Nipah Virus: খেজুর রস আর   বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রামের বিয়েবাড়িই নিপার উৎস? গভীর সঙ্কটে ২ নার্স 

0
284

 নদিয়ার বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের বিয়েবাড়ি এবং পর পর দু’ দিন একসঙ্গে নাইট ডিউটি। একেবারে প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুই নার্সের নিপা সংক্রমণের উৎস এমনটা বলেই মনে করছে কেন্দ্রীয় ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ (এনজেওআরটি)। নিশ্চিত ভাবে না বললেও, এই দু’টি বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে তাদের ১১ পাতার রিপোর্টে। বুধবারও ওই দুই নার্স তাঁদের কর্মস্থল, বারাসতের বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-তে গভীর কোমায় ভেন্টিলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দু’জনের অবস্থাই অতি সঙ্কটজনক।

সোমবার বিকেলে বাংলায় নিপা ভাইরাসে  আক্রান্ত দু’জনের খোঁজ মিলতেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তৎপরতা শুরু হয়। আক্রান্ত দু’জনই সেদিন থেকেই বারাসতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাজ্যে নিপার হদিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজ্য সরকারকে সহায়তা করতে পাঠানো হয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল জয়েন্ট আউটব্রেক রেসপন্স টিম’ । কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

এদিকে মঙ্গলবার থেকেই উদ্বেগ বাড়ে। কারণ আক্রান্তদের মধ্যে এক মহিলা নার্সের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। রাতের দিকে চিকিৎসকরা জানান, তিনি অত্যন্ত সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন। বুধবার সকালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়, ওই নার্স কোমায় চলে গিয়েছেন এবং তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, আক্রান্ত আরেক পুরুষ নার্সের অবস্থার তুলনামূলক উন্নতি হয়েছে। তিনি এখনও ভেন্টিলেশনে থাকলেও চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

নিপার উৎস–ইঙ্গিত কেন্দ্রীয় রিপোর্টে
তবে আগাগোড়া স্বাস্থ্যকর্তাদের যে বিষয়টি ভাবিয়ে আসছিল, দুই নার্সের নিপা সংক্রমণের সেই উৎসের দিকে কিছুটা আলোকপাত করেছে কেন্দ্রীয় এনজেওআরটি-র রিপোর্ট। তাতে ওই দু’ জনের সংক্রমণের কবলে পড়ার সম্ভাব্য কারণ তাঁদের গতিবিধি-সহ বিস্তারিত ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গত ১৫ থেকে ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে সিস্টার নার্স নদিয়া জেলার ঘুগরাগাছি গ্রামে যান। সেটি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী একটি গ্রামীণ এলাকা। সেখানে তিনি একটি পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। ওই অঞ্চলে খেজুর-রস ও খেজুরের গুড় ব্যাপক ভাবে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এপিডেমিয়োলজি বা মহামারীবিদ্যায় ওই তল্লাটটি এবং সীমান্তপার বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকাগুলি বরাবরই বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের (জ়ুনোটিক স্পিল ওভার) সঙ্গে যুক্ত বলে চিহ্নিত। তবে ওই সিস্টার-নার্স খেজুর-রস বা গুড় খেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে। তবে পরবর্তী ক্লিনিক্যাল গতিপ্রকৃতি বিচার করে রিপোর্টে ধারণা করা হয়েছে, ওই সফরেই নার্সের প্রাথমিক সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস তৈরি হয়েছিল।

ঘুগরাগাছি থেকে ফেরার পরে ১৮ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই সিস্টার-নার্স মাঝেমধ্যে হালকা সর্দি-কাশিতে ভুগলেও জ্বরে একবারও পড়েননি। রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, মামুলি উপসর্গ হলেও সেগুলি পরবর্তী কালের গুরুতর অসুস্থতার প্রাথমিক পূর্বলক্ষণ ছিল, নাকি নেহাতই কাকতালীয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁর প্রথম জ্বর আসে। ৩১ ডিসেম্বর তিনি একটি অ্যাকাডেমিক পরীক্ষার জন্য শান্তিনিকেতনে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথেই ধুম জ্বর আসে। হাওড়া স্টেশন থেকে বাবার সঙ্গে কাটোয়ার বাড়িতে চলে যান তিনি।

