‘দিদির পাশে আছি’, দাবি করেও ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে সই? স্পিকারের দফতরে নাম জমা দিলেন দেব- সায়নী-পার্থ সহ ১৯ সাংসদ তৃণমূল সাংসদ
deshersamay


লোকসভা নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড়। তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়ে লোকসভার স্পিকারের দফতরে পৌঁছাল এক ঝাঁক বিক্ষুব্ধ সাংসদের নাম। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, গত ১৮ মে স্পিকারের অফিসে মোট ২০ জন দলত্যাগী বা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদের একটি তালিকা পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ১৯ জনের নাম ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করা গিয়েছে।

তৃণমূলের এই বিশাল সংখ্যক সাংসদের দল ছাড়ার এই সিদ্ধান্ত জাতীয় ও রাজ্য রাজনীতিতে এক বিরাট আলোড়ন তৈরি করেছে। ২০ জনের এই গোষ্ঠীর মধ্যে ১৯ জন সাংসদ একজোট হয়ে স্পিকারের কার্যালয়ে নিজেদের নাম জমা দিয়েছেন।যদিও স্বাক্ষর সংবলিত ওই পাতাগুলি চিঠির অংশ কি না, সেটি চিঠি হলে আদৌ স্পিকারকে পাঠানো হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
স্বাক্ষর সংবলিত ওই পাতাগুলির প্রতিলিপি দেশের সময়-এর কাছে এসেছে। তবে এর সত্যাসত্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তৃণমূল কংগ্রেসের সেই বিক্ষুব্ধ ও দলত্যাগী ১৯ জন সাংসদের নামের তালিকাটি নীচে দেওয়া হল:
১. কাকলি ঘোষ দস্তিদার
২. শতাব্দী রায়
৩. বাপি হালদার
৪. ডাঃ শর্মিলা সরকার
৫. প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়
৬. জগদীশ বর্মা বাসুনিয়া
৭. অসিত চক্রবর্তী
৮. রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়
৯. সায়নী ঘোষ
১০. খলিলুর রহমান
১১. আবু তাহের খান
১২. ইউসুফ পাঠান
১৩. মিতালী বাগ
১৪. মালা রায়
১৬. কালীপদ সরেন
১৭. দীপক অধিকারী (দেব)
১৮. জুন মালিয়া
১৯. পার্থ ভৌমিক
এরপর একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে কি তবে ফাটল ধরল? তৃণমূলের ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর করা একটি চিঠি জমা পড়েছে, তা আগেই জানা গিয়েছে। ওই চিঠিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি তৃণমূল দলের সঙ্গে সমস্ত দূরত্ব বজায় রাখতে চায় এবং সংসদে ক্ষমতাসীন ‘এনডিএ’ (NDA) জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী।
এই জোড়া বিদ্রোহের জেরে ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সম্ভবত সবচেয়ে গভীর সংকটের মুখে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। দলীয় অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এখন বিধানসভা ও সংসদে শক্তি প্রদর্শন, সংখ্যার লড়াই, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বৈধতা রক্ষার এক চুলচেরা যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

According to Sources here is the list of 19 out of 20 TMC breakaway MPs that sent their names to the Lok Sabha Speaker’s Office on May 18th.
— ANI (@ANI) June 12, 2026
1. Kakoli Ghosh Dastidar
2. Satabdi Roy
3. Bapi Haldar
4. Dr. Sharmila Sarkar
5. Prasun Bandyopadhyay
6. Jagadish Barma Basunia
7. Asit… pic.twitter.com/MM2rPhYuaf
সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন এই বিদ্রোহী শিবিরের জমা দেওয়া দলত্যাগী তালিকায় জয়নগরের তৃণমূল সাংসদ প্রতিমা মণ্ডলের নাম রয়েছে বলে জানা যায়। তবে এই খবর সামনে আসতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রতিমা মণ্ডল। ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে তাঁর থাকার খবরকে “সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে দাবি করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তিনি বর্তমানে কলকাতায় আছেন এবং দিল্লিতে গিয়ে কারও সঙ্গে দেখা করেননি।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে জয়নগরের সাংসদ বলেন, “এই খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এখানেই কলকাতায় আছি। ৪ জুন দিল্লিতে আমার ‘এস্টিমেটস কমিটি’-র একটি বৈঠক ছিল এবং সেদিনই আমি কলকাতায় ফিরে আসি। তারপর থেকে আমি আর দিল্লিতে যাইনি।”
মিথ্যা খবর ছড়ানোর পরিবর্তে সাংসদদের স্বাক্ষরিত সেই মূল চিঠিটি প্রকাশ্যে আনার জন্য বিদ্রোহীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন প্রতিমা মণ্ডল। তিনি বলেন, “যারা এই মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছেন, তাদের আমি জিজ্ঞাসা করছি— আপনারা কেন সবার স্বাক্ষরিত চিঠিটি প্রকাশ করছেন না? কেন সেই নথিটি দেখাচ্ছেন না যাতে মানুষ বুঝতে পারে যে, তাতে আমার নাম আছে কি না?”
সাংসদ আরও খোলসা করেছেন যে, বিদ্রোহীদের পরিকল্পনার কোনও বিস্তারিত তথ্য তাঁকে দেওয়া হয়নি। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে কিছু আলোচনা হলেও, তাঁদের কর্মপরিকল্পনা “উপযুক্ত” বা গ্রহণযোগ্য বলে তিনি মনে করেননি।

