

উঁচু প্রাচীর, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা, জেলের চিত্র তো মোটের উপর তাই। কিন্তু শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে ঘটনা ফাঁস করলেন, তাতে মনে হতে পারে এ সবই মরীচিকা! জেলটাকেও যে কয়েদিরা মোবাইল ব্যবহার করে ‘ডিজিটাল সাম্রাজ্য’ বানিয়ে ফেলেছিল, সেটাই সামনে আনলেন শুভেন্দু। স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে কৌতূহল জাগতে পারে, কীভাবে সবটা ধরা পড়ল?

ঘটনা হল, প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বৃহস্পতিবার বিকেলে চার ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছিল। গোয়েন্দাদের কাছে খবর ছিল, জেলের ভেতর থেকেই অপরাধের ছক কষা হচ্ছে। লিড ধরে বন্দিদের সেলে ঢুকে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালানো হয়। কেউ ভাবতেও পারেনি জেলের ডাস্টবিনে কী লুকিয়ে থাকতে পারে। জমানো নোংরা সরাতেই প্লাস্টিকের মোড়কে বেরিয়ে আসে মোবাইল। সেলের পুরোনো দেয়ালের পলেস্তারা কোথাও একটু আলগা, কোথাও আবার ইটের খাঁজে সামান্য ফাটল। সেই ফাটলগুলোকেই অপরাধীরা বানিয়ে ফেলেছিল তাদের গোপন ‘লকার’। নিপুণ দক্ষতায় ইটের আড়ালে ফোন গুঁজে এমনভাবে রাখা হয়েছিল যে সাধারণ চোখে ধরা পড়া অসম্ভব।

বাথরুমের ঘুলঘুলি বা ভেন্টিলেটরের ধুলোমাখা কোণ থেকে শুরু করে একজস্ট ফ্যানের ব্লেডের পেছনে, সব জায়গাই ব্যবহৃত হয়েছিল ফোন লুকোনোর নিরাপদ আস্তানা হিসেবে। তল্লাশিতে মোট ২৩টি ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি অত্যন্ত ছোট আকারের ‘মাইক্রো ফোন’, যা হাতের তালুতে লুকিয়ে ফেলা যায় অনায়াসে। তবে গোয়েন্দাদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে উদ্ধার হওয়া একটি অত্যাধুনিক ‘অ্যান্ড্রয়েড’ ফোনটি দেখে।

তদন্তে জানা গেছে, এই ফোনগুলো সরাসরি কোনও বন্দির কাছে থাকত না, বরং ‘কমন স্পেস’ বা সাধারণ জায়গাগুলোতে লুকানো থাকত যাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি কমে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ‘‘সন্দেশখালির কুখ্যাত শাহজাহান থেকে শুরু করে বহু দাগী আসামী জেলের ভেতরে বসেই বাইরে তাদের অপরাধের জাল বিস্তার করছিল।’’

এই দুর্ভেদ্য অপরাধচক্রের শিকড় কতদূর গভীরে, তা খুঁজতে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে সিআইডি-র (CID) হাতে। গোয়েন্দারা এখন ‘ভয়েস স্যাম্পলিং’ বা কণ্ঠস্বর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবেন যে, ওই ফোনগুলো দিয়ে ঠিক কারা এবং কতবার বাইরে যোগাযোগ করেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার ‘অপদার্থতা’ ও জেল কর্তৃপক্ষের একাংশের মদত ছাড়া এমনটা হওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন মুখ্যমন্ত্রী। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে প্রেসিডেন্সি জেলের সুপার ও চিফ কন্ট্রোলারকে তৎক্ষণাৎ সাসপেন্ড করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ হুঁশিয়ারি, ‘‘সিম কার্ডগুলো কার নামে ছিল এবং জেলের বাইরে থেকে কারা নিয়মিত কথা বলতেন, তাঁদের কাউকেই ছাড়া হবে না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, তৃণমূল জমানার ‘ঢিলেঢালা’ শাসনের সুযোগে জেলগুলো যেভাবে অপরাধীদের ‘সেফ হাউস’ বা নিরাপদ ডেরায় পরিণত হয়েছিল, সেই সংস্কৃতির মূলে কুঠারাঘাত করাই এখন সরকারের লক্ষ্য।



