রাজ্য বিজেপির ২৪ জনের কোর কমিটির সঙ্গে মঙ্গলবার দুপুরে বৈঠকে বসার কথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডার। বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, কমিটির ২৩ সদস্যই হাজির হচ্ছেন বৈঠকে। আসছেন না শুধু মিঠুন চক্রবর্তী।

দেশের সময়,কলকাতা: বড়দিনের রাতে কলকাতায় এলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনকে ‘পাখির চোখ’ করে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করতেই অমিত শাহর এই কলকাতা সফর বলে সূত্রের খবর।

স্বাভাবিকভাবে শাহের এই সফরে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা। তাঁদের বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে যান রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে লকেট চট্টোপাধ্যায়, অগ্নিমিত্রা পল-সহ রাজ্য বিজেপি নেতৃবৃন্দ। বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় ঢাক বাজিয়ে, স্লোগান দিয়ে শাহ-নাড্ডাকে অভ্যর্থনা জানান বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। দলীয় কর্মীদের এই উন্মাদনা দেখে গাড়ি থেকে নেমে সমর্থকদের কাছে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথাও বলেন অমিত শাহ।

অমিত শাহর এই কলকাতা সফর পূর্ব নির্ধারিতই ছিল। সেই মতো নির্দিষ্ট সূচি অনুযায়ী সোমবার গভীর রাতে কলকাতা বিমানবন্দরে নামেন অমিত শাহ ও জেপি নাড্ডা। সেখাবন থেকে তাঁরা সরাসরি নিউ টাউনের বিলাসবহুল হোটেলে যান। সেখানেই রাত্রিবাস করেন। তারপর মঙ্গলবার সকাল থেকে গুরুদ্বার, কালীঘাট মন্দির করা দর্শন থেকে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করবেন শাহ-নাড্ডা।

বিজেপি সূত্রে খবর, সোমবার রাতে দু-দিনের সফরে কলকাতা এসেছেন অমিত শাহ ও জেপি নাড্ডা। মঙ্গলবার সকালে তাঁরা প্রথমে যাবেন জোড়াসাঁকোর গুরুদ্বারে। সেখান থেকে বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ কালীঘাট মন্দিরে যাবেন এবং পুজো দেবেন তাঁরা। তাঁদের সঙ্গে কালীঘাট মন্দিরে যেতে পারেন সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারীর মতো রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। মন্দিরে পুজো দেওয়ার ফের তিনি নিউ টাউনে হোটেলে ফিরে যাবেন এবং সেখানেই রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। তারপর ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দেবেন শাহ ও নাড্ডা। এরপর ফের নিউ টাউনের হোটেলে ফিরে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন ‘বিজেপির চাণক্য’ ও দলের সর্বভারতীয় সভাপতি। এই বৈঠকের পরই সন্ধ্যা সওয়া ৬টা নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি দিল্লির বিমান ধরবেন শাহ ও নাড্ডা।

মঙ্গলবার বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকে বঙ্গ বিজেপির নেতারা লোকসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সেরে নিতে চান। কোন কোন মানদণ্ডে প্রার্থী বাছাই করতে হবে নাড্ডা ও শাহ বৈঠকে তুলে ধরবেন।
নাড্ডা ও শাহের প্রথম কর্মসূচি ন্যাশনাল লাইব্রেরির অডিটোরিয়ামে রাজ্য বিজেপির সর্বস্তরের কমিটি, গণসংগঠন এবং সোশ্যাল মিডিয়া সেলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক। দুই নেতা সেখানে ভাষণ দেওয়ার পর রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বে র সঙ্গে তাঁরা বৈঠক করবেন নিউটাউনের একটি হোটেলে। সেখানে দু’দফায় বৈঠক করবেন দুই নেতা।

