হাসিনাকে ফেরানো নিয়ে ভারতের কাছে পাকা কথা চায় বাংলাদেশ, তারেকের দিল্লি সফরের জন্য ‘অনুকূল পরিবেশ’ চাইল ঢাকা
deshersamay

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের কাছে একাধিক অনুরোধবার্তা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এই আবহে আওয়ামী লীগ নেত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টি দেশের আদালতের সিদ্ধান্তের উপরেই ছাড়তে চাইছে নয়াদিল্লি। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে শীর্ষ পর্যায়ের এক ভারতীয় আধিকারিককে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দেশের আদালতগুলিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

অন্য দিকে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসেই দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতে আসতে পারেন দু’দেশের মিডিয়ায় চর্চা চলছিল। তাতে খানিকটা জল ঢেলে দিল বুধবার দুপুরে বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য। সে দেশের বিদেশ মন্ত্রকে তরফে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের আগে ভারতকে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে অনুরোধ করা হয়েছে। তার জন্য ভারতের কাছে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা।

অনুকূল পরিবেশের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেছেন তারা শেখ হাসিনা এবং শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণ নিয়ে ভারতের কাছ থেকে পাকা কথা চান। ঢাকার কূটনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা আপাতত বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ল।

২০ থেকে ২৫ অগস্টের আগে-পরে তাঁর ভারত সফর চূড়ান্ত করতে দিল্লি ও ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ে জোর তৎপরতা চলছিল। এরই মধ্যে রবিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী সফর নিয়ে কার্যত শর্ত চাপাল বাংলাদেশ সরকার।
আগামী মাসের ১২ ও ১৩ তারিখ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ব্রিকস দেশগুলির শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও পরিদর্শক হিসেবে তারেক রহমানকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তারেক রহমানকে সেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে।

বাংলাদেশ সরকার এই ব্যাপারে সরকারিভাবে কোনও আপত্তি না জানালেও সে দেশের প্রশাসনিক মহলের বক্তব্য তারেক রহমানের প্রথম পরিচয় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ওই পদে থাকার সুবাদে তিনি বিমসটেকের চেয়ারম্যান।
দিল্লি ও ঢাকার একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, ব্রিকস সম্মেলনে এলে তারেক রহমান ভারত ছাড়াও চিন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ দশটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন। কিন্তু ঢাকার সরকারি কর্তারা বিমসটেক সম্মেলনে যোগ না দিতেই প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
তবে, ওই সম্মেলনের আগেই তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারতে আসার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সাক্ষাতের পরেই দিল্লি এসে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করেছিলেন ত্রিবেদী।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং দীনেশ ত্রিবেদী ও নরেন্দ্র মোদীর বৈঠকের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সম্ভাবনা জোরদার হয়। তবে কোনও দেশই এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে এই বিষয়ে কিছু জানায়নি। সফরের দিন-তারিখও চূড়ান্ত হয়নি বলে খবর।
জানা যাচ্ছে, সরকারি কর্তারা দ্বিপাক্ষিক সফরে আলোচ্য বিষয়াদি নিয়ে কথাবার্তা চালাচ্ছেন। এই সফর শেষ পর্যন্ত হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ভারতে আসবেন। ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর একান্ত বৈঠকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ সরকারের কাছে গঙ্গার জল চুক্তির পুনর্নবীকরণের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার চায় ভারত শেখ হাসিনাকে সরকারিভাবে হস্তান্তর বা প্রত্যর্পণ করুক। অন্যদিকে, ভারতের বক্তব্য বাংলাদেশ সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছায় সায় দিয়ে তাঁকে নিরাপদে দেশে ফেরা এবং আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ দিক। ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ইতিমধ্যে একাধিকবার বলেছেন দুই প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি বৈঠক হওয়া জরুরি। তিনি আশা করেন তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদীর মুখোমুখি বৈঠক হলে অনেক জটিল সমস্যার জট খুলে যাবে।
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত ৫ অগস্ট দিল্লিতে যে ভাবে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে।” অনুকূল পরিবেশ রক্ষায় তাদের আর্জির প্রেক্ষিতে ভারত কী জানায়, তার জন্য তারা অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা।

অথচ, শনিবার বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘দ্য ডেলি স্টার’-এর প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, তারেকের ভারতে আসার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। কেবল দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা চলছে দুই দেশের মধ্যে। কূটনৈতিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, ২০ থেকে ২৫ অগস্টের মধ্যে ভারতে আসতে পারেন তারেক। সংবাদসংস্থা এএনআই-ও ‘ডেলি স্টার’-কে উদ্ধৃত করে তারেকের সম্ভাব্য ভারত সফরের কথা জানিয়েছিল। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি অবশ্য অনেকটাই বদলে গেল।
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে রবিবার ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে এক শীর্ষ পর্যায়ের ভারতীয় আধিকারিক বলেন, “এই বিষয়ে আমাদের আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইনি প্রক্রিয়ায় স্থির হবে যে, হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভারতীয় আইন অনুসারে অপরাধ কি না।” সম্প্রতি সাংবাদিক বৈঠক করে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার কথা ঘোষণা করেছেন হাসিনা নিজেই। এই পরিস্থিতিতে তারেকের সম্ভাব্য ভারত সফরে বিষয়টি পুরোপুরি এড়ানো যেত না বলেই মনে করছে নয়াদিল্লি।
২০১৩-র ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি উদ্দেশ্য ছিল, জঙ্গি, পাচারকারী ও চোরাচালানকারীদের পরস্পরের হাতে তুলে দেওয়া। ২০১৬-য় এই চুক্তিতে বেশ কিছু সংশোধন আনা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়, কোনও দেশ যদি মনে করে, রাজনৈতিক কারণে কাউকে প্রত্যর্পণের দাবি জানানো হচ্ছে, তবে তারা দাবি মানতে বাধ্য নয়। আবার চুক্তির আর একটি ধারায় রয়েছে, প্রত্যর্পণের পরে দীর্ঘ কারাবাস ও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলে অন্য পক্ষের দাবি খারিজ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত ভারতের ঘোষিত অবস্থান হল, প্রত্যর্পণের অনুরোধ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে থাকা এবং এ দেশ থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো নিয়ে আপত্তি রয়েছে বাংলাদেশ সরকার এবং সে দেশের শাসকদল বিএনপি-র। এই টানাপড়েনের আবহে গত সোমবার ঢাকায় তারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত দীনেশ ত্রিবেদী। জুন মাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর সেটাই ছিল তারেকের সঙ্গে দীনেশের প্রথম সাক্ষাৎ। তারেক-সাক্ষাতের পরেই দিল্লি আসেন দীনেশ। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মনে করা হয়েছিল, তারেক-দীনেশ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে হাসিনা-জট কেটেছে। কিন্তু রবিবার ঢাকার অবস্থান দেখে অনেকেই মনে করছেন, তারেকের এখন ভারতে আসার সম্ভাবনা বেশ ‘প্রতিকূল’।

এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমান অল্প সময়ের জন্য দিল্লি এলে রাজস্থানে আজমেঢ় শরিফ দরগাহেও যেতে পারেন। ভারত সফরে এসে তাঁর প্রয়াত পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা তথা তিনবারের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াও আজমেঢ় শরিফ দরগাহে গিয়েছিলেন।
