
বিশ্বরাজনীতির দাবার চালে ফের মাস্টারস্ট্রোক ভারতের! পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন প্রায় চরম সীমায়, ঠিক তখনই ভারতের জন্য বড় স্বস্তির খবর এল তেহরান থেকে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের সঙ্গে ইরানের তীব্র সংঘাতের কারণে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বা ‘হরমুজ় প্রণালী’ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল কার্যত লাটে উঠেছে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতেই ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিল, ভারতীয় জাহাজগুলোর জন্য এই পথ সম্পূর্ণ নিরাপদ। ভারতকে ‘প্রকৃত বন্ধু’ হিসেবেই দেখে তেহরান।

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই বড় স্বস্তির খবর ভারতের জন্য। হরমুজ প্রণালী নিরাপদে পার করেছে ভারতের দু’টি তেলবাহী জাহাজ। আরও আটটি অপেক্ষা করছে হরমুজ প্রণালীর ঠিক আগে। সেগুলিকেও যাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তা নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গ কথা বলছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। যুক্তরাষ্ট্র , ইজরায়েল এবং ইরানকে ঘিরে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই এই ঘটনা ঘটায় স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি মিলেছে।

ভারত ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা হওয়ার পরই প্রথম জাহাজ দু’টি নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পার হতে পেরেছে। আশা করা হচ্ছে, বাকিগুলোও খুব শীঘ্রই ওই প্রণালী পেরিয়ে দেশে ঢুকবে।

আসলে এই প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। ভারতের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশও এই পথেই আসে। ফলে সেখানে বিঘ্ন ঘটলে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের জ্বালানি সরবরাহে। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে গিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে আগেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলির সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। সেই আশঙ্কাতেই বহু আন্তর্জাতিক ট্যাঙ্কার এবং কার্গো জাহাজ এখন এই পথ এড়িয়ে চলছে।
গত কয়েক দিনে হরমুজ প্রণালীর কাছে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাও সামনে এসেছে। থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার ‘এমভি মায়ুরি নারি’ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আগুনে পুড়ে যায়। ওই ঘটনায় জাহাজের কয়েক জন নাবিক নিখোঁজ হয়েছেন। এছাড়া ‘ওয়ান ম্যাজেস্টি’ এবং ‘স্টার গুইনেথ’ নামে আরও কয়েকটি জাহাজ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরাকের জলসীমার কাছে ‘সেফসি বিষ্ণু’এবং ‘জেফিরস’ নামে দুই জ্বালানি ট্যাঙ্কারেও বিস্ফোরক বোঝাই নৌকা দিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যে ভারত কূটনৈতিক স্তরে দ্রুত তৎপরতা শুরু করে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সরাসরি ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল—ভারতগামী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
জয়শঙ্করের বক্তব্য ছিল পরিষ্কার—ভারতীয় জাহাজগুলি নিয়মিত বাণিজ্যিক কাজেই চলাচল করছে। বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে সেগুলি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সূত্রের দাবি, সেই বার্তাকেই গুরুত্ব দিয়েছে তেহরান।
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছে।

ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্পেও ভারতের অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া ইরানের কয়েকজন ভারতে আটকে পড়েছেন, তাদের দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছে দিল্লি। কূটনীতিকদের মতে, এই সব বিষয় মাথায় রেখেই ইরান ভারতীয় জাহাজ যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছে এবং বর্তমানে যেগুলো অপেক্ষা করছে, সেগুলোকেও ছেড়ে দেবে।
তবে পরিস্থিতি এখনও অস্থির। তাই জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক নজর রাখা হচ্ছে সরকারের তরফে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইরানের এই ঘোষণা ভারতের বড় কূটনৈতিক জয়। গত কয়েকদিনে ভারতের ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে অন্তত তিনবার টেলিফোনে আলোচনা করেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। মূল বিষয় ছিল হরমুজ় প্রমালী দিয়ে ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলির নিরাপত্তা এবং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা। শুক্রবার সকালে ফের একবার দুই পক্ষের কথা হয়। এর পরেই এই বিষয়টি নিশ্চিত করলেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।



