রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নতুন মোড় এসেছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল পুতিনের বাহিনী। তার প্রত্যাঘাত করেছে জেলেনস্কির দেশ। সেই হামলায় রাশিয়ার ৪০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে রাশিয়ান এয়ারস্পেসে ঢুকল ইউক্রেনের ড্রোন ? সেই তথ্য সামনে এসেছে।
দুই দেশের মধ্যে সাড়ে তিন বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। ক্ষয়ক্ষতি দুই দেশেরই হচ্ছে কমবেশি। এর মধ্যে রবিবার ইউক্রেন দাবি করেছে, রাশিয়ার ভিতরে ঢুকে পাঁচটি বিমানঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ৪১টি বোমারু বিমান ধ্বংস করেছে তারা। ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে নয়, বরং ড্রোন পাঠিয়ে ওই বিমান ধ্বংস করেছে কিভ। যদিও রাশিয়া এই নিয়ে এখন পর্যন্ত মুখ খোলেনি। ইউক্রেন জানিয়েছে, এফপিভি ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ায় হামলা চালিয়েছে তারা।
দেড় বছর ধরে পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট ১১৭টি বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন ব্যবহৃত হয়েছে অপারেশন স্পাইডার ওয়েব-এ। ইউক্রেন সেনার এই অভিযান নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি। তাঁর দাবি, রাশিয়ার FSB হেড কোয়ার্টারের কাছে এই অভিযানের কন্ট্রোল ‘অফিস’ তৈরি করেছিল ইউক্রেন। একাধিক সংবাদমাধ্যমে রাশিয়ার বিমানঘাঁটির উপর এই হামলাকে আমেরিকার ‘পার্ল হারবার’-এ হামলার ঘটনার সঙ্গেও তুলনা করা হচ্ছে।
কী বললেন জ়েলেনস্কি?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে সফল অপারেশনের পরেই উচ্ছ্বসিত ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘একটা চাপ দেওয়ার সত্যিই প্রয়োজন ছিল। রাশিয়ার উপর চাপ দেওয়ার দরকার ছিল, যাতে তারা বাস্তবে ফিরে আসে। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে চাপ। আমাদের বাহিনীর চাপ। কূটনীতির মাধ্যমে চাপ। সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কথায়, শত্রু দেশের (রাশিয়া) ভূখণ্ডে একটি দুর্দান্ত অভিযান করা হয়েছে। শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তু লক্ষ্য করে, বিশেষ করে ইউক্রেনে আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলিকে লক্ষ্য করে এই অভিযান করা হয়েছে। রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে — এটা সম্পূর্ণরূপে ন্যায্য এবং প্রাপ্য।’
কী এই ড্রোন? কী ভাবে কাজ করে?
এফপিভির অর্থ ‘ফার্স্ট পার্সন ভিউ’। এর সামনে থাকা ক্যামেরা ‘রিয়্যাল টাইম’ ছবি পাঠায় নিয়ন্ত্রককে। যিনি ড্রোন পরিচালনা করছেন, তিনি নিজের সামনে থাকা পর্দায় দেখতে পারবেন কোথায় উড়ছে সেটি। মনে হবে, তিনি নিজেই বসে রয়েছেন সেই ড্রোনের ভিতরে। ভিডিয়ো গেম খেলার সময় যেমন পর্দায় দেখা যায়, সে রকম।
https://x.com/sumlenny/status/1929145206621827409?t=zGC6ZlXxyMP9vTCpXaY–Q&s=19
কী ভাবে আক্রমণ করে এই ড্রোন?
আত্মঘাতী ড্রোন হিসাবে এই এফপিভিকে তৈরি করা হয়েছে। তিন স্তরে কাজ করে এটি— এক, প্রথমে ওড়ে। দুই, লক্ষ্যবস্তু (ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান, বাড়ি) খুঁজে নেয়। তিন, তার পর সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে গিয়ে আঘাত হানে। বিস্ফোরণ ঘটায়। ড্রোনে থাকে গ্রেনেড বা আইইডি। তা দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটায় এটি।
কী ভাবে ব্যবহার করেছে ইউক্রেন?
ইউক্রেন নিজেই তৈরি করেছে এই ড্রোন। তা-ও বেশ কম খরচে। ভারতীয় মুদ্রায় এক একটি এফপিভি ড্রোনের দাম ৫০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা। থ্রিডি প্রিন্টিং, মোটর, ক্যামেরা, ব্যাটারির সমন্বয় ঘটিয়ে এই ড্রোনগুলি তৈরি করেছে ইউক্রেন। সূত্রের খবর, ১ জুন শয়ে শয়ে রাশিয়ায় এফপিভি ড্রোন পাঠিয়েছে ইউক্রেন। বায়ুসেনাঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বোমারু বিমান লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এই ধরনের হামলার মোকাবিলা বেশ শক্ত। রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েও এই ড্রোন হামলা আটকাতে পারেনি।
কী ভাবে হামলা চালানো হয়?
ইউক্রেনের এক সামরিক কর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়ায় ট্রাকে করে ড্রোনগুলি পাঠানো হয়েছিল। নিরাপত্তা কর্মীদের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ট্রাকের কাঠের পাঠাতনের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ড্রোনগুলি। ট্রাকগুলিকে রাশিয়ার চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটির কাছাকাছি নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১১৭টি কোয়াড্রোকপ্টার ড্রোনগুলিকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে পরিচালিত করা হয়। জেলেন্সকি জানান, রাশিয়ার মোট তিনটি জায়গা থেকে এই অপারেশন পরিচালনা করা হয়। রাশিয়ায় যাঁরা এই অভিযানে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের সকলকেই নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
কী বলছে ইউক্রেন?
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সের্হি কুজান বলেছেন, ‘বিশ্বের কোনও দেশের কোনও সেনা অভিযানে কখনও এমন কিছু করা হয়নি।’ রিপোর্ট বলছে, প্রায় ১২০টি রাশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমানের মধ্যে ৪০টি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনীয় সামরিক ব্লগার ওলেকসান্ডার কোভালেঙ্কো জানান, ক্ষতির পরিমাণ এত বেশি যে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিকট ভবিষ্যতে এই অবস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
কেন পার্ল হারবারের সঙ্গে তুলনা?
১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর। প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটিতে আক্রমণ করে বসে জাপানের সামরিক বাহিনী। সেখানে ৩৫৩টি বিমান, ৩টি ক্রুজার, ১১টি ডেস্ট্রয়ার ও কয়েকটি ছোট ডুবোজাহাজ। ৭ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে হামলা চালিয়েছিল জাপান। সেই সময়ে আমেরিকার অন্যতম প্রধান যুদ্ধ বিমান ঘাঁটিতে ধ্বংসলীলা চালানো হয়।



