প্রয়াত ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার স্যার গ্যারি সোবার্স , থেকে গেল ছয় ছক্কা, ৩৬৫ নটআউট
deshersamay

ক্রিকেট বিশ্ব আজ হারাল তার সবচেয়ে উজ্জ্বল কিংবদন্তিদের একজনকে। যে নামটি শুনলেই একসঙ্গে মনে পড়ে ব্যাটের রাজত্ব, বলের জাদু আর মাঠ জুড়ে অবিশ্বাস্য দাপট, সেই স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই।
ক্রিকেট ইতিহাসের আকাশ থেকে খসে পড়ল অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্রটি। বাইশ গজের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার, ক্রিকেট বিশ্বের জীবন্ত কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্স (গ্যারি সোবার্স) আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি । তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই অবসান ঘটল ক্রিকেট রোমান্টিসিজমের এক স্বর্ণযুগের । ক্রিকেট মাঠে তিনি যা যা করে দেখিয়েছেন, তা আধুনিক ক্রিকেটের যুগেও রূপকথার মতো শোনায়।
১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই বার্বাডোজে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেট ঈশ্বর মাঠের ভেতরে সংজ্ঞা বদলে দিয়েছিলেন অলরাউন্ডারের । বাঁ হাতি ব্যাটিংয়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনআপকে যেমন ছারখার করে দিতেন, তেমনই বল হাতেও তিনি ছিলেন সমান মারাত্মক। একই ম্যাচে কখনও বাঁ হাতে নিখুঁত মিডিয়াম পেস, আবার পরক্ষণেই আঙুলের মোচড়ে স্পিন বোলিং – দুই অবতারেই প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরাতেন। শুধু ব্যাটিং বা বোলিং নয়, ফিল্ডার হিসেবেও তাঁর চিতা বাঘের মতো ক্ষিপ্রতা তাঁকে ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ‘কমপ্লিট ক্রিকেটার’ বা সম্পূর্ণ ক্রিকেটারের মর্যাদা দিয়েছিল।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মেরুন জার্সিতে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল এই বিস্ময় বালকের। এরপর কেরিয়ারে দেশের হয়ে ৯৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। ৫৭.৭৮-এর চোখ কপালে তোলার মতো গড়ে করেছেন ৮,০৩২ রান, যার মধ্যে রয়েছে ২৬টি নান্দনিক শতরান। আর বল হাতে উইকেট শিকারের ঝুলিতে পুরেছেন ২৩৫টি শিকার। স্লিপে বা ক্লোজ-ইন ফিল্ডিংয়ে তাঁর বিশ্বস্ত দুটি হাত জমা করেছে ১০৯টি ক্যাচ। আধুনিক ক্রিকেটে যখন একজন ক্রিকেটারকে তিন ফরম্যাটে খেলতেই হিমশিম খেতে হয়, সেখানে আজ থেকে ছয় দশক আগে গ্যারি সোবার্স তিন বিভাগেই বিশ্বক্রিকেটে রাজত্ব করে গেছেন।
সোবার্সের কেরিয়ারের খতিয়ান ওল্টালে দুটি ঘটনা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে। প্রথমটি ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ৩৬৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। তৎকালীন সময়ে এটিই ছিল টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রান।
আর দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল তার ঠিক এক দশক পর, ১৯৬৮ সালে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলার সময় গ্ল্যামারগনের বোলার ম্যালকম ন্যাশের এক ওভারে ছয়টি বলে ছয়টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় সেটাই ছিল প্রথম এক ওভারে ৩৬ রান তোলার বিশ্বরেকর্ড। ক্রিকেটের আঙিনায় আজও সেই মূহূর্তটিকে অন্যতম আইকনিক দৃশ্য হিসেবে গণ্য করা হয়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলকে দীর্ঘদিন সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্যার গ্যারি। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের তো বটেই, গোটা বিশ্বের পরবর্তী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম। খেরোখাতার পরিসংখ্যান দিয়ে তাঁকে বিচার করা অসম্ভব। বাইশ গজে স্রেফ নিজের উপস্থিতি দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার যে অলৌকিক ক্ষমতা তাঁর ছিল, সেটাই পরবর্তীকালের সব অলরাউন্ডারদের জন্য শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। কপিল দেব থেকে শুরু করে জ্যাক ক্যালিস – যে কোনও অলরাউন্ডারকে মাপার একমাত্র নিক্তি ছিলেন এই বার্বাডোজের রাজপুত্র।
ক্রিকেটে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তাঁকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের তরফ থেকে ‘নাইটহুড’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। উইজডেনের ‘ক্রিকেটার্স অফ দ্য সেঞ্চুরি’ (শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটার)-র তালিকাতেও জ্বলজ্বল করছিল তাঁর নাম। আইসিসি-র ‘হল অব ফেম’-এও তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন সসম্মানে।
আজ স্যার গ্যারি সোবার্স শারীরিক দূরত্বের ওপারে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু ক্রিকেট যতদিন থাকবে, ডন ব্র্যাডম্যানের পাশাপাশি স্যার গারফিল্ড সোবার্সের নামটিও ততদিনই ক্রিকেটের বাইবেলে অমর হয়ে থাকবে।
