শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময়ই গুলিবিদ্ধ!চন্দ্রনাথকে শেষ জীবিত অবস্থায় দেখেছিলেন , কী বলেছিলেন তিনি?

0
2

বুধবার, রাত তখন ২টো। মধ্যগ্রামের ভিভা সিটি হাসপাতালের ওয়েটিং লাউঞ্জে তখন বিজেপির অন্তত চল্লিশ জন বিধায়ক। কেউ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে, কেউ উত্তেজিত। সেই সঙ্গে কম করে আরও একশ জনের বেশি নেতা-কর্মী। হাসপাতালের গেটের বাইরে থইথই করছে কর্মীদের ভিড়। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী ঘিরে রেখে গোটা এলাকা। লাউঞ্জের চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসেছিলেন শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ । দেখেই মনে হচ্ছে, শরীর ছেড়ে দিয়েছে। এখনও বিশ্বাসই করতে পারছেন না, এমনও হতে পারে!

শুক্রবার বিজেপির বিধায়ক দলের বৈঠকের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর কলকাতায় আসার কথা। শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বুধবার রাত ১০ টা নাগাদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভার এক্সিকিউটিভ অ্যাসিসট্যান্ট চন্দ্রনাথকে ফোন করে দু’দিনের সেই সব প্রোগ্রামের শিডিউল নিয়েই কথা বলছিলেন শঙ্কর ঘোষ।

শুভেন্দু প্রায় সারাক্ষণই কোনও না কোনও ফোনে থাকেন, বা ব্যস্ত থাকেন। তাই অনেক সময়ে তাঁকে আর ফোন না করে বিজেপি নেতারা চন্দ্রনাথের সঙ্গে কথা বলে নিতেন। চন্দ্রনাথও খুব এলেমের সঙ্গেই সবার সঙ্গে এই যোগাযোগ বা সমন্বয়ের কাজটি করতেন।

বুধবার রাত ১০টার পর তেমনই চন্দ্রনাথের সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল শঙ্কর ঘোষের। ফোনটা শঙ্কর ঘোষই করেছিলেন। শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়কের কথায়, “হঠাৎ চন্দ্রর কথা জড়িয়ে গেল.. আর যেন এক সঙ্গে দু-তিনটে গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি বললাম, চন্দ্র তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? চন্দ্র…ও চন্দ্র! আর সাড়া নেই”।

ফোনটা কেটে দিয়ে ফের চন্দ্রনাথকে রিং করেন শঙ্কর ঘোষ। অনেকক্ষণ রিং হয়। “তার পর একজন ফোন ধরে বলেন, স্যারকে গুলি করে দিয়েছে। আমি বললাম, বলছ কী? কে? চন্দ্রর জ্ঞান আছে তো? বলল, বুঝতে পারছি না স্যার”।

শঙ্কর জানান, এর পরই তিনি শুভেন্দুকে ফোন করেন। শুভেন্দু ফোন না ধরায় কাঁপা কাঁপা হাতে টেক্সট মেসেজ করেন শঙ্কর। ততক্ষণে কলকাতা ছেড়ে কোলাঘাট পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কাঁথিতে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন। মেসেজটা দেখেই শঙ্করকে ফোন করে বলেন, ‘কী বলছেন কী শঙ্কর? কী বলছেন এটা?’

শঙ্করকে মধ্যগ্রামের দিকে রওনা হয়ে যেতে বলেন শুভেন্দু। জানান, তিনিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছচ্ছেন।  
বুধবার রাতে চন্দ্রনাথ রথকে এভাবে গুলি করে খুনের ঘটনা যেন বিজেপি নেতারা কেউই প্রথম বার শুনে বিশ্বাসই করতে পারেননি। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দুর লড়াইয়ে যাবতীয় কোঅর্ডিনেশনের কাজটি করেছিলেন শঙ্কর। পূর্ব মেদিনীপুরে চণ্ডীপুরে তাঁর বাড়ি। ইদানীং মধ্যগ্রামের একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন।

বুধবার বিধানসভার গাড়িতেই বাড়ি ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ। সরকারি গাড়ি। হঠাৎ তাঁর গাড়ির পথ আটকায় দুষ্কৃতীরা। তার পর মোটরসাইকেল নিয়ে এসে আততায়ীরা গুলি করে ঝাঁধরা করে দেয় চন্দ্রনাথের বুক। পাঁচটা গুলি লাগে তাঁর বুকে। সম্ভবত তিনটে গুলি লাগে গাড়ির চালকেরও। এই গুলি লাগা অবস্থাতেই গাড়ি চালিয়ে ভিভা সিটি হাসপাতালে পৌঁছন চালক। আততায়ীরা যখন গুলি চালায় পিছনের সিটে বসে থাকা চন্দ্রনাথের সহযোগী মাথা নিচু করে বসে পড়েন, তাই বেঁচে যান।

শঙ্কর যখন এদিকে লাউঞ্জে বসে, তখনও ইমার্জেন্সিতে চন্দ্রনাথের নিথর দেহ থেকে গুলি বের করা চলছে। দুটো গুলি ততক্ষণে বের করা গেছে। কেউ বলে উঠলেন, নাইন এম এম!

