

পৃথিবী থেকে ৪ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭৮ কিলোমিটার দূরে পাড়ি। মানব ইতিহাসে এতদূর কেউ যায়নি। সেই মিশন সফল করে পৃথিবীতে আবার ফিরে এল মহাকাশ যান। প্রশান্ত মহাসাগরে স্প্ল্যাশডাউনের মাধ্যমেই সফল হল নাসার আর্টেমিস টু (Artemis II) মিশন। সুস্থভাবে ফিরে এলেন নাসার পাঠানো চার মহাকাশচারী।

শনিবার ভোরে সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদেই অবতরণ করল নাসার (NASA) ‘আর্টেমিস ২’ মিশন (Artemis 2)। হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোল রুমে তখন টানটান উত্তেজনা। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি যখন আগুনের গোলার মতো ধেয়ে আসছিল, তখন টানা ৬ মিনিট পৃথিবী থেকে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল (Moon Mission)। অবশেষে কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই কানায় কানায় পূর্ণ কন্ট্রোল রুমে হাততালির জোয়ার বয়ে গেল। রিড জানালেন, “আমরা একদম ঠিক আছি।” এর সঙ্গেই মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে রচিত হল একগুচ্ছ নতুন রেকর্ড।

https://x.com/i/status/2042756157337424238
১০ দিনের এই ঐতিহাসিক অভিযানে ছিলেন তিন মার্কিন ও এক কানাডীয় মহাকাশচারী— ক্রিস্টিনা কোচ, ভিক্টর গ্লোভার, জেরেমি হ্যানসেন এবং রিড ওয়াইজম্যান। পাঁচ দশক পর এই প্রথম মানুষ চাঁদের এত কাছে পৌঁছাল। তবে শুধু চাঁদে যাওয়াই নয়, এই মিশন বৈচিত্র্যের দিক থেকেও অনন্য। ক্রিস্টিনা কোচ হলেন প্রথম নারী এবং ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে চাঁদের সীমানায় পা রাখলেন। অন্যদিকে, জেরেমি হ্যানসেন হলেন প্রথম অ-মার্কিন হিসেবে এই বিরল সম্মানের অংশীদার।

এই সফরে মহাকাশচারীরা হাজার হাজার ছবি তুলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হল ‘আর্থসেট’—যেখানে চাঁদের খানাখন্দে ভরা ধূসর দিগন্তের ওপারে এক চিলতে উজ্জ্বল পৃথিবীকে অস্ত যেতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া তারা মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণ এবং চাঁদের পিঠে উল্কাপাত হতে দেখেছেন। সবথেকে রোমাঞ্চকর ছিল চাঁদের ‘ডার্ক সাইড’ বা যে অংশটি পৃথিবী থেকে কখনোই দেখা যায় না, সেটি স্বচক্ষে দেখা। ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের সেই অন্ধকার পিঠের ওপর দিয়ে প্রায় ৪,০০০ মাইল উচ্চতায় উড়ে গিয়েছিল।

অভিযানের অন্যতম একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল যখন মহাকাশচারীরা চোখের জলে দুটি গহ্বরের (Crater) নাম রাখার অনুমতি চান। তারা ওই গহ্বর দুটির নাম রাখতে চান তাদের মহাকাশযান এবং কমান্ডার ওয়াইজম্যানের পরলোকগত স্ত্রী ক্যারোলের নামে। মহাকাশে তাদের খাবারের তালিকায় ছিল ১৮৯টি আইটেম। যার মধ্যে কফি, স্মুদি থেকে শুরু করে বারবিকিউ বিফ, ম্যাক অ্যান্ড চিজ, চকোলেট এবং কুকিজের মতো সুস্বাদু সব খাবার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১৯৭০ সালের বিখ্যাত ‘অ্যাপোলো ১৩’ মিশনের চেয়েও ৬,৪০০ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিয়ে এই চার নভোচারী পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪,০৬,৭৭১ কিলোমিটার দূরে পৌঁছেছিলেন। এটি এখন পর্যন্ত মানুষের পৃথিবী থেকে সবথেকে দূরে যাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড। তবে মহাকাশচারীরা চান, তাদের এই রেকর্ড যেন দ্রুত ভেঙে আগামী প্রজন্ম আরও দূরে এগিয়ে যায়।

এই মিশনের সবথেকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল পৃথিবীর কক্ষপথে পুনরায় প্রবেশ করা। তখন যানের গতি ছিল ঘণ্টায় ৪০,০০০ কিলোমিটার এবং বাইরের তাপমাত্রা ছিল ২,৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস—যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক। ২০২২ সালের ‘আর্টেমিস ১’-এর হিট শিল্ড নিয়ে যে ভয় ছিল, তা কাটিয়ে ওরিয়ন সফলভাবে ফিরে আসায় এখন ২০২৮ সালে চাঁদে মানুষ নামানোর (আর্টেমিস ৪) পথ পরিষ্কার হয়ে গেল।
যদিও মহাকাশযানের টয়লেট এবং পানীয় জলের ভালভ নিয়ে সামান্য সমস্যা হয়েছিল, তবুও সামগ্রিকভাবে এই মিশন অত্যন্ত সফল। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের কথায়, “আমরা আবার মহাকাশচারীদের চাঁদে পাঠানো এবং নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবসায় ফিরেছি। এটা তো মাত্র শুরু!” আগামী বছরের ‘আর্টেমিস ৩’ মিশনে মহাকাশচারীরা লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে ওরিয়নকে যুক্ত করার মহড়া দেবেন। সব ঠিক থাকলে ২০২৮ সালেই ফের চাঁদের মাটিতে হাঁটবেন মানুষ।

নাসা জানিয়েছে, এই অভিযান পরবর্তী চন্দ্র অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ। পরবর্তী মিশনে চাঁদে মানুষ নামানোর পরিকল্পনা নাসার। বিগত পাঁচ দশকে প্রথমবার এমনটা হবে।



