বিচারের জন্য কাঁদছি ,গণতন্ত্রকে রক্ষা করুন! প্রধান বিচারপতির এজলাসে আবেগ ভরা গলায় সওয়াল মমতার , পরের শুনানি সোমবার, নোটিস জারি করল সুপ্রিম কোর্ট

0
8

তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের করা এসআইআর সংক্রান্ত মামলার সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীর করা মামলাটি শুনল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। এজলাসে সামনের সারিতে আইনজীবীদের পাশে দাঁড়িয়ে সওয়াল করেন মমতা।কোর্টরুমে গর্জে উঠলেন মমতা, প্রায় সমস্ত যুক্তি মেনে নিল আদালত, পরের শুনানি সোমবার

দেশের ইতিহাসে প্রথমবার। সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাধীনোত্তর ভারতে এই প্রথম কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এভাবে সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি যুক্তি তর্কের জাল বুনলেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে।

বুধবার দুপুর ১টার পর সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয় এসআইআর মামলার শুনানি। এদিন সুপ্রিমকোর্টের তিন বিচারপতির কাছে পাঁচ মিনিট বক্তব্য পেশের জন্য আবেদন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 

সুপ্রিম কোর্টে মামলার শুনানির শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, 
‘আমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছি। গোটা পরিস্থিতির ব্যাখা করতে পারি। এসআইআর-এর নামে কী চলছে, বলার জন্য পাঁচ মিনিট সময় চাই। জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে ছ’বার চিঠি দিয়েছি। কোনও উত্তর পাইনি। কোনও বিচার পাইনি। বিয়ের পর পদবি পরিবর্তনের জন্যেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই লড়াই দলের জন্য নয়, রাজ্যের জন্য।’ 

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার তালিকায় থাকুক, নিশ্চয়ই চান না? যাঁরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে চলে গেলেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় থাকুক, নিশ্চয়ই চান না?’ 

মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ জানান, ‘বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে মাইক্রো অবজারভার নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁরাই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছেন। ৫৮ লক্ষের নাম বাদ দিয়েছেন। অনেকে জীবিত রয়েছেন। মাইক্রো অবজার্ভার নাম মুছে দিচ্ছেন। অসমে কেন এসআইআর হচ্ছে না? হঠাৎ ভোটের আগে ২৪ বছর পর কেন বাংলায় এসআইআর হচ্ছে?’

সওয়ালের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে কিছু ছবি রয়েছে। সেটি দেখানোর অনুমতি দেওয়া হোক। সেটি আমার ছবি না। প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের ছবি। আপনারা আধার কার্ড নিতে বলেছিলেন। কিন্তু নেওয়া হয়নি। অন্য নথি চাওয়া হয়েছে। ১০০ জনের বেশি মারা গিয়েছেন। ভাবতে পারেন! বাংলাকে টার্গেট করা হয়েছে।’

এদিন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি হয়। এসআইআর মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী সোমবার।

বুধবার দুপুরে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে গেল সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতির এজলাসে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে সওয়াল করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এ ধরনের সওয়াল সম্ভবত স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে এই প্রথম।

তবে এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্য আর সংযমের আড়ালে উঠে আসে গভীর হতাশা। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সবকিছু শেষ হয়ে যায়, অথচ ন্যায় মেলে না। যখন ন্যায় দরজার আড়ালে কাঁদে—তখনই মনে হয়, কোথাও আমরা ন্যায় পাচ্ছি না।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে একাধিক চিঠিও লিখেছেন। তবে স্পষ্ট করে দেন, “আমি খুবই নগণ্য একজন মানুষ। আমি এখানে আমার দলের জন্য লড়ছি না।” মুখ্যমন্ত্রী বোঝাতে চান, রাজনৈতিক তর্কের বাইরে গিয়ে নাগরিক অধিকারের প্রশ্নটিই তিনি সামনে রাখতে চাইছেন।

এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নিজ অধিকারেই একটি আবেদন দায়ের করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে—এই মামলায় দেশের অন্যতম সেরা আইনজীবীরা রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করছেন। বিশেষ করে সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিব্বালের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বেঞ্চ জানায়, গত ১৯ জানুয়ারি সিব্বাল রাজ্যের প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত জটিলতাগুলি ব্যাখ্যা করেছিলেন।

আদালতের মতে, সিব্বাল স্পষ্টভাবে রাজ্যের সেই ‘যথার্থ আশঙ্কা’র কথাগুলি তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত ও স্থায়ী বাসিন্দা তথা নাগরিকরা বাদ পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এই আশঙ্কার ব্যাপারটাই বর্তমানে মামলার কেন্দ্রবিন্দু।

মুখ্যমন্ত্রী এদিন করজোড় করে সওয়াল শুরু করেন। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতি যখন তাঁকে ব্যাখ্যা করে বলেন যে, মুখ্যমন্ত্রী মামলা করেছেন ঠিকই, কিন্তু এই কথাটাই তো রাজ্যের আইনজীবীরা বলেছেন। উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে ৫ মিনিট বলতে দিন’।
জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, ম্যাডাম ৫ মিনিটি বা ১৫ মিনিটের ব্যাপার নয়। তিনি বলেন, মূল বিষয় হল, কোনও নায্য নাগরিকের নাম যেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায়।

এর সূত্র ধরেই তাঁর সওয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এঅই এসআইআরের (SIR) আসল উদ্দেশ্য শুধুই নাম বাদ দেওয়া। তাঁর কথায়, “এই প্রক্রিয়া শুধুই ডিলিশনের জন্য। গোটা পরিকল্পনাতেই গরমিল রয়েছে।”

বাস্তব উদাহরণ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ধরা যাক, কোনও মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে চলে গেল। স্বাভাবিকভাবেই সে স্বামীর পদবি ব্যবহার করছে। তাহলে কি সেটাকেই ‘মিসম্যাচ’ বলা হবে?”

এই বক্তব্যের জবাবে বেঞ্চ থেকে জানানো হয়, এমনটা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা বলেন, “ঠিক এটাই করা হয়েছে। এমন বহু কন্যাসন্তান আছেন, যাঁরা শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। অনেক গরিব মানুষ কাজের তাগিদে জায়গা বদলান—সেই কারণেও তাঁদের নাম কাটা হয়েছে, বলা হচ্ছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’।”

মুখ্যমন্ত্রী জানান, আদালতের নির্দেশে আধারকে নথি হিসেবে গ্রহণ করায় বাংলার মানুষ স্বস্তি পেয়েছেন। তাঁর কথায়, “বাংলার মানুষ খুশি যে এই আদালত বলেছে আধার একটি বৈধ নথি হবে। অথচ অন্য রাজ্যে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট চলে, কাস্ট সার্টিফিকেটও চলে। শুধু বাংলাকেই টার্গেট করা হয়েছে, তাও ভোটের ঠিক আগে।”

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি চারটি প্রশ্ন করেন। তা হল—“চারটি রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে। ২৪ বছর পরে হঠাৎ করে তিন মাসের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করার এত তাড়া কেন? যখন ফসল কাটার মরসুম চলছে, মানুষ বাইরে কাজে যাচ্ছে—ঠিক তখনই কেন?”

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই প্রক্রিয়ার চাপেই ভয়াবহ পরিণতি হয়েছে। “১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বহু বিএলও (BLO) মারা গিয়েছেন, অনেকে এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এসআই আর অসমে হচ্ছে না কেন? শুধু বাংলাই কেন?”

