

সুরের ভুবনে অনন্ত নিঃশব্দতা। এক অবিরাম কল্লোলিনী নদী যেন হঠাৎ মোহনায় এসে থমকে দাঁড়াল। শেষ হল ভারতীয় সংগীতের এক বর্ণময়, দীর্ঘ এবং বর্ণনাতীত অধ্যায়। ৯৩ বছর বয়সে না- ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle Death)।

শোকের ছায়া প্রায় গোটা বিশ্বে। প্রয়াত আশা ভোঁসলে। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। সম্প্রতি খবর এসেছিল, কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি। ১১ এপ্রিল, শনিবার দুপুরের দিকে হঠাৎ শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারপর থেকেই তিনি চিকিৎসকদের কড়া নজরদারিতে ছিলেন।
জানা গিয়েছিল বর্ষীয়ান গায়িকার শারিরীক অবস্থার অবনতি হতেই তাঁকে তড়িঘড়ি আইসিইউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সেখানে অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টদের একটি বিশেষজ্ঞ দল তাঁর চিকিৎসা করছিলেন। কিন্তু চেষ্টা বিফলে। না ফেরার দেশে আশা ভোঁসলে। ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের চিকিৎসক ড. প্রতীত সামদানি তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

যে কণ্ঠস্বর সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কখনও ক্যাবারের চপলতায়, কখনও রাবীন্দ্রিক গাম্ভীর্যে আবার কখনও বিরহের গভীরতায় কোটি কোটি মানুষকে বুঁদ করে রেখেছিল, সেই মায়াবী স্বর আজ চিরদিনের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল
শেষ মুহূর্তের সেই বিষণ্ণ দুপুর
শনিবার বিকেলে মুম্বাইয়ের লোধা আবাসন সংলগ্ন তাঁর নিজস্ব বাসভবনে থাকাকালীনই শারীরিক অস্বস্তি বোধ করেন কিংবদন্তি গায়িকা। তাঁর বাড়ির পরিচারিকা লক্ষ্য করেন যে, আশা ভোঁসলে হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়েছেন। তড়িঘড়ি পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসক প্রতীত সামদানির তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়।

চিকিৎসকেরা জানান, তিনি তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। দিনভর লড়াই চলার পর, রবিবার ১২ই এপ্রিল দুপুরের দিকে হাসপাতাল থেকে সেই দুঃসংবাদটি আসে— ভারতীয় সংগীতের ‘ভার্সেটাইল কুইন’ আর নেই। তাঁর প্রয়াণে কেবল সংগীত জগৎ নয়, সমগ্র ভারতবর্ষ এক মাতৃতুল্য অভিভাবককে হারাল।
১৯৩৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের এক সাঙ্গলি রাজ্যে সঙ্গীতের আবহে জন্ম আশার। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন ক্ল্যাসিকাল ও নাট্য সংগীতের দিকপাল। মা সেবন্তীর কোল আলো করে আসা সেজো সন্তান ছিলেন আশা। লতা, মীনা, আশা, ঊষা এবং ছোট ভাই হৃদয়নাথ— মঙ্গেশকর পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের শৈশব কেটেছিল গোয়ার মঙ্গেশী গ্রামের মাটির ঘ্রাণ আর সংগীতের মূর্ছনায়।
কিন্তু সেই খুশির আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে যখন মাত্র ৯ বছর বয়সে আশার পিতৃবিয়োগ হয়। সংসারের হাল ধরেন বড়দি লতা। দিদির হাত ধরেই ছায়ার মতো মুম্বাইয়ের স্টুডিও পাড়ায় ঘোরাঘুরি শুরু কিশোরী আশার। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাই’-তে প্রথম কণ্ঠদান করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবির মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর হিন্দি ছবির সফল জয়যাত্রা।
আশার জীবনকাহিনি কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিজের জীবনের প্রথম বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। দিদি লতা মঙ্গেশকরের সেক্রেটারি গণপত রাও ভোঁসলের প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিলেন এই কিশোরী। ৩১ বছরের প্রৌঢ় গণপত ছিলেন উচ্চবংশীয় এবং বিত্তবান। এই বিয়ে মঙ্গেশকর পরিবার মেনে নেয়নি, যার ফলে দীর্ঘ সময় দিদি লতার সঙ্গে তাঁর মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল।
এই সম্পর্ক থেকে তাঁর জীবনে এসেছিল তিন সন্তান— হেমন্ত, বর্ষা এবং আনন্দ। জানা যায়, গণপতই লতার বাতিল করা গানগুলোর সুযোগ আশাকে করে দিতেন, যা তাঁর পেশাদারি জীবনের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। এই নিয়ে বহু চর্চাও চলেছে ফিল্মি ম্যাগাজিনগুলোয়। কিন্তু সাত বছর পর সেই সম্পর্কে ফাটল ধরে এবং আশাকে তিন সন্তান নিয়ে ঘর ছাড়তে হয়।
গণপতের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আশার জীবনে বসন্ত হয়ে আসেন ওঙ্কারপ্রসাদ নায়ার বা ওপি নায়ার। ওপি-র সুর আর আশার কণ্ঠ মিলে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করল। ‘নয়া দৌড়’, ‘মেরে সনম’, ‘হাওড়া ব্রিজ’-এর মতো একের পর এক হিট ছবি আশাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিল। ওপি নায়ারের সঙ্গে তাঁর প্রেম নিয়ে মুম্বাই তখন সরগরম। ওপি-র লকেট শাড়ির ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরতেন আশা। কিন্তু দশ বছরের সেই ‘লিভ-ইন’ সম্পর্কও টিকল না ব্যক্তিগত তিক্ততায়।

