মার্কিন-ইজরায়েল হামলায় খামেনেই নিহত ,সরকারি স্বীকৃতি দিয়ে ‘ভয়াবহ’ হামলার প্রস্তুতি ইরানের
deshersamay


আরব দুনিয়ার ভূরাজনীতিতে বড়সড় বিস্ফোরণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। ইসলামিক রিপাবলিকের উপর চালানো এই সামরিক অভিযানের পরেই এই সরকারি স্বীকৃতি। সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে ইরান।
এই খবর সামনে আসার পরেই ফুঁসছে ইরানের সেনাবাহিনী। সুপ্রিম নেতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে ইরানের তরফে।

রবিবার ইরানের রেভলিউশনারি গার্ডস টেলিগ্রামে বার্তা দিয়ে জানায়, ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণাত্মক অভিযান যে কোনও মুহূর্তে শুরু হতে পারে।’ তারা জানিয়েছে, এই হামলার লক্ষ্য হবে অঞ্চলের অধিকৃত এলাকা এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলি।
গালফ অঞ্চলের একাধিক দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলির উপর ইতিমধ্যেই ইরানের হামলার প্রভাব পড়েছে। রেভলিউশনারি গার্ডস আরও জানায়, ‘উম্মাহর ইমামের হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত ইরানি জাতির প্রতিশোধ থামবে না।’
ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সাধারণ সেনাবাহিনীর মতো প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীন নয়। তারা সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ নেতার অধীনে কাজ করে।

Leader of Islamic Revolution Ayatollah Ali Khamenei martyred in US-Israeli attacks on Iran pic.twitter.com/Qhu4WoDkrL
— Press TV 🔻 (@PressTV) March 1, 2026
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের দাবি, সাম্প্রতিক মার্কিন-ইজরায়েলি হামলায় খামেনেই প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘোষণা ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। কারণ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক ঘটনাই নয়, তা গোটা অঞ্চলের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
শুধু খামেনেই নন, এই হামলায় তাঁর মেয়ে, জামাই এবং তাঁদের সন্তানেরও মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ইরানের সরকারি স্বীকৃতির কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনেইয়ের মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি জানান, আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর থেকেই জল্পনা তুঙ্গে ওঠে, এবং প্রথমে সেই কথা অস্বীকার করলেও শেষপর্যন্ত তেহরানের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম তা নিশ্চিত করে।
ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই সামরিক অভিযানের মাত্রা ও প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আগেই দাবি করেছিলেন হামলায় নিহত হয়েছেন খামেনেই। কিন্তু সেই খবর প্রথমেই প্রকাশ্যে আনেনি ইরান, ইরানের সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের দাবি সরাসরি খারিজ করে দেয়। তারপরই খামেনেইয়ের সরকারি এক্স (প্রাক্তন টুইটার) অ্যাকাউন্টে ফারসি ভাষায় একটি সংক্ষিপ্ত পোস্ট করা হয়। তাতে লেখা: “নামি হায়দারের নামে (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হোক)।” সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ এই বার্তাকে কেন্দ্র করে ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করতে শুরু করে, ৮৬ বছরের এই নেতা হয়তো মার্কিন-ইজরায়েলি হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছেন।
৮৬ বছর বয়সি খামেনেই ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের শাসক। শিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি সরকারের সমস্ত শাখা, সামরিক বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার উপর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ধরে রেখেছিলেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ সামলালেও, যুক্তরাষ্ট্র-সহ বড় কোনও নীতি তাঁর স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া এগোতো না।
পশ্চিমের কট্টর বিরোধী হিসেবে তিনি পরিচিত। দেশের ভিতরে বিরোধী কণ্ঠ কঠোরভাবে দমন করেছেন, আবার আঞ্চলিকভাবে একাধিক ‘প্রক্সি’ শক্তিকে সমর্থন দিয়ে ইরানকে প্রভাবশালী ও ভীতিপ্রদ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার কৌশল নিয়েছেন।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, যা ইরানের রাজতন্ত্রের পতন ঘটায় এবং গোটা আরব দুনিয়াকে নাড়িয়ে দেয়, সেই তেহরানকেন্দ্রিক ধর্মতান্ত্রিক উত্থানের এক দশক পর, ১৯৮৯ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ নেতা হন।
সাম্প্রতিক সময় ছিল তাঁর শাসনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার দোলাচল চলছিল।
এই বছরই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হলে, ১৯৭৯-এর বিপ্লবের পর সবচেয়ে কঠোর দমনপীড়নের নির্দেশ দেন তিনি। “তাদের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া উচিত”, এই মন্তব্যের পর নিরাপত্তাবাহিনী গুলি চালায়। রাস্তায় স্লোগান ওঠে, “ডেথ টু দ্য ডিক্টেটর!”
শুধু তাই নয়, গত জুন মাসে ইস্রায়েল এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের ১২ দিনের বিমান হামলার সময় খামেনেইকে গা ঢাকা দিতে হয়। সেই হামলায় তাঁর একাধিক ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং রেভলিউশনারি গার্ড কমান্ডার নিহত হন। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইরান-সমর্থিত ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের ইজরায়েল আক্রমণ গোটা অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে। গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়, এবং তার পর থেকে তেহরানের অন্যান্য আঞ্চলিক মিত্রদেরও লক্ষ্যবস্তু করে ইজরায়েল।

লেবাননে হিজবোল্লা দুর্বল, সিরিয়ায় বসার আল আসাদ-এর পতন এই পরিস্থিতিতে আরব দুনিয়ায় খামেনেইয়ের প্রভাব কমে আসে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাপ বাড়ায়, ইরান যেন তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করে।
কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের শেষ কৌশলগত ভরসা, এই যুক্তিতে খামেনি তা নিয়ে আলোচনাই করতে অস্বীকার করেন। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থানই কি শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিশানা করা বিমান হামলার পথ প্রশস্ত করল? প্রশ্ন উঠছে।
বিপ্লব, ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দশকের পর দশক সংঘাত – এই অভিজ্ঞতায় গড়া এক রাজনৈতিক চরিত্র খামেনেই। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নির্মম ও কৌশলী। ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক-গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর তাঁর দখল এমন ছিল যে, তাঁর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার মতো সংগঠিত শক্তি কার্যত ছিল না।
খামেনেইয়ের মৃত্যুতে ইরানের স্বীকৃতি মেলায় ৩৬ বছরের সেই নেতৃত্বেরই অবসান ঘটল।

