অন্ধ্রে ,‘অর্ণব’-এর পরেই ‘মুরাসু’ যাচ্ছে কেন? কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার ভোলবদল
deshersamay

অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। তার জন্য আবহাওয়া দপ্তরের তরফে সতর্কতাও জারি করা হয়েছে।

ধেয়ে আসছে নতুন ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। আবারও অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলেই ল্যান্ডফলের পূর্বাভাস। কিন্তু এবারের ঘূর্ণিঝড়ের জেরে বাংলায় বিশেষ কোনও প্রভাব পড়বে না।
নভেম্বরের শুরুতেই বিক্ষিপ্তভাবে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে গোটা বাংলায়। কিন্তু আগামী ২৪ ঘণ্টা পর থেকেই ফের আবহাওয়ার ভোলবদল শুরু হবে।

আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী,সোমবার দুপুরের পর পূর্ব মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রামে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
এই চার জেলায় এই সময়ের মধ্যে ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিমি বেগে দমকা ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। চার জেলাতেই হলুদ সর্তকতা জারি রয়েছে।

আবহাওয়া দপ্তর আরও জানিয়েছে, আজ ও আগামিকাল মঙ্গলবার কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোনও জেলাতেই সতর্কতা জারি হয়নি।
পাশাপাশি আগামী দু’দিন দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় কোনও বদল হবে না। তারপর অর্থাৎ বুধবার থেকে টানা তিনদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।
অন্যদিকে আজ উত্তরবঙ্গের সব জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আগামিকাল, মঙ্গলবার দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে বিক্ষিপ্তভাবে কয়েক পশলা বৃষ্টি হতে পারে। তবে কোনও সতর্কতা জারি হয়নি।
‘মুরাসু’ ঘূর্ণিঝড়ের এমন নাম যেন অনেকটা যুদ্ধের রণ ডঙ্কার মতো শোনায়। কোথা থেকে এলো হঠাৎ এমন নাম? ‘মুরাসু’ একটি তামিল শব্দ। তামিল ভাষায় ‘মুরাসু’ শব্দের অর্থ হলো একটি বিশেষ ধরনের বড় ঢাক বা দামামা, যা প্রাচীনকালে যুদ্ধ, উৎসব কিংবা আসন্ন বিপদের সময় মানুষকে সতর্ক করতে বাজানো হতো। তবে ঝড়ের শক্তি বা গন্তব্য দেখে এই নামকরণ করা হয়নি।
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আন্তর্জাতিক নিয়মে তৈরি পূর্ব নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী ভারত এই নামটি প্রস্তাব করেছিল। গত ২৮ অক্টোবর অন্ধ্রে আছড়ে পড়া ঘূর্ণিঝড়ের নাম ছিল ‘অর্ণব’, যা বাংলাদেশের দেওয়া। তার পরে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ঝড়ের নাম রাখা হয়েছে ‘মুরাসু’, যা ভারতের দেওয়া।
‘মুরাসু’ একটি ঐতিহ্যবাহী তামিল বাদ্যযন্ত্র বা বড় ঢাক। অতীতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠাতে, মানুষকে একজোট করতে কিংবা আসন্ন সঙ্কটের আভাস দিতে এটি বাজানো হতো। এর একটি বিশেষ রূপ হলো ‘বীরা মুরাসু’, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হত। সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যোগসূত্র, সহজ উচ্চারণ এবং কোনও ব্যক্তির নাম না হওয়ার শর্ত মেনে ভারত এই নামটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
কোন দেশে ঝড় আছড়ে পড়ছে, তার উপর নাম নির্ভর করে না। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি সদস্য দেশ প্রত্যেকে ১৩টি করে মোট ১৬৯টি নামের তালিকা তৈরি করেছে। দেশগুলোর নামের ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে তালিকা সাজানো হয়। সেই ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘অর্ণব’-এর পর ভারতের প্রস্তাবিত ‘মুরাসু’ নামটি বরাদ্দ ছিল। এই কারণেই অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে যাওয়া ঝড়টি ভারতীয় নাম পেয়েছে। এর পর যে নতুন ঝড় তৈরি হবে, তার নাম হবে ইরানের প্রস্তাবিত ‘আকভান’। বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর—উভয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের জন্যই এই অভিন্ন তালিকা কার্যকর।
ঝড়ের নামকরণে মূলত তিনটি ধাপ থাকে—সদস্য দেশগুলোর নাম প্রস্তাব, আঞ্চলিক কমিটির অনুমোদন এবং আবহাওয়া দপ্তরের আনুষ্ঠানিক নামকরণ। প্রত্যেক দেশ নিজ নিজ আবহাওয়া দপ্তরের মাধ্যমে নামের তালিকা পাঠায়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-র অধীনে তা যাচাই হয়ে অনুমোদিত হয়। উত্তর ভারত মহাসাগর অঞ্চলের ক্ষেত্রে সরকারি ভাবে ঝড়ের নাম ঘোষণার দায়িত্ব রয়েছে দিল্লির কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের (IMD) কাছে। সে ঝড় যে দেশেই যাক না কেন, তালিকা অনুযায়ী নাম দেওয়ার দায়িত্ব থাকে IMD-র হাতেই।

যে কোনও শব্দকেই ঝড়ের নাম হিসেবে বেছে নেওয়া যায় না। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ম অনুযায়ী, নামটি ছোট ও সহজ উচ্চারণের হতে হবে। সর্বোচ্চ ৮টি অক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে নাম। নামটিতে কোনও রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা লিঙ্গভিত্তিক বিদ্বেষ থাকা চলবে না। সাধারণ মানুষের প্রস্তাবও যাচাই করা হয়, যেমন ২০২০ সালের তালিকার জন্য ভারতীয়দের পরামর্শ বিবেচনা করেছিল IMD। আঞ্চলিক কমিটির পূর্ণ যাচাই ও ছাড়পত্র পাওয়ার পরেই কোনও নাম তালিকায় জায়গা পায়। তবে যুক্তিযুক্ত আপত্তি উঠলে তা বাতিলও হতে পারে।
সমুদ্রে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হওয়া মাত্রই তাকে নাম দেওয়া হয় না। উত্তর ভারত মহাসাগরে কোনও নিম্নচাপের বাতাসের গতিবেগ যখন একটানা অন্তত ৩৪ নট (ঘণ্টায় প্রায় ৬২ কিলোমিটার) স্পর্শ করে, তখনই তা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয় এবং সরকারি নাম পায়। একবার নাম পেয়ে গেলে সেই ঝড় আরও শক্তিশালী হলেও নাম আর বদলায় না। অর্থাৎ ‘মুরাসু’ শক্তি বাড়িয়ে তীব্র ঘূর্ণিঝড় হলেও তার নাম ‘মুরাসু’-ই থাকবে।

আগে থেকেই ঠিক থাকা এই ক্রমানুসারে ‘মুরাসু’-র পরে রয়েছে ইরানের দেওয়া নাম ‘আকভান’। তবে এর মানে এই নয় যে অবিলম্বে আর একটি ঝড় ধেয়ে আসছে। ভবিষ্যতে যখনই কোনও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হবে, তখনই ক্রমানুসারে এই ‘আকভান’ নামটি ব্যবহার করা হবে। তার আগে আপাতত তামিল ঢাকের নাম নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে চোখ রাঙাচ্ছে ‘মুরাসু’।
