

আরজি কর হাসপাতালে (RG Kar Case) তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গোড়া থেকেই সরব ছিলেন তিনি। এবার রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সেই বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। শুক্রবার নবান্ন থেকে তিন হেভিওয়েট আইপিএস অফিসারের সাসপেনশনের কথা ঘোষণা করলেন তিনি। কর্তব্যে গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ লোপাটের চেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়েছে এডিজি আইবি বিনীত গোয়েল (Vineet Goyal), আইপিএস ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় (Indira Mukherjee) এবং আইপিএস অভিষেক গুপ্তকে (Abhishek Gupta)।পাশাপাশি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে জানিয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু।

এ দিন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আরজি করের ঘটনায় পুলিশের ‘মিসহ্যান্ডলিং’ এবং তদন্তকে ভুল পথে চালিত করার যে অভিযোগ উঠেছিল, তার বিরুদ্ধেই এই ব্যবস্থা। শুভেন্দুর অভিযোগ, খুনের ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে স্বচ্ছতার অভাব ছিল। মৃতার পরিবারকে বেআইনিভাবে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্যায় করলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
সাসপেনশনই শেষ কথা নয়, শুক্রবার দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী আবারও মনে করিয়ে দেন যে, আরজি করের ঘটনার ফাইল তিনি নতুন করে খুলতে চলেছেন। তড়িঘড়ি তদন্ত শেষ করার যে চেষ্টা আগে হয়েছিল, তার গভীরে গিয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে চান তিনি। একই সঙ্গে সাসপেন্ড হওয়া ওই তিন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

২০২৪ সালের অগস্ট মাসে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা রাজ্য রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। সেই উত্তাল সময়ে কলকাতার আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা তিন আইপিএস আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের দায়িত্ব থেকে অপসারণের পথে নিয়ে যায়।
আরজি কর কাণ্ডের সময় কলকাতা পুলিশের কমিশনার (সিপি) ছিলেন বিনীত গোয়েল। ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জুনিয়র চিকিৎসকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। ‘বিচার’ এবং ‘তদন্তে স্বচ্ছতা’র দাবিতে রাজপথে নামেন হাজার হাজার মানুষ।

আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বিনীত গোয়েলের পদত্যাগ। শেষ পর্যন্ত জুনিয়র চিকিৎসকদের দীর্ঘ আন্দোলনের চাপে ২০২৪-এর সেপ্টেম্বরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে লালবাজারের শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দেন। বিনীতকে তখন এসটিএফ-এর এডিজি ও আইজিপি পদে বদলি করা হয়েছিল।
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ এলাকাটি কলকাতা পুলিশের উত্তর বিভাগের (নর্থ ডিভিশন) অন্তর্গত ছিল। সেই সময় সেখানকার ডিসি পদে দায়িত্বরত ছিলেন অভিষেক গুপ্ত। ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়ে তদন্তে চরম গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে খামতির অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। চিকিৎসকদের প্রবল অসন্তোষ ও প্রশাসনিক চাপে সেই সময় তাঁকেও ডিসি (নর্থ) পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তদন্ত চলাকালীন কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) ছিলেন আইপিএস ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আরজি কর কাণ্ড পরবর্তী জটিল পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে বার বার দেখা যেত তাঁকে। এক প্রকার কলকাতা পুলিশের প্রধান ‘মুখ’ হিসেবে আত্মপক্ষ সমর্থনে সরব হয়েছিলেন তিনি। তবে তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে তাঁর দেওয়া বিভিন্ন বয়ান সেই সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।
২০২৪-এর সেই অভিশপ্ত ঘটনার রেশ ধরেই বর্তমান সরকার এই তিন আধিকারিকের বিরুদ্ধে চরম প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল। গত জমানায় কেবল পদ বদল হলেও, নতুন জমানায় সরাসরি ‘সাসপেনশন’ এবং ‘বিচারবিভাগীয় তদন্তের’ মুখে পড়তে হল বিনীত-ইন্দিরা-অভিষেককে।

উল্লেখ্য, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই শুভেন্দু ঘোষণা করেছিলেন আবার আরজি কর মামলার তদন্ত শুরু হবে। ইতিমধ্যে বিজেপির টিকিটে জিতে পানিহাটি থেকে বিধায়ক হয়েছেন নির্যাতিতার মা। বুধবার তিনি আদালতে যান তিন জনের গ্রেফতারির দাবিতে। ওই তিন জন হলেন পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দাস এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়।পানিহাটির বর্তমান বিধায়কের অভিযোগ, তাঁর নির্যাতিতা মেয়ের দেহের দ্বিতীয় বার ময়নাতদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছিল। নথি হস্তান্তর না-করে তড়িঘড়ি দেহ দাহ করা হয়েছিল।
শুভেন্দুর ঘোষণার পরে নির্যাতিতার মা তথা পানিহাটির বিধায়ক বলেন, ‘‘আগের সরকার কোনও পদক্ষেপ করেনি। মেয়ের কেসে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর পদক্ষেপে আমরা খুশি।’’