দলীয় সূত্রের খবর, বিধায়কদের প্রার্থী করা নিয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকে বিশদে আলোচনা হতে পারে। বিজেপিতে বিধানসভা ভোটে এমপি’দের, লোকসভা ভোটে এমএলএ’দের প্রার্থী করা নতুন নয়। সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য ছত্তীসগড়, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপি বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও এমপি’কে প্রার্থী করে বাজিমাৎ করে। কংগ্রেস নেতারাও একান্তে মানছেন, বিজেপি ওই সিদ্ধান্ত নিয়ে জোরদার লড়াইয়ের বার্তা দিতে পেরেছিল। আবার ভোটের পর নবীন তিন নেতাকে যেমন তিন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী করেছে দল, তেমনই কৈলাশ বিজয়বর্গীয়র মতো দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকে মধ্যপ্রদেশে মন্ত্রী করা হয়েছে, যাঁকে অনেকেই মুখ্যমন্ত্রী মুখ মনে করছিলেন। 

বঙ্গ বিজেপি সূত্রের খবর, বিধায়কদের প্রার্থী করা হবে কি না তা নিয়ে রাজ্য নেতৃত্বের মধ্যে টানাপোড়েন আছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী চান বিধায়ক দল অক্ষত থাকুক। বিধানসভায় এবং বাইরে তৃণমূলের মোকাবিলায় তা জরুরি। 


কিন্তু রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষেরা চান কয়েকজন বিধায়কে লোকসভার লড়াইয়েক নামানো হোক। আগের লোকসভা নির্বাচনের সময় দিলীপ ঘোষ নিজেই ছিলেন খড়্গপুরের বিধায়ক। তিনি খড়্গপুর লোকসভা আসন থেকে প্রার্থী হয়ে সংসদে যান। 

দিলীপ ঘোষেরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ দেওয়া টার্গেট পূরণ করতে হলে কয়েকজন বিধায়ককে প্রার্থী করা জরুরি। শাহ আগের বাংলা সফরে এসে ৩৫ আসনের টার্গেট দিয়ে যান। দলীয় আলোচনায় দিলীপ ঘোষ বলেছেন, আগের লোকসভা ভোটে বাংলা থেকে ২২টি আসনের টার্গেট দেওয়া হয়েছিল। দল জিতেছিল ১৮টি। এবার ৩৫ আসনের মধ্যে অন্তত ৩০টি জিততে হবে। আর তারজন্য কয়েকজন বিধায়ককে প্রার্থী করা দরকার। 

দলের এক নেতার কথায়, রাজ্য নেতাদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এই ব্যাপারে শেষ কথা বলবেন নাড্ডা-শাহরাই। বিজেপিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দুই শিবিরের বক্তব্যেই কিছু যুক্তি আছে। ২০২৬ পর্যন্ত বিধানসভায় তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। তারজন্য বিধায়কদের মধ্যে বোঝাপড়া গড়ে তোলা দরকার। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অবশ্যই এই দিকটি বিবেচনায় রাখবেন। তবে আশু প্রয়োজনের দিকটি অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলা থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াই লক্ষ্য বিজেপির। সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, “লোকসভা ভোটে বাংলার ৪২টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসন জয় করার লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন অমিত শাহজি। আমরা এই লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে এগোচ্ছি।” দলীয় কর্মীদের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের রণকৌশল স্থির করতেই শাহ ও নাড্ডার এবারের কলকাতা সফর বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজ্য বিজেপির এক সিনিয়ার নেতা জানান, নতুন বছর শুরুর আগে দলের দুই শীর্ষ নেতার কলকাতা সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে কখনও এই দুই শীর্ষ নেতাকে একসঙ্গে কলকাতা সফরে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন অগ্নিমিত্রা পল। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্ব যে আসন্ন লোকসভা ভোটে বাংলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তা এর থেকেই স্পষ্ট। এবার রাজ্য নেতৃত্বকে অমিত শাহ ও জেপি নাড্ডা কী বার্তা দেন, সেটাই দেখার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here