এদিন সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোটা সওয়াল পর্বই ছিল দেখার মতো। এদিন জোরালো সওয়াল করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,“ “ইআরও–র (ERO) কোনও ক্ষমতাই রাখা হয়নি। ইআরও–র সমস্ত ক্ষমতা খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৮,৩০০ মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছে—যাঁরা বিজেপি শাসিত রাজ্য থেকে এসেছেন। অফিসে বসেই মাইক্রো অবজারভাররা নাম কেটে দিতে পারেন”। তাঁর কথায়,“বাংলায় ফর্ম–৬ জমা দিতেও দেওয়া হয়নি। লক্ষ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। এমনকি বহু জীবিত মানুষকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এরা মহিলা-বিরোধী।”

ঠিক এই মুহুর্তে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত নির্দেশ দেন, প্রতিটি নথিতে অনুমোদিত বিএলও (BLO)–র স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করা হবে।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেন নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী। তিনি বলেন, “ইআরও নিয়োগের জন্য আমরা বারবার রাজ্য সরকারকে ক্লাস–টু অফিসার দেওয়ার অনুরোধ করেছি। রাজ্য মাত্র ৮০ জন সেই স্তরের অফিসার দিয়েছে, বাকিরা নিম্নপদমর্যাদার। তাই বাধ্য হয়ে মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ করতে হয়েছে। এতে ত্রুটি রাজ্যের দিকেই। মাইক্রো অবজারভাররা বৈধভাবেই নিয়োগপ্রাপ্ত।”

মুখ্যমন্ত্রী পাল্টা বলেন, “এর কোনও বিধিবদ্ধ নিয়ম নেই।” জবাবের নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী বলেন, “রাজ্য সহযোগিতা না করলে অন্য কোনও উপায় থাকে না।” প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, “আমরা তো সময় বাড়িয়েই যাচ্ছি।” এ সময়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মাই লর্ডস, আমার বিরোধী পক্ষের আইনজীবী যা বলেছেন, তা সঠিক নয়।” বেঞ্চের তরফে তখন জানানো হয়, “ম্যাডাম মমতা, শ্রীমান দ্বিবেদীর দক্ষতা নিয়ে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই। তবে আপনার বক্তব্যও আমরা গুরুত্ব দিয়ে শুনছি।”

মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিষয়টি জেলা ভেদে আলাদা। “এসডিএম–এর ক্ষেত্রেও জেলার উপর নির্ভর করে। আমাদের যতটা জনবল ছিল, আমরা দিয়েছি। ওঁরা যা বলছেন, আমি তা বিশ্বাস করি না।”
তবে শুনানির প্রায় শেষে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “আমরা বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে পারি। সোমবারের মধ্যে রাজ্য যে গ্রুপ–বি অফিসারদের দিতে পারবে, তার তালিকা দিন।”

আদালতের নির্দেশে নোটিস জারি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী এর পরেও দাবি করেন, “৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে, অথচ আপিল করার কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। শুধু বাংলাকেই টার্গেট করা হচ্ছে—বাংলার মানুষকে কার্যত বুলডোজ করার চেষ্টা চলছে। এলডি–র ক্ষেত্রে নাম কাটা যাবে না। তা যাচাই করবেন ডিও ও ইআরও, মাইক্রো অবজারভার নয়।”

প্রধান বিচারপতি পর্যবেক্ষণ জানান, প্রয়োজনীয় অফিসার পাওয়া গেলে হয়তো আর মাইক্রো অবজারভারের দরকারই হবে না। নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশে তিনি বলেন, আধিকারিকদের আরও সংবেদনশীল হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় নোটিস জারি না করার দিকেও নজর দিতে হবে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী সোমবার।

Previous article‘SIR’: কালো রোব পরে শীর্ষ কোর্টে সওয়ালে ‘উকিল’ মমতা ? আজ  সব নজর সুপ্রিম কোর্টে 
Next articleভোটের আগে দু’বাংলার নাগরিক সেতু বন্ধনে মাতৃভাষা দিবস নিয়ে বার্তা বাংলাদেশ‌ দূতাবাসের

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here