বারুইপুর গিয়ে পুলিশকে ৭২ ঘণ্টার ডেডলাইন মুখ্যমন্ত্রীর ,‘গণপিটুনিতে মৃত যুবক নির্দোষ, উস্কানিদাতাদের রেয়াত নয়’: শুভেন্দু অধিকারী
deshersamay

বারুইপুরের নাবালিকা নির্যাতন ও খুনের ঘটনার পর প্রশাসনিক ও আইনি তৎপরতা খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার সরেজমিনে বারুইপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পৌঁছন
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ।

সেখানে নির্যাতিতা নাবালিকার পরিবারের পাশাপাশি ওই ঘটনার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে নিহত যুবক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গেও দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ধৃত মূল অপরাধীদের পাশাপাশি আইন হাতে তুলে নিয়ে যারা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছে এবং পিছন থেকে উসকানি দিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে কঠোর শিক্ষা দেওয়া হবে। এ দিন রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তার উপস্থিতিতেই পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে তদন্তের জন্য ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
বারুইপুরে দেহ উদ্ধারের পর যে গণহিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে তিনি জানান, “মব লিঞ্চিং বা গণপিটুনি দিয়ে যাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, সেই ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল সম্পূর্ণ নির্দোষ। এটি আমার কথা নয়, পুলিশ আমাকে প্রাথমিক তদন্তের পর যা জানিয়েছে সেটাই বলছি। আমি ওঁর শোকার্ত পরিবারের সঙ্গেও দেখা করেছি।”

এলাকায় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং রেললাইন উপড়ে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০ জন তাণ্ডবকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রত্যেককে দ্রুত গ্রেফতার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এই হিংসার পিছনে থাকা রাজনৈতিক উস্কানিদাতাদেরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “যারা নির্বাচনে সাধারণ মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, কেউ ক্ষমতা হারিয়েছেন আবার কেউ শূন্য থেকে এক হয়েছেন—এমন কিছু দেশবিরোধী শক্তি পিছন থেকে উস্কানি দিয়েছে। এসটিএফ এদের কল রেকর্ড-সহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করেছে। এদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।”

ক্ষতিপূরণ ও সহায়তার বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিষয়টি তিনি সম্পূর্ণভাবে দুই হতভাগ্য পরিবারের ইচ্ছের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট আবেদন জানিয়েছেন। সেই দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী পুনরায় বারুইপুরে আসবেন এবং দুটি পরিবারের সঙ্গেই দেখা করবেন।
একই সঙ্গে, নির্যাতিতার পরিবারের দাবি মেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বারুইপুরের সূর্যপুরে অবিলম্বে একটি নতুন পুলিশ আউটপোস্ট গঠন করার জন্য ডিজি এবং হোম সেক্রেটারিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থায়ী ভবন তৈরি হওয়ার আগে প্রয়োজনে কোনও ভাড়া বাড়ি নিয়ে হলেও দ্রুত এই আউটপোস্টের কাজ চালু করতে বলা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে মুখ্যমন্ত্রী যখন দ্বিতীয়বার ভিকটিমদের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন, তখনই এই সূর্যপুর আউটপোস্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।
প্রশাসনিক পর্যালোচনার পাশাপাশি এ দিন বারুইপুর এসপি অফিসেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী। সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকসভা সাংসদ সায়নী ঘোষ এবং স্থানীয় বিধায়ক তথা প্রাক্তন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান (একান্তে) কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী জানান, দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁরাও সরকারের ও পুলিশের পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিজেপির তিন বিধায়ক—গোসাবার বিকর্ণ নস্কর, রূপা গঙ্গোপাধ্যায় এবং দেবাশিস ধর মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বক্তব্য জানান। মুখ্যমন্ত্রী তাঁদেরও তদন্তের অগ্রগতি এবং পুলিশের আগামী পদক্ষেপের বিষয়ে বিশদে ব্রিফ করেন।
বারুইপুর থেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত থানার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুলিশ প্রশাসনকে চরম হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন যে, যে কোনও মূল্যে এই ধরনের অপরাধ রোধ করতে হবে। প্রতিটি থানাকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা , সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন, জাতীয় মহিলা কমিশন এবং জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের নির্দেশিকা, পকসো আইন এবং হিউম্যান রাইটস কমিশনের গাইডলাইন মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বারুইপুরের ঘটনাটির মিনিট-টু-মিনিট প্রাথমিক বিশ্লেষণ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার আগের দিন রাত ১১:৫০ মিনিটে থানায় ‘মিসিং ডায়েরি’ করা হয়েছিল। তার পর থেকে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, তা খতিয়ে দেখতে সূর্যপুর ক্যাম্প ইনচার্জ, বারুইপুরের তত্কালীন আইসি, এসডিপিও এবং অ্যাডিশনাল এসপির ভূমিকা শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের উপস্থিতিতে স্ক্রুটিনি করা হয়েছে। এই বিষয়ে ডিজি-কে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, “তদন্তে যদি দেখা যায় ওই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুলিশের কোনও আধিকারিকের ১ শতাংশও গাফিলতি বা শিথিলতা ছিল, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আরজি কর মামলায় তিন জন শীর্ষ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছি। আমার বার্তা খুব পরিষ্কার। নির্যাতিতার ১০ জন সদস্যের পরিবার যে আস্থা আমাদের ওপর রেখেছেন, তার মর্যাদা রক্ষা করা আমার কর্তব্য।”

