

খসড়া তালিকায় নাম না থাকলেও, নতুন করে ফর্ম ৬ আবেদন করা যাবে। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত যে তালিকা বেরোবে, সেখানে তাঁদের নাম নথিভুক্ত করা হবে। তবে এখানেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। তাহলে মতুয়ারা কি নো ম্যাপিংয়ের আওতায় পড়বেন? ২০০২ সালে তাঁরা কীসের লিঙ্ক দেখাবেন?

রাজ্যে শুরু হচ্ছে ভোটার-শুনানি! আজ শনিবার থেকেই ‘ম্যাপিং’-এ বাদ পড়া ভোটারদের শুনানি শুরু করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন। ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে যে ভোটারদের কোনও ‘ম্যাপিং’ করা যায়নি, সেই ৩১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৪২৪ জন শুনানির প্রথম পর্বে ডাক পাবেন। ইতিমধ্যে শুনানির নোটিসও হাতে পেয়ে গিয়েছেন তাঁরা।
বড়় সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের। মতুয়াদের জন্য বড় খবর। গ্রাহ্য হবে CAA সার্টিফিকেট জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবে একটি বিষয়, CAA সার্টিফিকেট তখনই গ্রাহ্য হবে, যখন নতুন করে ফর্ম ৬ পূরণ করে আবেদন করবেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই খসড়া তালিকা বেরিয়ে গিয়েছে। মতুয়াদের মধ্যে অনেকেই CAA-তে আবেদন করে নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট পেয়েছেন। কমিশনের তরফে থেকে যে নথিগুলি চাওয়া হয়েছে, সেই তালিকায় নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট নেই। এই সার্টিফিকেটটা নেওয়া হবে কিনা, তা নিয়ে ধন্দ ছিল। সেটা কমিশন স্পষ্ট করেছে।

পাশাপাশি, খসড়া তালিকায় নাম না থাকলেও, নতুন করে ফর্ম ৬ আবেদন করা যাবে। পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত যে তালিকা বেরোবে, সেখানে তাঁদের নাম নথিভুক্ত করা হবে। তবে এখানেও একটি প্রশ্ন রয়েছে। তাহলে মতুয়ারা কি নো ম্যাপিংয়ের আওতায় পড়বেন? ২০০২ সালে তাঁরা কীসের লিঙ্ক দেখাবেন? কমিশনের তরফ থেকে সেই বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। যেহেতু এই নাগরিকত্বের সার্টিফিকেটে সম্পূর্ণ তথ্য থাকবে, মতুয়ারা ম্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে সেই লিঙ্কটাই দিতে পারেন। অর্থাৎ অনলাইন ফর্ম ফিলাপের ক্ষেত্রে এখন এই সার্টিফিকেটও গ্রাহ্য হল।
এ বিষয়ে তৃণমূল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর বলেন, “নির্বাচন কমিশন তো বলছে না ১১ টা নথি লাগবে না। সার্টিফিকেট গ্রাহ্য হবে সেটা বলছে, কিন্তু আধার কার্ডকে কেন মানছে না?”

