২০০৩-০৪ মরশুমে শেষবার জাতীয় লিগ জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। তার পর থেকে ভাঁড়ার খালি। একাধিক ট্রফি জিতলেও জাতীয় লিগ জেতা হয়নি। যার ফলে পড়শি মোহনবাগানের থেকে একাধিকবার খোঁচা খেতে হয়েছে। আইলিগের পর ISL- ছবিটা বদলায়নি। কিন্তু এ বারের ISL টা যেন ইস্টবেঙ্গলের জন্যই লেখা ছিল। শেষ ম্যাচে ইন্টার কাশীকে ২-১ গোলে হারিয়ে ISL ঘরে তুলল লাল হলুদ।

দীর্ঘ ২২ বছরের ক্ষরা কেটে অবশেষে ঘুচল ট্রফি খরা, যোগ্য দল হিসেবে প্রথম বার আইএসএল (ISL) চ্যাম্পিয়ন হয়ে ভারতসেরার মুকুট মাথায় তুলল ইস্টবেঙ্গল (East Bengal)।

ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা আগে দলের স্প্যানিশ কোচ অস্কার ব্রুজো ফুটবলারদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন, শেষ ৯০ মিনিট যেন তাঁরা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেন। গুরুর সেই মন্ত্র মেনেই কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে পিছিয়ে পড়েও ইন্টার কাশীকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন মিগুয়েল ফিগুয়েরা, রশিদ, ইউসেফ এজেজারিরা।
ইস্টবেঙ্গলের পাশাপাশি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানেরও সুযোগ ছিল খেতাব জেতার।

তবে তার জন্য লাল-হলুদকে পয়েন্ট নষ্ট করতে হতো এবং সবুজ-মেরুনকে নিজেদের ম্যাচ জিততে হতো। কিন্তু রবিবার তার কোনোটিই ঘটেনি। কিশোর ভারতীতে যখন ইস্টবেঙ্গল জয় ছিনিয়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে এসসি দিল্লির সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে বসল মোহনবাগান।
ইন্টার কাশী ও দিল্লির মতো তুলনামূলক খাটো দলের বিরুদ্ধে পয়েন্ট নষ্টের খেসারত দিতে হলো সের্জিয়ো লোবেরার ছেলেদের। অন্য ম্যাচে মুম্বই সিটি এফসি শেষ লড়াইয়ে পঞ্জাবকে হারিয়ে দেওয়ায় লিগ টেবিলে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করল তারা। আর গত দু’বারের চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগানকে সন্তুষ্ট থাকতে হলো তিন নম্বরে।

এ দিন কিশোর ভারতী স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮,১১২ জন লাল-হলুদ সমর্থকের চিৎকারে কান পাতা দায় ছিল। তবে ম্যাচের ১৪ মিনিটের মাথায় গ্যালারিকে স্তব্ধ করে দেয় ইন্টার কাশী। সুমিত পাসির একটি লম্বা বল ধরে পায়ের নিখুঁত টোকায় ইস্টবেঙ্গল গোলরক্ষক প্রভসুখন সিংহকে পরাস্ত করে গোল করে যান আলফ্রেড প্লানাস। ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি ইস্টবেঙ্গল।
বিশেষ করে বাঁ প্রান্ত ধরে বিপিন সিংহের একের পর এক বিষাক্ত ক্রস ভেসে আসতে থাকে ইন্টার কাশীর বক্সে। এর মাঝেই সমতা ফেরানোর সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ইউসেফ এজেজারি। শুধু পায়ের ছোঁয়া লাগালেই যেখানে গোল হতো, সেখানে জোরে শট মারতে গিয়ে বল বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন তিনি। প্রথমার্ধে পয়েন্ট তালিকায় পিছিয়ে থাকা ইন্টার কাশী বেশ কয়েকবার গোল করার পরিস্থিতি তৈরি করলেও প্রভসুখনের দক্ষতায় আর গোল খায়নি লাল-হলুদ। ফলে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় অস্কারের দল।

খেতাবি লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল পাওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল ইস্টবেঙ্গলের। সেই অনুযায়ী আক্রমণের ধার বাড়ায় তারা। ফলও মেলে হাতেনাতে; ৪৯ মিনিটের মাথায় ইন্টার কাশীর গোলরক্ষক শুভম ধাসের মস্ত বড় ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান এজেজারি। উল্লেখ্য, ইস্টবেঙ্গলের এই ফরোয়ার্ডই চলতি মরসুমে সর্বাধিক গোলদাতার নজির গড়ে ‘সোনার বুট’ (Golden Boot) নিজের নামে করতে চলেছেন।

ম্যাচে সমতা ফিরলেও ড্রয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না অস্কার ব্রুজ়ো। জয় নিশ্চিত করতে আক্রমণ ভাগে একের পর এক ফুটবলার তুলে আনেন তিনি। অবশেষে ৭২ মিনিটের মাথায় কাঙ্ক্ষিত গোলটি পেয়ে যায় মশাল বাহিনী। সেই বিপিনেরই একটি চমৎকার ক্রসে পা ছুঁইয়ে ইস্টবেঙ্গলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন রশিদ।
চলতি মরসুমে এটিই রশিদের প্রথম গোল, যা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে লাল-হলুদের ইতিহাসে। গোলের পর আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি রশিদ, ফেন্সের ওপর উঠে সমর্থকদের সঙ্গে মাতেন বাঁধনভাঙা উল্লাসে। অন্য ম্যাচে মুম্বই এগিয়ে থাকায় অস্কারের দল জানত— ড্র করলেও ট্রফি হাতছাড়া হবে। তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রক্ষণের দেওয়াল শক্ত রেখে ইন্টার কাশীর সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে দেয় লাল-হলুদ ব্রিগেড।

রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সঙ্গেই সঙ্গেই মাঠ জুড়ে শুরু হয়ে যায় রাজকীয় উদযাপন। ফুটবলার, কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার লাল-হলুদ জনতার চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফুটবল ভারতের নতুন রাজা এখন ইস্টবেঙ্গল।



