দেশের সময় ওয়েব ডেস্কঃ মনে পড়ে আমফানের তাণ্ডব হয়ে যাওয়ার পর কলকাতার ছবিটা? গাছ পড়ে, তার ছিড়ে, বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে—সে এক বীভৎস অবস্থা। সাত দিন ধরে কলকাতার রাস্তা থেকে গাছ সরিয়ে উঠতে পারেনি পুরসভা, রাজ্য সরকার।

সে সময় বারবার করে বিজেপি দাবি তুলেছিল, সেনাবাহিনীকে নামানো হোক। দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, “মমতাদি, মানুষের বিপদের সময়ে ইগো দেখানো ঠিক নয়। সেনাবাহিনী প্রস্তুত। আপনি বললেই তাঁরা নেমে পড়বে।”

দেখা গিয়েছিল সাত দিনের মাথায় সেনাবাহিনীকে কলকাতাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানোর কাজে নামার অনুমতি দিয়েছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু ইয়াস আসার আগেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়ে দিলেন, প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীকে নামানো হবে।

এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ইয়াস মোকাবিলার জন্য রাজ্য সরকার একটা তিন লক্ষ লোকের মাস্টার প্ল্যান করেছে। তাতে রয়েছেন ৭৪ হাজার অফিসার ও কর্মচারী, দু’লক্ষ পুলিশ। তা ছাড়া সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা তিন লক্ষের মতো।

মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘‘আজ  (মঙ্গলবার) নিজেরাও আমরা সবাই নবান্নেই থাকব। কাল তো ল্যান্ডফল হবে। তখনই বোঝা যাবে, কতটা ক্ষতি হচ্ছে আমাদের। আমরা তাই প্রতি মুহূর্তে মনিটরিং করব।’’

সাংবাদিক বৈঠকে সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের মমতা বললেন, ‘‘আপনারাও চাইলে রাতে এখানে থাকতে পারেন। খাওয়া-দাওয়া থাকার সবরকম ব্যবস্থা থাকবে।’’ ঘূর্ণিঝড় ইয়াস নিয়ে ফের সন্ধে ৬টায় সাংবাদিক বৈঠক করবেন বলে জানালেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ৬টার সময় ইয়াস নিয়ে আরও তথ্য জানাতে পারবেন তিনি। 

এরপরই মুখ্যমন্ত্রীকে নির্দিষ্ট ভাবে প্রশ্ন করা হয়, রাজ্য সরকার কি সেনাবাহিনীকে নামাবে উদ্ধারকাজে? জবাবে মমতা বলেন, “প্রয়োজন হলেই নামানো হবে।” সেইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “আমফানে আমাদের বড় শিক্ষা হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনও টাটকা। আমরা তো দুর্যোগ আটকাতে পারব না। প্রকৃতি মা প্রকৃতি মায়ের মতোই চলবে। কিন্তু মানুষের বিপদে আমরা সবসময় তাঁদের পাশে আছি।”

অন্যদিকে, কতটা ভয়াবহ হতে পারে ঘূর্ণঝড় ইয়াস ? কতটা প্রস্তুত কলকাতা? জেলায় জেলায় কীভাবে চলছে চূড়ান্ত তৎপরতা। সমস্ত দিক খতিয়ে দেখতে এবার আলিপুর আবহাওয়া দফতরে যাচ্ছেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়৷ বিকেল ৪টে নাগাদ তিনি পৌঁছবেন হাওয়া অফিসে। কীভাবে সেখানে গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন জগদীপ ধনখড়। দুর্যোগের প্রাক্কালে রাজ্যের পরিস্থিতির উপর সেখান থেকেই নজর রাখবেন তিনি।

অনেকে বলেন, জীবনে অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। মুখ্যমন্ত্রীও যেন আমফানের থেকে শিক্ষা নিয়েই ইয়াস মোকাবিলার কাজে ঝাঁপাতে চাইছেন। তা ছাড়া সেই সময় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত চলছিল রাজ্যের। কিন্তু একুশের ভোটে দুশোর বেশি আসন নিয়ে তৃতীয় বার সরকারে ফেরার পর সেই সংঘাত অনেকটাই কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বাংলার কৃষকদের জন্য পিএম কিষান সম্মান নিধি গ্রহণ করেছে রাজ্য সরকার। তার প্রথম কিস্তির টাকাও পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের চাষিরা। এবার দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়েও সংঘাতের কোনও সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইয়াস ভয়াবহভাবে আক্রমণ করবে বলে সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যবাসীকে সতর্ক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপধ্যায়। ২০টি জেলা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২৪ ঘণ্টার কন্ট্রোল রুম চালু হয়েছে। গোটা পরিস্থিতির দিকে সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মমতা। চার হাজার ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। করোনা বিধি মেনেই ত্রাণ শিবির চালানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমফানের থেকেও বড় হতে চলেছে, এমনই খবর রয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নেবেন না। মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে যাবেন না। বিভিন্ন ব্লকে রিলিফ সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। ১০ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে’।

আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বাংলায় ইয়াসের দাপট সবচেয়ে বেশি পড়বে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায়। আছড়ে পড়ার সময় পূর্ব মেদিনীপুরে ঝড়ের বেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৪৫ কিমি। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ঝড়ের বেগ হবে ঘণ্টায় ৯০-১০০ কিমি। কলকাতা, হাওড়া, হুগলিতে ঝড়ের বেগ হতে পারে ঘণ্টায় ৭০-৮০ কিমি। তবে, আমফানের মতো প্রভাব এই রাজ্যে পড়বে না বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইয়াসের প্রভাবে সোমবার থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বইছে ঝোড়ো হাওয়া। আজ জেলায় জেলায় বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে। দুই মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হবে। হাওড়া, হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here