের উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ধলাই জেলার চৌমানু এবং উনকোটি জেলার কৈলাসহর—এই দুই কেন্দ্রে এনসিপিআই প্রার্থী দেয়। যদিও নির্বাচনী লড়াইয়ে দলটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি। দুই কেন্দ্র মিলিয়ে তাদের প্রার্থীরা মোট ৮২২টি ভোট পান, যা মোট ভোটের মাত্র ০.০৩ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বর্তমানে একটি অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

রবিবার দিল্লিতে এই রাজনৈতিক তৎপরতা এক নজিরবিহীন মাত্রা পায়। এদিন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বাসভবনে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সরকারি বাসভবনে গিয়ে হাজির হন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাসভবনে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে হাজির ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, অরূপ চক্রবর্তী, সায়নী ঘোষ, মালা রায়, বাপি হালদার এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও চমকপ্রদ বিষয় হল, সেখানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিজেপির প্রভাবশালী লোকসভা সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। ফলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিজেপির অন্দরের বোঝাপড়া যে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে জোড়াফুলের চরম বিপর্যয়ের পর থেকেই তৃণমূলের মধ্যে যে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল, রবিবারের এই ঘটনা তাকে কার্যত বিস্ফোরণের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। গত কয়েকদিনে একের পর এক সাংসদ প্রকাশ্যেই দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁরা দিল্লির মোদী সরকারকে সমর্থন করার ব্যাপারেও মনস্থির করে ফেলেছেন।
এর আগে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে লোকসভায় আলাদা সংসদীয় গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল এই শিবির। গত শুক্রবার ১৯ জন তৃণমূল সাংসদের সই সংবলিত একটি গোপন নথি প্রকাশ্যে আসতেই লোকসভায় ঘাসফুল শিবিরের বড়সড় ভাঙনের জল্পনা সিলমোহর পায়।
রবিবার সকালে কাকলি বিমানবন্দরেই দাবি করেছিলেন, তাঁদের শিবিরে আরও দু’জন সাংসদ যোগ দিয়েছেন, যার ফলে লোকসভায় বিদ্রোহীদের মোট সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ২২। কিন্তু নতুন কোন দু’জন পা বাড়িয়ে রয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি বিক্ষুব্ধ সাংসদ।

অন্যদিকে, রবিবার ভূপেন্দ্রর বাড়িতে বিদ্রোহীদের বৈঠকের মাঝে তৃণমূলের আর সাংসদ কীর্তি আজ়াদ এবং রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষও চলে যান স্পিকারের বাড়িতে। তাঁরা স্পিকারের কাছে আর্জি জানান, যেন বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি না দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, তাঁরা অভিষেকের চিঠি (চিঠিটি ১০ জুনের) নিয়েই স্পিকারের বাড়িতে যান। পরে বাইরে বেরিয়ে কীর্তি-সাগরিকা জানান, স্পিকার বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মান্যতা দিলে আইনি লড়াই হবে।
সাগরিকা বলেন, ‘এই ভাবে আলাদা গোষ্ঠী তৈরির পদক্ষেপ অসাংবিধানিক এবং বেআইনি।’ কীর্তিও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনও বিভাজন হতে পারে না। মহারাষ্ট্র সংক্রান্ত মামলায় দেওয়া রায়েও স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, এই ধরনের বিভাজন বেআইনি। আমরা মূলত এই বিষয়েই একটি চিঠি জমা দিতে এবং লোকসভার স্পিকারকে সাংবিধানিক কাঠামো ও আইনি বিধান মেনে কাজ করার আহ্বান জানাতে এখানে এসেছি।’
প্রকাশ্যে আসা অভিষেকের চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘তৃণমূল একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল। লোকসভায় যে সংসদীয় দল রয়েছে, সেটিও মূল রাজনৈতিক দলের উপরেই নির্ভরশীল এবং তা ওই রাজনৈতিক দলেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনত তৃণমূল একটিই। একইভাবে একজন করেই লোকসভার দলনেতা এবং এক হুইপ আছেন। তাঁরা সকলেই মূল রাজনৈতিক দল এবং তার সাংগঠনিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে নিজ নিজ পদে থাকেন। সাংসদেরা কখনও একই দলের মধ্যে নিজেদের ইচ্ছামতো কোনও সমান্তরাল গোষ্ঠী তৈরি করে লোকসভায় পৃথক স্বীকৃতির দাবি করতে পারেন না।’
তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন নিয়ে নানা জল্পনার মধ্যেই শনিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পরেই মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে যায়, বিদ্রোহী শিবিরে তিনিও যুক্ত হচ্ছেন। সেই সঙ্গেই বিদ্রোহীদের সূত্র মারফত খবর মেলে, রবিবার কেন্দ্রীয় ভূপেন্দ্রর বাড়িতে আবার বৈঠকে বসতে পারেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদেরা।
সেই মতোই রবিবার দুপুর সেই বৈঠক হয় ভূপেন্দ্রর বাড়িতে। সূত্রের দাবি, সেখানে বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেও রয়েছেন। রবিবার সুদীপ স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, ‘অধিকাংশ সাংসদ এবং বিধায়ক চেয়েছিলেন, এই উদ্যোগটি সফল হোক। তাঁরা চেয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ মোতাবেকই দল পরিচালিত হোক। সেখানে উনিই মুখ্য উপদেষ্টা এবং দলনেত্রীর মতো ভূমিকা পালন করবেন। তাঁদের এই আবেদন আমাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করেছে। তাই, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি তাঁদের সঙ্গেই থাকব।’ জাতীয় রাজনীতিতে জল্পনা, শেষমেশ যদি বিদ্রোহীরা লোকসভায় আলাদা ব্লক তৈরি করতে সক্ষম হন, সে ক্ষেত্রে সেই ব্লকের নেতা হতে পারেন সুদীপ।

রবিবার বিদ্রোহীদের বৈঠকের একটি ছবিও প্রকাশ্যে এসেছে। তাতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, দেব, পার্থ ভৌমিক, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, জগদীশচন্দ্র বসুনিয়া, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, মালা রায়, শর্মিলা সরকার, মিতালি বাগ, বাপি হালদার, ইউসূফ পাঠান, জুন মালিয়া, সায়নী ঘোষ এবং কালীপদ সোরেনকে দেখা যাচ্ছে।
