‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর নায়ক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে স্তব্ধ টলিউড! ঠিক কী ঘটেছিল শুটিং -এর সময়

0
147

প্রয়াত জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২ বছর। জানা গিয়েছে, ২৯ মার্চ রবিবার তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাঁর! দুর্ঘটনার শিকার হন। এদিন সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। ওড়িশার তালসারি সংলগ্ন অঞ্চলের সমুদ্রে বোটে চেপে ঘোরার সময় বোট থেকে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে উদ্ধার করে ওড়িশার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে অভিনেতাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছে চিকিৎসকের দল। এইমুহূর্তে অভিনেতার দেহ দীঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছে।

পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের  শুটিং চলাকালীন কোনওভাবে সমুদ্রে নেমেছিলেন রাহুল। এবং তলিয়ে যান!  তারপর দীর্ঘক্ষণ ধরে তাঁর খোঁজ না পাওয়া যাওয়ায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। এরপর তাঁর দেহ পাওয়া গেলে ৬টা ২০নাগাদ তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে, চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে। পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করেছে এবং অভিনেতার দেহটিকে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আগামীকাল কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে ময়না তদন্ত হবে। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিউড থেকে থিয়েটার জগতে।

রাহুলের মৃত্যুর প্রতি মুহূর্তের বর্ণনা পরিচালক শুভাশিসে মণ্ডলের
‘ভোলেবাবা পার করেগা’র পরিচালক

গতকাল, আজ সারাদিন শুটিং হয়েছে। বেলা তিনটে নাগাদ একদফা প্যাকআপ হয়, অভিনেতারা প্রায় সকলেই কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেন। রাহুলদা (রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।) ছিল, নায়িকা শ্বেতাও ছিল। ওদের কিছু শট বাকি ছিল।

বিকেল ৫টা নাগাদ তালসারি বিচে শুটিং হচ্ছিল। রাহুলদা (Rahul Arunoday Banerjee News)  গোড়ালি অবধি জলে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল। শট যেভাবে নেওয়ার কথা ছিল, সেটার বাইরে গিয়ে রাহুলদা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আমরা বলেছিলাম যেও না, কেনই বা যাবে, সেটা তো শটে ছিল না।

তাও রাহুলদা এগোচ্ছিল। একটু এগিয়ে যাওয়ার পরই আমাদের মধ্যে যে কয়েকজন সাঁতার জানে, তারা পিছন পিছন এগিয়ে যায়। তখন কোমর অবধি জলে চলে গেছে। তখনও শ্বেতার হাতটা ধরা ছিল। পাশে ছোট ছোট বোটও ছিল। ওরা অত দূরে চলে যাওয়ায়, ব্যাপারটা রিস্কি লাগছে বুঝে আমাদের মধ্যেই সাত-আট জন এগিয়ে যায়, যাতে কোনও গন্ডগোল হলে সামাল দেওয়া যায়। বোটগুলোও আসতে থাকে।

ততক্ষণ অবধিও মেয়েটার হাত ধরা ছিল, কিন্তু সেই অবস্থাতেই ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলে রাহুলদা। ডুবছে, উঠছে এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়, অনেকটা জলও খেয়ে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে পাড়ে নিয়ে আসা হয়। তখনও জ্ঞান ছিল। তারপর রাহুলদাকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া হয়। আমি যাইনি, কিন্তু শুনেছিলাম, গাড়িতেও সেন্স ছিল। তারপর শুনলাম হাসপাতালে যাওয়ার পর এক্সপায়ার করে গেছে!

আমি সারাদিন শুটিংয়ের মধ্যেই ছিলাম আজ। রাহুলদা মদ্যপান করেছিল কিনা, সেটা ঠিক আমি বলতে পারব না।

তবে দুর্ঘটনাটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমার শট কিন্তু সমুদ্রের দিকে যাওয়ার ছিল না। সমুদ্রের ধারে গোড়ালি জলেই দাঁড়িয়ে কথা বলার শট ছিল। শ্বেতা আর রাহুলদা দুজনেই ওখানে ছিল। কিন্তু রাহুলদা হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে। সমস্যাটা এখানেই হয়েছে। বোট আশেপাশেই ছিল সব। তবু শেষ রক্ষা হল না।

১৯৮৩ সালের ১৬ অক্টোবর জন্ম রাহুলের। একেবারে শিল্পী পরিবারে বেড়ে ওঠা—তাঁর বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’ নাট্যদলের পরিচালক। সেই সূত্রেই মাত্র তিন বছর বয়সে মঞ্চে প্রথম পা রাখা। ‘রাজ দর্শন’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু, আর তারপর দীর্ঘ পথচলায় প্রায় ৪৫০টিরও বেশি নাট্যমঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি—যা তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ।

রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া হয় চিরদিনই তুমি যে আমার (Chirodini Tumi Je Amar) ছবির মধ্যে দিয়ে। পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। ছবিটি বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায় এবং রাহুলকে রাতারাতি তারকা করে তোলে। এই ছবির জন্য সেরা অভিনেতার সম্মানও পেয়েছিলেন রাহুল।

পরবর্তী সময়ে তিনি ‘লাভ সার্কাস’, ‘শোনো মন বলি তোমায়’, ‘পতি পরমেশ্বর’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘ব্যোমকেশ ফিরে এল’ সহ বহু ছবিতে অভিনয় করে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেন। অভিনয়ের বৈচিত্র্য ছিল তাঁর অন্যতম শক্তি—বাণিজ্যিক থেকে বিষয়ভিত্তিক, সব ধারাতেই তিনি সাবলীল।

ছোটপর্দায় তাঁর আত্মপ্রকাশ ‘খেলা’ ধারাবাহিকে। পরে ‘তুমি আসবে বলে’, ‘দেশের মাটি’, ‘লালকুঠি’, ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিয়ালে অভিনয় করে দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান।

ওয়েব সিরিজেও তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়—‘কালি’, ‘পাপ’, ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’, ‘ইন্দুবালা ভাতের হোটেল’-এর মতো প্রজেক্টে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে।

সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রাহুল। তাঁদের এক পুত্র রয়েছে। নাম সহজ। ২০১৭ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হলেও ২০২৩ সালে আবার একত্রে থাকতে শুরু করেন তাঁরা—যা তাঁদের সম্পর্কেরও এক নতুন অধ্যায় ছিল।

মঞ্চ, সিনেমা, টেলিভিশন—সব মাধ্যমেই সমান সাবলীল এই অভিনেতা তাঁর অভিনয়, সংবেদনশীলতা এবং নিষ্ঠার জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার পর ইদানীং সহজ কথা (Sahaj Katha) নামে একটি পডকাস্ট সিরিজ শুরু করেছিলেন। তাও তাঁর উপস্থাপন শৈলীতে খুব কম সময়েই বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।  
রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে বাংলা বিনোদন জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হল।

Previous articleমেয়ের সামনেই মাকে কুপিয়ে খুন ,কসবায় হাড়হিম করা কাণ্ড!
Next articleকামদুনির প্রতিবাদী মুখ টুম্পা কয়াল যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে , কী বললেন সহযোদ্ধা মৌসুমি ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here