কাছেই শুভেন্দু অধিকারীকে তখন ঘিরে রেখেছেন বিজেপি বিধায়করা। রাজেশ কুমার, রুদ্রনীল ঘোষ, তরুণজ্যোতি তিওয়ারি, সজল ঘোষ, স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ। ছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতি মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারও। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তাও ছিলেন।
ডিজি-কে দেখেই শুভেন্দু বলেন, ‘এদের একটাও যেন পার না পায়। যত দ্রুত ধরতে হবে’। শুভেন্দুর মুখ চোখও বসে গেছে। দৃশ্যত বিধ্বস্ত। ডিজি তাঁকে বলেন, ‘স্যার! দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওরা রেইকি করে খুন করেছে। উনি যে এই রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরেন ওরা জানত। গাড়ির নাম্বারও জানত। খুব প্ল্যান করেই খুন করেছে।’

কিন্তু এই খুনের নেপথ্যে কে? শুভেন্দুকে ভয় পাইয়ে দিতেই কি এই খুন! বুধবার রাতে যে কথাগুলো মধ্যগ্রামের হাসপাতালে উঠে আসছিল, তার সবটাই রাগের কথা, ক্ষোভের কথা, চোয়াল শক্ত করা কথা। তবে সবাইকে যথাসম্ভব সংযত থাকতে বলেন শুভেন্দু। বলেন, ‘পুলিশই তদন্ত করবে। কাউকে ছাড়া হবে না। কাউকে না’।

প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১০.২০!  তিনি রোজকার মতো কুকুরদের খাওয়াতে এসেছিলেন। তখন রাস্তা দিয়ে কয়েকজনকে দৌড়তে দেখেন। তাঁরা চিৎকার করতে থাকেন, ‘গুলি করে দিয়েছে…’ তখনও ঠাওর করতে পারেননি ঠিক কী হয়েছে! যতক্ষণে সেই অভিশপ্ত স্করপিওর কাছে যান, তখনও ধুক ধুক করছে প্রাণ! জীবিত অবস্থায় চন্দ্রনাথকে তিনিই শেষ দেখেছিলেন, কী বলেছিলেন চন্দ্রনাথ? সংবাদ মাধ্যমকে জানালেন প্রত্যক্ষদর্শী।

সুশান্ত সরকার নামে মাঝবয়সী ওই প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, “আমি ১০-১০.২০র মধ্যে বাচ্চা কুকুরগুলোকে খেতে দিচ্ছিলাম। সে সময়ে একজন চিৎকার করতে করতে যাচ্ছিল, গুলি মেরে দিল… আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কাকে গুলি মেরে দিল? বলছে ওই দেখো গুলি মেরে দিল, গাড়ির মধ্যে পড়ে রয়েছে। দেখলাম গাড়ির মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছে।”

তাঁর কথায়, স্করপিওর সামনে গার্ড করা ছিল আরেকটা ফোর হুইলার। তিনি বলেন, “স্করপিওতে কাচ তোলা, কিন্তু কাচগুলো গুলির দাগ, ভাঙা। দরজাটা একজন খুলে দিল। গাড়ি পুরো রক্তে ভাসছে। গাড়ির ভিতর থেকেই একজন বলল, স্যরকে গুলি মেরে দিয়েছে! তুললাম যখন, তখন দুজনেই জীবিত ছিলেন। কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন। শ্বাস পড়ছিল। আমি তখন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললাম। আমি ফোন করলাম থানায়।”

তাঁর দাবি, “ওই গাড়ি নিয়েই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার সামনে তিনটে খোল পড়েছিল গুলির। গাড়ির সামনে একটা অল্টো দাঁড়ানো ছিল। নম্বরবিহীন।” জানা যাচ্ছে, সরু গলির মধ্যে ওই গাড়ি এসেই চন্দ্রনাথের স্করপিও আটকায়। যাতে চালক গতি না বাড়াতে পারেন। তারপরই বাইকে এসে দুষ্কৃতীরা একেবারে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালায়। এলোপাথাড়ি গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান চন্দ্রনাথ।

চন্দ্রনাথের খুন নিয়ে এখন বিস্তর ধোঁয়াশা। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকালেও CID তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। নমুনা সংগ্রহ করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। সে নম্বরবিহীন চার চাকা গাড়ির কথা প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, সেটি যে আসলে চুরির গাড়ি, তা ইতিমধ্যেই তদন্তকারীদের কাছে স্পষ্ট।

Previous articleএকদিনের রাষ্ট্রপতি শাসন হবে বাংলায়? বেনজির সাংবিধানিক সঙ্কট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here