

সীমান্তে চলছে গুলি, রাতভর চলল গোলাবর্ষণ। তুমুল সংঘাত পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মধ্যে। আফগানিস্তানের তালিবান প্রশাসনের দাবি, সীমান্তে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনার মৃত্যু হয়েছে। এদিকে, আফগানিস্তানের হামলার পরই পাল্টা জবাব দিয়েছে পাকিস্তান। রাতভর একাধিক আফগান শহরে এয়ারস্ট্রাইক চালিয়েছে বলেই খবর। খোলা যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে পাকিস্তান। কাবুল, কান্দাহারে হামলা চালানো হচ্ছে বলেই খবর।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা হঠাৎ করেই বড়সড় সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। তালিবান শাসিত আফগানিস্তানের দাবি, সীমান্তবর্তী লড়াইয়ে অন্তত ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান একাধিক আফগান শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে এই সংঘর্ষ কূটনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শুক্রবার ভোরে কাবুল বিস্ফোরণের শব্দ এবং যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শোনা যায়। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তালিবান দাবি করে, বিতর্কিত ডুরান্ড লাইনের একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও পোস্ট তারা দখল করেছে। যদিও পাকিস্তান এই দাবি অস্বীকার করে জানিয়েছে, আফগান যোদ্ধাদের উপরই বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি তারা ঘটিয়েছে।

তালিবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লা মুজাহিদ অভিযোগ করেন, পাকিস্তান কাবুল, কান্দাহার এবং পাকতিয়া অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, “কা |পুরুষোচিত ভাবে পাকিস্তানি সেনা কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার কিছু এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।”
আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা নাগাদ তাদের পাল্টা অভিযান শুরু হয়। তাদের অভিযোগ, এর আগে পাকিস্তানি সেনা আফগান ভূখণ্ডে ঢুকে মহিলা ও শিশুদের হত্যা করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে পাকতিকার কাছে কিছু অঞ্চলে তো বটেই, পাশাপাশি পাকতিয়া, খোস্ত, নাঙ্গারহার, কুনার ও নুরিস্তান প্রদেশের কাছে ডুরান্ড লাইনের বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত পাল্টা আক্রমণ চালানো হয়।

চার ঘণ্টার এই সংঘর্ষে দু’টি পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি ও ১৯টি পোস্ট দখলের দাবি করেছে আফগানিস্তান। আরও চারটি পোস্ট থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায় বলেও দাবি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী—
৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত
একাধিক সেনার মৃতদেহ আফগানিস্তানে নিয়ে আসা হয়েছে
কয়েকজন সেনাকে জীবিত আটক করা হয়েছে
বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত
একটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস
একটি বড় সামরিক পরিবহন যান দখল
রাত বারোটার পর সেনাপ্রধানের নির্দেশে অভিযান শেষ হয় বলে জানানো হয়েছে।

তবে এই লড়াইয়ে আফগানিস্তানেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ৮ জন তালিবান যোদ্ধা নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছে বলে স্বীকার করেছে কাবুল। পাশাপাশি, নাঙ্গারহারের একটি শরণার্থী শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন সাধারণ মানুষ, যাদের মধ্যে মহিলা ও শিশুও রয়েছে, আহত হয়েছে বলে দাবি।তবে এই সমস্ত দাবির কোনওটাই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পাকিস্তানের পাল্টা দাবি
আফগানিস্তানের দাবি পুরোপুরি খারিজ করেছে পাকিস্তান। তথ্য মন্ত্রী আতাউল্লা তারার জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ২ জন সেনা নিহত হয়েছে, ৩ জন আহত এবং পাল্টা লড়াইয়ে ৩৬ জন আফগান যোদ্ধা নিহত হয়েছে।
তিনি বলেন, “উস্কানিহীন গুলির জবাবে পাকিস্তান শক্ত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে এবং নিজের ভূখণ্ড রক্ষায় অটল থাকবে।”

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মুখপাত্র মোশাররফ আলি জাইদি দাবি করেছেন, কোনও পাকিস্তানি সেনা আটক হয়নি।
রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারিও কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, “শান্তিকে দুর্বলতা ভাবলে তার জবাব কঠোরভাবেই দেওয়া হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনও আপস নয়।”
পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দাবি, আফগান তালিবান বাহিনীই প্রথম উস্কানিহীন পরিস্থিতিতে গুলি চালায় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের একাধিক সীমান্ত এলাকায়। এরপরই পাকিস্তান পাল্টা জবাব দেয়।
চিত্রাল, খাইবার, মোহমান্দ, কুররাম ও বাজাউর সেক্টরে তালিবান বাহিনীকে “শাস্তি দেওয়া হচ্ছে” বলেও জানানো হয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, আফগান পক্ষের বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং তাদের একাধিক পোস্ট ও সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে।
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে টোরখাম সীমান্ত এলাকাতেও, যা দুই দেশের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ। সেখানে গোলাগুলিতে কয়েকজন শরণার্থী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
আফগানিস্তান শরণার্থী শিবির খালি করতে শুরু করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের দিকেও বাসিন্দাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা আফগান শরণার্থীদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে লক্ষাধিক মানুষকে ইতিমধ্যেই দেশছাড়া করেছে পাকিস্তান।
২,৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে বিবাদের কেন্দ্র। আফগানিস্তান এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা চরমে ছিল। অক্টোবর মাসে সংঘর্ষে সেনা, সাধারণ মানুষ ও জঙ্গিদের মৃত্যু হয়। পরে কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও মাঝেমধ্যেই গোলাগুলি চলছিল। সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষ সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিল।




