বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়ে কেপা ভার্ডের বিদায়
deshersamay


রাউন্ড অফ ৩২ এ ভারতীয় সময় রাত সাড়ে তিনটে শুরু হয় আর্জেন্টিনা বনাম কেপা ভার্ডের বিশ্বকাপের একটি স্মরণীয় ফুটবল ম্যাচ। ফুটবল ম্যাচ বললে ভুল হবে, এটা যেন ফুটবল যুদ্ধ। ৪০ বছর বয়সেও মেসি যে আর্জেন্টিনার সর্বশ্রেষ্ঠ পরিত্রাতা সেটা আজ একশো কুড়ি মিনিট মাঠে থেকে গোল করে এবং করিয়ে আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন এই মুহূর্তে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এই খেলোয়াড়।

আর্জেন্টিনা ৪-১-২-৩ ও কেপ ভার্ডে ৪-১-৪-১ ফরমেশনে খেলা শুরু করে। এর থেকেই বোঝা যায় কেপ ভার্ডে একটু ডিফেন্সশিপ খেলবে। শুরুতে সেরকমই দেখা গেল।
খেলার ১৫ মিনিটের মাথাতেই মেসি প্রথম সুযোগ পায়। বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে বাঁ পায়ে নেওয়া শট গোলপোস্টের বাইরে চলে যায়। পরের মিনিটেই বক্সের বাইরে মেসিকে অবৈধভাবে বাধা দেয় যার ফলে ফ্রি কিক পায় আর্জেন্টিনা। মেসির নেওয়া ফ্রি কিক সরাসরি গোলরক্ষক ভোজিনার হাতে যায়।
১৯ মিনিটের মাথায় মলিনা খুব ভালো একটি সুযোগ পেয়ে যায় এবং বক্সের মধ্যে গোলকিপারকে প্রায় ওয়ান ইস্টু ওয়ান এ পেয়ে যায়। ভজিনা বাঁদিকে শরীর ছুড়ে দিয়ে প্রায় মলিনার পা থেকে বল তুলে নেয়। ২৯ মিনিটে আর্জেন্টিনার প্রথম কাঙ্খিত গোলটি আসে সেই মেসির পা থেকেই। বক্সের অনেক বাইরে থেকে মার্টিনেজ অসাধারণ একটি বল বাঁড়ায় মেসিকে উদ্দেশ্য করে এবং বক্সের ডানদিকে মেসি বলটি অসাধারণ রিসিভ করে বা পায়ে,সাথে সাথেই বা পায়ের আউটস্টেপ দিয়ে গোল এ শুট করে। সারা বিশ্বের ফুটবল ভক্তরা মেসির আরেকটি অসাধারণ গোল দেখে। শেষ আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচেই মেসির ধারাবাহিক গোলের রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকলো।

৪৪ মিনিটে মার্টিনেজ বক্সের ঠিক মাথা থেকে অসাধারণ একটি শর্ট করেন গোল- লক্ষ্য করে এবং ততধিক দক্ষতায় গোলটি বাঁচান গোলরক্ষক ভজিনা।
বিরতির পর ৫২ মিনিটের মাথায় মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ পাসটি বক্সের মধ্যে মলিনা ঠিকমতো রিসিভ করতে পারলে দ্বিতীয় গোলটিও এসে যেত।
কিন্তু পর মুহুর্তেই 53 মিনিটে কেপ ভার্ডের ১৪নম্বর জার্সিধারী ডি ডুয়ারতে আর্জেন্টিনার বক্সের বাইরে থেকে গোল- লক্ষ্য করে অসাধারণ একটি শর্ট করে যা অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে সেভ করে মার্টিনেজ। তখন থেকেই খেলা কিন্তু প্রচণ্ড দ্রুত গতিতে শুরু হয় এবং কেপ ভার্ডে একের পর এক আক্রমণ করতে থাকে। ফল স্বরূপ ৫৯ মিনিটের মাথায় ২০ নম্বর জার্সিধারী মেন্ডেস বক্স এর ডানদিকে বাইরে থেকে ভালো বল বাড়ান বক্সের মধ্যে থাকা সেই 14 নম্বর জার্সি ধারী ডি ডুয়ারতে কে। বলটি ধরে ডুয়ারতে দ্বিতীয় পোস্ট এর কোনা দিয়ে জলে জড়িয়ে দিয়ে খেলায় সমতা ফেরান। তার পর থেকে খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত সারা বিশ্বের ফুটবল দর্শকরা দেখতে পেলো এক অবিশ্বাসো লোমহর্ষক ফুটবল যুদ্ধ।