গত ১ থেকে ৩ জানুয়ারি প্রায় ১০২–১০৩ ডিগ্রির প্রবল জ্বর ছিল সিস্টার-নার্সের। বেড়ে গিয়েছিল কাশি। সঙ্গে প্রবল মাথাব্যথা, বমি ভাব এবং সারা শরীরজোড়া অস্বস্তি। ৩ তারিখ অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে মামুলি অসুস্থতা নিয়েই তিনি নিয়মিত নার্সিং ডিউটি করে আসছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সে সময়েই, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর তাঁর সঙ্গে পর পর দু’ দিন নাইট ডিউটি করেন ওই ব্রাদার-নার্স। তবে দীর্ঘ সময় ধরে খুব কাছাকাছি থাকার মতো কোনও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। তাই সরাসরি সংক্রমণের পক্ষে কোনও স্পষ্ট এপিডেমিয়োলজিক্যাল প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত করা যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে রিপোর্টে।

ঘটনা হলো, এর পরে ২৭ ডিসেম্বর ওই ব্রাদার-নার্সও অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে উল্লেখ রয়েছে কেন্দ্রীয় রিপোর্টে। সে দিন কাঁপুনি দিয়ে তাঁর জ্বর আসে। এর পর ক্রমাগত শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৪ জানুয়ারি হাসপাতালে ভর্তির পরেও তা থামেনি। ৮ ও ৯ তারিখ তাঁর শরীরে শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক গোলযোগ শুরু হয়। তবে রিপোর্টে বলা হয়েছে, অসুস্থ হওয়ার আগের একমাস তিনি বারাসত হাসপাতালের উল্টোদিকে যেখানে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতেন, বাড়ি-হাসপাতাল করার বাইরে আর কোথাও যাননি। এমনকী পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নাতে নিজের বাড়িতেও নয়।

এ ছাড়াও বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অ্যাকিউট এনকেফালোপ্যাথি সিনড্রোমে আক্রান্ত এক তরুণীকেও আইডি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। নিপা সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকায় তাকেও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। বুধবার তাঁদের প্রত্যেকের নমুনা পাঠানো হয়েছে কল্যাণী এইমসের ল্যাবে।
দু’জন নার্স নিপায় আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তাঁদের সংস্পর্শে আসা মোট ৪৫ জনের নমুনা ইতিমধ্যেই কল্যাণীতে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর।

সতর্ক প্রশাসন
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, আক্রান্ত মহিলা নার্সের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১৪ জনের রক্তের নমুনা এইমস-এ পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি কাটোয়া হাসপাতাল ও বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।
বারাসতের ওই বেসরকারি হাসপাতালের অন্তত ২২ জন স্টাফকে কোয়ারান্টিনে রাখা হয়েছে বলে খবর। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। জানা যাচ্ছে, আক্রান্ত মহিলা নার্স হৃদয়পুর এলাকার একটি মেসবাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

রাজ্যে নিপা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়তেই নজরদারি, আইসোলেশন এবং পরীক্ষার পরিসর দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতর ও কেন্দ্রীয় টিম পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।

স্বাস্থ্যভবন সজাগ রয়েছে, তাঁদের সংস্পর্শে আসা কেউ হোক বা অন্য কেউ— উপসর্গ দেখা দিলে একেবারে গোড়া থেকে চিকিৎসা শুরু করতে যেন বিন্দুমাত্র দেরি না হয়। মঙ্গলবারই ১২০ জনকে কোয়ারান্টিনে পাঠানো হয়েছিল। বুধবার সেই সংখ্যাটা আরও বেড়ে ৮২ হয়েছে। এর মধ্যে বর্ধমানেই নতুন করে ৩৪ জনকে কোয়ারান্টিন করা হয়েছে বাড়িতে। বর্ধমানে এ দিন ভিজ়িটে যান কেন্দ্রীয় এনজেওআরটি-র সদস্যরা। দফায় দফায় তাঁরা ভার্চুয়াল বৈঠকও করেন স্বাস্থ্যভবনের কর্তাদের সঙ্গে। আইডি সূত্রে খবর, সেখানে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) থেকে নিপা টেস্টের নমুনা সংগ্রহের উপযোগী একটি বাস পাঠানো হয়েছে। যদি দেখা যায়, কোথাও নিপা আক্রান্ত বা সন্দেহভাজনের সংখ্যা বাড়ছে, তখন সেই জেলায় বাসটিকে পাঠানো হবে।

Previous articleপালাই পালাই করছে শীত!‌ কী বলছে আবহাওয়া দপ্তর?
Next articleজাতীয় স্কুল জিমনাস্টিকস গেমসের আসর বসছে বাংলায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here