বিদ্রোহীদের সঙ্গে না থাকলেও, রাজ্যে দলের পরাজয় নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রতিমা মণ্ডল। তিনি স্বীকার করেন যে, তৃণমূলে কিছু সমস্যা ও ভুলত্রুটি নিশ্চিতভাবেই ছিল, যার ফলে দল হেরেছে। তাঁর কথায়, “নিশ্চিতভাবেই কিছু ভুলত্রুটি ছিল। সেই কারণেই মানুষ তৃণমূলকে সমর্থন জানায়নি এবং আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি।” তবে তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, বিদ্রোহী শিবির তাঁকে দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাঁদের পরিকল্পনা তাঁর পছন্দ হয়নি।
তিনি আরও জানান, বিধায়কদের বিদ্রোহের পর দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি নিজেই সাংসদদের নিয়ে কলকাতায় একটি বৈঠক ডাকতে চেয়েছিলেন। প্রতিমা মণ্ডল বলেন, “আমি নিজেই অনেক সাংসদকে ফোন করে কলকাতায় বৈঠক করার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তাঁরা আমাকে দিল্লিতে যেতে বলেন। আমি তাতে রাজি হইনি।”
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে তৃণমূলের এই তীব্র সাংগঠনিক সংকট প্রকাশ্যে আসে। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় যে বিভাজন ঘটেছিল, তা মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সংসদেও ছড়িয়ে পড়ে। সংসদীয় পর্যায়ের এই ভাঙন দেখা দিল ঠিক তখনই, যখন ৫৮ জন তৃণমূল বিধায়ক (বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যাটি এখন বেড়ে হয়েছে ৬৪) দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশ সরাসরি অমান্য করেন। তাঁরা বিধানসভার বিরোধী দলনেতা পদে দলের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী শোভনদেব চ্যাটার্জির পরিবর্তে বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে খোলামেলা সমর্থন জানান।
প্রসঙ্গত, বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয় এবং পরিষদীয় দলে বিদ্রোহের পরেই রাজ্যে দলের সমস্ত কমিটি ভেঙে দিয়েছিল তৃণমূল। ৫ জুন কালীঘাটে একটি বৈঠকের পর নতুন কমিটি গড়েন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নতুন কমিটিতেই যুব সংগঠনের দায়িত্বে সায়নীকে বহাল রাখা হয়েছিল। মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী পদে আনা হয় মালাকে। ঘটনাচক্রে, এই দুই সাংসদই বিদ্রোহী শিবিরে শামিল হয়েছেন। বিধায়কদের পর সাংসদদের বড় অংশও বিদ্রোহী হওয়ায় আগেই অস্বস্তি বেড়েছিল তৃণমূলের। সেই অস্বস্তি আরও বাড়ল। তৃণমূল সূত্রে খবর, মালা-সায়নীদের উপর যে দলের নিয়ন্ত্রণ আর নেই, তা কয়েক দিন আগেও বুঝতে পারেননি শীর্ষ নেতৃত্ব।

বিধায়কদের এই বিদ্রোহের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দিল্লিতে ১৯ জন সাংসদের এই পদক্ষেপ দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
