শিল্প অধ্যায় এড়ালেন মোদী,টাটা ফেরানোর বার্তা না-শুনেই ফিরল জনতা, অস্বস্তিতে রাজ্য নেতৃত্ব

0
46

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের জমানায় বিহারকে ‘জঙ্গলরাজ’ বলে কটাক্ষ করতেন বিরোধীরা। রবিবার সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকে ‘মহা-জঙ্গলরাজ’ আখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একই সঙ্গে মালদার সভার মতোই অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও তোপ দাগলেন তিনি। মোদী বললেন, ‘দেশের সুরক্ষা নিয়ে খেলছে তৃণমূল।’ গত কয়েকদিন ধরেই সিঙ্গুরের জমিতে ফের শিল্প গড়ে ওঠা, টাটাদের ফেরানোর আশা দেখাচ্ছিলেন বিজেপির ছোট-বড় নেতারা। প্রধানমন্ত্রী সেই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য না করায় হতাশ অনেকেই।তবে বিনিয়োগের জন্য সঠিক আইনশৃঙ্খলা জরুরি বলেও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তিনি।

সিঙ্গুরবাসী চেয়ে ছিলেন । এই বুঝি ভরা জনসভা থেকে ‘টাটার কারখানা’ নিয়ে কিছু একটা বলবেন প্রধানমন্ত্রী। প্রবাদেই আছে ‘আশায় বাঁচে চাষা’। সেই কথাই সত্যি করে দিয়ে কারখানার ব্যাপারে টুঁ শব্দটি করলেন না নরেন্দ্র মোদী ।

যে সিঙ্গুর আন্দোলন এক সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের  উত্থানের ভিত গড়েছিল, সেই সিঙ্গুরকেই  হাতিয়ার করে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে কোণঠাসা করতে চাইছে বিজেপি— এমনই জল্পনা চলছিল গত কয়েক দিন ধরে। কিন্তু টাটার মাঠে সভা করেও শিল্পের সেই প্রতীকি অধ্যায় কার্যত এড়িয়েই গেলেন প্রধানমন্ত্রী।

দুর্নীতি, অনুপ্রবেশ, আইনশৃঙ্খলা— একাধিক ইস্যুতে রাজ্যের তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ শানালেও শিল্পায়নের প্রশ্নে মোদী ছিলেন প্রায় নীরব। পশ্চিমবঙ্গে কারখানা ফেরানো বা শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি শোনা যায়নি তাঁর বক্তৃতায়। শুধু আইনশৃঙ্খলার উন্নতির কথা বলে বিনিয়োগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী।

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তা নির্বাচনী ভাষণের চেনা মোড়ক ছাড়া আর কিছুই নয়।
আর সেই নীরবতাই সভা শেষে ক্ষোভে বদলে যায় সিঙ্গুরের মাটিতে। অনুষ্ঠান শেষে অনেকেই বলাবলি করছেন, এত দিন টাটা বন্ধ থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু করেননি— সেই আশাতেই মোদীর সভায় এসেছিলেন তাঁরা। ভেবেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী এসে কারখানার বিষয়ে কিছু বলবেন। কিন্তু শিল্পের প্রসঙ্গই এল না। গরিব মানুষের কাজের কথা, এলাকার ভবিষ্যৎ কিছুই শোনা গেল না।

আবার কেউ বলছেন, শিক্ষিত যুবকেরা বছরের পর বছর চাকরির আশায় বসে আছেন। অথচ সভা থেকে কোনও স্পষ্ট বার্তা মিলল না। কেউ কেউ আরও তীব্র ভাষায় বলেন, সিঙ্গুরের মানুষ ভেবেছিলেন মোদী চাষ, সার, কৃষকদের কথা বলবেন। কিন্তু তার বদলে শোনা গেল জাতীয় রাজনীতির পুরনো কথাই।

এই হতাশার পটভূমিতে আরও প্রকট হয়ে উঠল বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের আগের বক্তব্য। এসআইআর বিতর্কের আবহে অনুপ্রবেশ ইস্যুকে সামনে রেখে আগেই নির্বাচনী সুর বেঁধেছিলেন মোদী-অমিত শাহ। পাশাপাশি সিঙ্গুর ও টাটাকে কেন্দ্র করে রাজ্য বিজেপির একাংশ আশা বাড়িয়েছিল। বিশেষ করে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্যে জোরাল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, ২০২৬-এ বাংলায় বিজেপি সরকার এলে টাটাকে সিঙ্গুরে ফিরিয়ে আনা হবে। আন্দোলনের মুখগুলির ‘ভুল’ স্বীকারের কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি।

এদিন, সভামঞ্চে উঠে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। বলেন, ‘ব্যাড এম’ ছেড়ে ‘গুড এম’-এর কাছে যাওয়া রতন টাটার প্রসঙ্গ টেনে জানান, আজ সেই ‘গুড এম’ সিঙ্গুরে। কিন্তু তার পর দীর্ঘ বক্তৃতা করেও প্রধানমন্ত্রী টাটা বা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি শব্দও খরচ করলেন না।

ফলে সকাল থেকেই টাটার ন্যানো গাড়ির আদলে কাঠামো বানিয়ে, শিল্পের দাবিতে স্লোগান লিখে যাঁরা সভাস্থলে জড়ো হয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ ফিরলেন নিরাশ হয়ে। জমি অধিগ্রহণ থেকে আন্দোলন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া থেকে বহু প্রতীক্ষিত শিল্প ফেরার স্বপ্ন— সব মিলিয়ে সিঙ্গুরের ইতিহাসে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। কিন্তু চাষও ফেরেনি, ভারী শিল্পও আসেনি।

অনেকেরই আবার মত, সিঙ্গুরের জমি ব্যক্তিগত ও কৃষকদের জমি— সেখানে শিল্প করতে হলে জমি কিনতে হবে বা অধিগ্রহণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তা জানেন বলেই সচেতন ভাবে এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছেন। সিঙ্গুরের সভা তাই শুধু রাজনৈতিক আক্রমণের মঞ্চ হয়ে রইল। শিল্প ফেরার স্বপ্ন, টাটার প্রত্যাবর্তনের আশা, সবই আপাতত রয়ে গেল প্রশ্নচিহ্নের ঘেরাটোপে।

এ দিনের জনসভার আগে হুগলিতেই ৮৩০ কোটির প্রকল্পের উদ্বোধন করেন মোদী। হুগলির বলাগড়ে এক্সটেন্ডেড পোর্ট গেট সিস্টেমের শিলান্যাস করার পাশাপাশি জয়রামবাটি-ময়নাপুর রেললাইনের উদ্বোধন করেন তিনি। তিনটি নতুন অমৃত ভারত এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি লোকাল ট্রেনেরও সূচনা করেন। উদ্বোধন করেন ইলেকট্রিক ক্যাটামেরান পরিষেবার। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এই বিশেষ লঞ্চ ৫০ জন যাত্রীকে নিয়ে পরিবহণ সক্ষম।

Previous articleড্রোনের মাধ্যমে তাজা মাছ এবার পৌঁছে যাবে শহরে,সুন্দরবনে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
Next articleবারাসতের বিদ্যাসাগর মঞ্চে চৌধুরী সুধীরথের ‘কালজয়ী ২য় খন্ড’ বই প্রকাশ : দেখুন ভিডিও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here