শুক্রবার ইসলামাবাদের তারলাই এলাকার ইমাম বারগাহ কাসর-ই খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে শুক্রবারের নামাজের সময় এই বিস্ফোরণ ঘটে। ওই শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায় এক জঙ্গি। ISIS জানিয়েছে, মসজিদের ভিতরের গেটে পৌঁছানোর পর, শাহাদাত-প্রার্থী শিয়া জামাতের মধ্যে তাঁর বিস্ফোরক ভেস্টের বিস্ফোরণ ঘটান, যার ফলে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের ম্যারিয়ট হোটেল বোমা বিস্ফোরণের পর এটি পাকিস্তানের রাজধানীতে হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হামলাকারীকে মসজিদের মূল দরজাতেই আটকে দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রক্ষীরা তাকে ভিতরে ঢুকতে বাধা দেন। সেই সময়ই সে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে মসজিদের ভিতরে বড়সড় ক্ষতি না হলেও দরজার কাছে জড়ো থাকা বহু মানুষ প্রাণ হারান। দু’জন পুলিশ আধিকারিক জানান, নিরাপত্তারক্ষীরা সময়মতো সতর্ক না হলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।
এই বিস্ফোরণের পর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক স্থানীয় সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন, জাতীয় স্তরের টেলিভিশন চ্যানেলগুলি ঘটনাস্থল থেকে তেমনভাবে খবর সম্প্রচার করেনি এবং প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ এক জনৈক সাংবাদিক তীব্র সমালোচনা করে লেখেন, রাজধানীতে রক্তাক্ত হামলার পরও বহু চ্যানেল বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, বসন্ত উৎসব ও ক্রিকেট আলোচনা সম্প্রচার চালিয়ে গিয়েছে। তাঁর মতে, এই মনোভাব নিহতদের পরিবারের প্রতি নিষ্ঠুর ও সংবেদনহীন।
প্রথমে ইসলামাবাদ এই হামলার দায় ভারত ও আফগানিস্তানের চাপায়। উভয় দেশই ইসলামাবাদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যর্থতাকেই দায়ী করে। ‘পাকিস্তানে বেড়ে ওঠা অসুখই আসল ঘাতক’, বলে জানায় দুই দেশই। পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে মন্তব্য করেছেন, ‘বিস্ফোরণের আধ ঘণ্টা আগে ভারতীয়রা কী ভাবে সব জেনে যায় এবং কোথায় কী হচ্ছে তা বলে দেয়, আমি সে রকম কিছু বলব না। আমি অকাট্য প্রমাণ পেলে সব বলব।’ যদিও এখনও এই ঘটনা সম্পর্কে কোনও প্রমাণাদিই সামনে আনেনি পাক সরকার।
অন্যদিকে, পাক পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে দাবি করে, হামলাকারী সম্ভবত একজন আফগান নাগরিক। দুই সপ্তাহ আগে সে পাকিস্তান প্রবেশ করেছিল। আশ্রয় নিয়েছিল রাওয়ালপিন্ডিতে। এই আবহেই ISIS-এর স্বীকারোক্তি অনেক বিষয়ই পরিষ্কার করে দিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
প্রসঙ্গত, প্রাথমিকভাবে হামলাকারীকে আটকানো গেলেও বিস্ফোরণের তীব্রতায় বিধ্বস্ত হয়ে যায় মূল গেট। আশপাশের বাড়ির জানলা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ধ্বংসাবশেষ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে রাস্তায়। কয়েকটি দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিটকে গিয়েছে বিস্ফোরণের ধাক্কায়।
ঘটনার পরই গোটা শহরে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন ইসলামাবাদ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল । দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় উদ্ধারকারী দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা। আহতদের তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস এবং পলিক্লিনিক হাসপাতালে । চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বহু আহতের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ইতিমধ্যে এই ভয়াবহ আত্মঘাতী বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট পাকিস্তান প্রভিন্স । সংগঠনের সরকারি প্রচারমাধ্যম আমাক নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে হামলাকারীর নাম জানানো হয়েছে সইফুল্লা আনসারি। নিরাপত্তা সংস্থার বক্তব্য, হামলার ধরন ইসলামিক স্টেট-ঘনিষ্ঠ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির চেনা ছকের সঙ্গে মিলে যায়। আত্মঘাতী পোশাকের ব্যবহার এবং স্পষ্টতই সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষই লক্ষ্যবস্তু ছিল। এই ঘটনার ফলে ফের পাকিস্তানের শহরাঞ্চলে জঙ্গি হুমকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ল। হামলার পর থেকেই ইসলামাবাদে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।
এর আগেও আত্মঘাতী বিস্ফোরণে কেঁপেছিল ইসলামাবাদ। ঠিক তিন মাস আগে, ১১ নভেম্বর ২০২৫-এ, জেলা ও সেশন কোর্টের বাইরে বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলেন ১২ জন। জখম হয়েছিলেন ৩০ জনেরও বেশি। তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের বড়সড় হামলা।