যদিও বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ইতিমধ্যেই ৭০ হাজার মানুষ CAA-তে আবেদন করেছেন, তাঁদের সার্টিফিকেটও ইস্যু হয়েছে। তাঁদের ভোটার তালিকায় নাম থাকবে। বাংলাদেশি হিন্দু শরনার্থীদের জন্য বিজেপিই রয়েছে।”
আজ শনিবার থেকে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে শুরু হচ্ছে শুনানি-পর্ব। প্রতিটি কেন্দ্রে দুই বা তার বেশি শুনানিকেন্দ্র থাকবে। থাকবে ১১টি করে শুনানির টেবিল। কমিশন সূত্রে খবর, প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে একজন নির্বাচনী আধিকারিক (ইআরও) এবং ১০ জন সহকারী নির্বাচনী আধিকারিক (এইআরও) থাকবেন। এই ইআরও এবং এইআরও-দের হাতেই রয়েছে ভোটারদের শুনানির মূল দায়িত্ব। এ ছাড়াও, ১১ জন মাইক্রো অবজ়ার্ভার গোটা প্রক্রিয়ার নজরদারির দায়িত্বে থাকবেন।
এনুমারেশন ফর্ম কী ভাবে যাচাই করতে হবে, শুনানির জন্য ভোটারেরা যে নথিগুলি জমা দিচ্ছেন, তা কী ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে— সে সব বিষয় বুধবারই চার হাজারেরও বেশি মাইক্রো অবজ়ার্ভারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এঁরা ছাড়াও বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও) এবং অনুমতি সাপেক্ষে বিএলও সুপারভাইজ়ার শুনানিতে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া বাইরের কেউ শুনানিতে থাকতে পারবেন না। প্রতিটি টেবিলে ১০০ থেকে ১৫০ জন ভোটারের শুনানির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কমিশন। প্রক্রিয়া চলাকালীন সব ভোটারের ছবি তোলা হবে। সেই ছবি পাঠানো হবে কমিশনকে।
শুনানি পর্বে প্রামাণ্য নথি হিসাবে কমিশন ১৩টি নথির কথা আগেই উল্লেখ করেছে। গ্রহণযোগ্য নথির তালিকায় রয়েছে কেন্দ্রীয় অথবা রাজ্য সরকারের কর্মী হিসাবে কাজ করেছেন অথবা পেনশন পান এমন পরিচয়পত্র, ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস, এলআইসি, স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া যে কোনও নথি, জন্ম শংসাপত্র, পাসপোর্ট, মাধ্যমিক বা তার অধিক কোনও শিক্ষাগত শংসাপত্র, রাজ্য সরকারের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দেওয়া বাসস্থানের শংসাপত্র, ফরেস্ট রাইট সার্টিফিকেট, জাতিগত শংসাপত্র, কোনও নাগরিকের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার, স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া পারিবারিক রেজিস্ট্রার এবং জমি অথবা বাড়ির দলিল।
এর মধ্যে যে কোনও একটি নথি দিতে হবে। তবে প্রয়োজনে একাধিক নথিও দেখাতে হতে পারে ‘নো-ম্যাপিং’ বা ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় থাকা ভোটারকে। এ ছাড়াও, কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, সিএএ শংসাপত্র দেখালে ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করা যাবে। ফর্ম-৬ পূরণ করে আবেদন করতে হবে।

ভোটার তালিকার বিশেষ ও নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর প্রথম পর্বে এনুমারেশন ফর্ম পূরণ করেছিলেন ভোটারেরা। খসড়া তালিকাও প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে এ বার শুরু হয়েছে আসল ঝাড়াইবাছাইয়ের প্রক্রিয়া। যে ভোটারদের তথ্য নিয়ে কমিশন পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়, শুনানির মাধ্যমে তাঁদের তথ্য যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
এর মধ্যে ৩১,৬৮,৪২৪ জন ভোটার রয়েছেন, যাঁরা ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে কোনও যোগসূত্র দেখাতে পারেননি। প্রথম পর্বের শুনানিতে ডাক পেয়েছেন তাঁরাই। এ ছাড়াও, কমিশনের দাবি, রাজ্যে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটার রয়েছেন, যাঁদের এনুমারেশন ফর্মের তথ্যে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। তাঁদেরও তথ্য যাচাই করা হবে। তবে তাঁদের প্রথমেই শুনানির জন্য ডাকা হয়নি। আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিএলও-রা ওই ভোটারদের তথ্য যাচাই করবেন। তথ্য মনোমত হলে বিএলও নিজেই সুপারিশ করবেন চূড়ান্ত তালিকায় ওই ভোটারের নাম তোলার জন্য। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের শুনানির জন্য কমিশনের কাছে সুপারিশ করবেন তিনি।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছিল, নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরই পাওয়া যাবে ভোটাধিকার। তা নিয়ে ধন্দে ছিলেন মতুয়ারা। কারণ তাঁরা CAA-এর আবেদন করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, নাগরিকত্বের আবেদন করলেই ভোটার লিস্টে নাম তোলা যাবে না। অর্থাৎ প্রথমে নাগরিক হতে হবে, তারপরই তাঁরা ভোটাধিকার পাবেন। আবেদনকারীদের ফোনে নাগরিকত্বের সার্টিফিকেটের মেসেজও ঢুকতে শুরু করে। কিন্তু সেটা কি আদৌ শুনানিতে গ্রাহ্য হবে, তা নিয়েই ধন্দ ছিল মতুয়াদের মধ্যে। কারণ মতুয়াদের ৯০ শতাংশই শুনানির জন্য ডাক পেয়েছেন।

বঙ্গ সফর থেকে ফিরে গিয়েই মতুয়াদের উদ্দেশে বড় বার্তা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেছিলেন, “আমি নিশ্চিত করছি, প্রত্যেক মতুয়া ও নমঃশুদ্র পরিবারের পাশে আমরা থাকব। তাঁরা তৃণমূলের দয়ায় নেই। মর্যাদার সঙ্গে মতুয়াদের ভারতে থাকার অধিকার আছে। আমাদের সরকার CAA এনেছে। BJP বাংলায় ক্ষমতায় এলে মতুয়া ও নমঃশুদ্রদের জন্য আরও অনেক কিছু করবে।” সেই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে শুনানির ঠিক আগের দিনই বড় সিদ্ধান্ত কমিশনের।