৬২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বল ধরে মেসি ক্ষিপ্রতার সাথে বক্স এর মধ্যে ঢুকে গোলকিপার এর সাথে ওয়ান ইস্টু ওয়ান হয়ে যান , সবাই ধরে নিয়েছে গোল নিশ্চিত, কিন্তু মেসির ডান পায়ের সেই গড়ানো শট আবার আটকে যায় সেই ভজিনা নামক দেওয়ালে।এরপর একেবারে খেলার শেষ মুহূর্তে ৮৯ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে মেসি একটি সুন্দর সেন্টার করেন যা বিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারের হাতে লাগার দাবি উঠে। কিন্তু রেফারি সেই দাবিতে কর্ণপাত করেননি।
নির্দিষ্ট ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ গোলে সমাপ্ত হওয়ায় খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। ৯২ মিনিটে কর্নার থেকে উড়ে আসা বল একজন খেলোয়াড়ের মাথায় লেগে ডান দিকে দাঁড়ানো মাটি নিজের কাছে এসে পড়ে। মাটিনেজ বলটি রিসিভ করে ডান পায়ের অসাধারণ একটি শটে দূরবর্তী পোস্টের পাশ দিয়ে নেটে জড়িয়ে দেন। সবাই যখন ধরে নিয়েছে আর্জেন্টিনার জয় সময়ের অপেক্ষা, তখন কেপা ভার্ডে তাদের আক্রমণের ঝাঁজ আরো বাড়িয়ে দেয় । ১০৩ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে বাম প্রান্তে বল ধরেন ১৩ নম্বর জার্সিধারী লোকেজ ক্যাব্রাইল।

একজন ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকেই ডান পায়ের অসাধারণ এক শটে দ্বিতীয় পোস্টের কোণা দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন যা এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে মনে থাকবে অনেকেরই।
খেলা তখন ২-২। আক্রমণ প্রতি আক্রমণে খেলা তখন জমে উঠেছে। সারা বিশ্ব সেই সময় তাকিয়ে ছিল সেই মেসি ম্যাজিকের দিকে। ১১১ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে কর্নার তোলেন মেসি।দুই গোলপোস্টের মাঝে এবং সিক্স ইয়ার্ড বক্স এর কাছেই বলটি হেট করতে ওঠেন আর্জেন্টিনার ক্রিস্টিয়ানো রোমেরো এবং বল ক্লিয়ার করার জন্য হেডে ওঠেন কেপা ভার্ডের দীনে।রোমেরোর মাথায় লেগে দীনের মাথায় ডিফেলেক্ট হয়ে নিজেদের গোল এ চলে যায়। অর্থাৎ ফুটবলের পরিভাষায় ওন গোল।
এরপর নিজে লোপেজ যেখান থেকে বল ধরে দ্বিতীয় গোল করেছিলেন সেখানে একটি ফ্রি কিক পায় কেপা ভার্ডে। গ্লোপেজ আবার ফিকিরটি নেন এবং সেই একই রকম দক্ষতায় বলটি দ্বিতীয় পোস্টে গলে রাখেন। এই সময় মার্টিনেজ বাঁদিকে শূন্যে শরীর ছুড়ে দিয়ে দলকে বিপদমুক্ত করে প্রমাণ করেন তিনি এখনো পৃথিবীর অন্যতম সেরা গোললক্ষক।

আর্জেন্টিনা রাউন্ড অফ সিক্সটিনে পৌঁছে গেল এবং রাউন্ড অফ সিক্সটিনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মিশর। এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে মনে হয় সবচেয়ে প্রবল প্রতিপক্ষের সামনে আজই পড়তে হলো। আজকের লড়াই জেতার পর সারা বিশ্ব আবার তাকিয়ে আছে মেসির হাতে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ উঠবে এই আশা নিয়ে।