এরপরেই আশার জীবনে প্রবেশ রাহুল দেব বর্মণ বা পঞ্চমের। বয়সে আশার থেকে ছ’বছরের ছোট পঞ্চমই ছিলেন তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সঙ্গী। ‘তিসরি মঞ্জিল’ থেকে শুরু করে ‘১৯৪২ লাভস্টোরি’— এই জুটি সংগীতকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে তাঁদের পরিণয় পূর্ণতা পায়। আরডির মদ্যপান আর পারিবারিক অশান্তি নিয়ে মাঝে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও, ১৯৯৪ সালে পঞ্চমের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন একে অপরের প্রিয় ‘বাবস’।
মারাঠি মেয়ে হয়েও আশা ভোঁসলে ছিলেন বাঙালির পরম আপন। তাঁর উচ্চারণে রবীন্দ্রসঙ্গীত কখনও মনে হতে দেয়নি যে বাংলা তাঁর মাতৃভাষা নয়। ‘জগতের আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’ বা ‘এসো শ্যামল সুন্দর’ শুনে আপ্লুত হয়েছে আপামর বাঙালি।
পুজোর প্যান্ডেল মানেই ছিল আশার সেই অমোঘ কণ্ঠ— ‘চোখে চোখে কথা বলো’ বা ‘মাছের কাঁটা খোপার কাঁটা’। সুধীন দাশগুপ্ত ও নচিকেতা ঘোষের সুরে তাঁর গাওয়া আধুনিক গানগুলো আজও বাঙালির ড্রয়িংরুমের সম্পদ।
সারা জীবন দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁর তুলনা চলেছে। লতা ছিলেন স্নিগ্ধ ধ্রুপদী সুরের প্রতীক, আর আশা ছিলেন আগুনের ফুলকি। ক্যাবারে, পপ থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিকাল— সব ঘরানাতেই তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। শাড়ি পরেও যে পারফরম্যান্সের আগুন জ্বালানো যায়, তা আশা ভোঁসলে ছাড়া আর কেউ শিখিয়ে যাননি। তাঁর জীবনে এসেছে অনেক শোক— মেয়ে বর্ষার আত্মহত্যা, বড় ছেলে হেমন্তর ক্যানসারে মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু দমিয়ে দিতে পারেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি ছিলেন উচ্ছ্বল, হাসিমুখ।

আজ সেই খিলখিল হাসির মানুষটি চলে গেলেন। রেখে গেলেন আট দশকের গান, হাজার হাজার রেকর্ড আর একরাশ স্মৃতি। ভারতের আকাশ থেকে খসে পড়ল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর রয়ে গেল মহাকালের পাতায়— অবিনশ্বর, অমর।তাঁর কালজয়ী কণ্ঠেই অমর হয়ে থাকবেন আশা ভোঁসলে।
বিদায় আশাজি, সুরের ভুবন আপনাকে চিরকাল মনে রাখবে।



