

মাস জুড়ে রাজ্য ঘুরবেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। মঙ্গলে সভা করলেন বীরভূমে। সভা মঞ্চেই এদিন অভিষেক ব্যানার্জি জানান, এসআইআর শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে অমর্ত্য সেনকে।

এদিন অভিষেক বলেন, ‘হায় রে পোড়া কপাল! অমর্ত্য সেনকে হিয়ারিংয়ের নোটিস পাঠিয়েছে। অমর্ত্য সেন। ভারতবর্ষের জন্য নোবেল পুরস্কার জিতে এনেছেন। দেশের নাম যিনি বিশ্ববন্দিত করেছেন। যাঁর মাধ্যমে দেশকে চেনেন মানুষ, সেই অমর্ত্য সেনকে এসআইআর-এর নোটিস।’
অভিষেকের বক্তব্যে এদিন দেব-সামির প্রসঙ্গও। এদিন অভিষেক বলেন, ‘বাংলা সিনেমার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, অভিনেতা দেব, তাঁকে হিয়ারিং নোটিস পাঠিয়েছে। মহম্মদ সামি, যে দেশের জন্য বিশ্বকাপ জিতেছে, তাকে এসআইআর-এর নোটিস পাঠিয়েছে। নোটিস পাঠিয়ে আনম্যাপ করে দেওয়ার চক্রান্ত।’

এদিন হুঁশিয়ারির সুরে অভিষেকের আহ্বান , “যাঁদের আনম্যাপড করতে চাইছে, গণতন্ত্রের নামে এই খেলায় সায় দেবেন না। এবারের ভোটে এদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করুন।”
বক্তব্যের শুরুতে কপ্টার সমস্যা নিয়েও সুর চড়ান অভিষেক। বলেন, ‘আমার আসতে দেরি হয়েছে। আমার এখানে সাড়ে বারোটা, একটার মধ্যে পৌঁছে গিয়ে, একটা থেকে দেড়টার মধ্যে তারাপীঠ মন্দিরে পুজো দিয়ে সভাস্থলে আসার কথা ছিল।’ তারপরেই বিজেপিকে তোপ দেগে বলেন, ‘এখনও নির্বাচন শুরুই হয়নি।

আমার যে হেলিকপ্টারে করে আসার কথা, এখনও নির্বাচন শুরু হয়নি, দিনকাল ঘোষণা হয়নি, তার আগে থেকেই বাংলাবিরোধী এবং জমিদারদের চক্রান্ত। আমার হেলিকপ্টারের অনুমতি, যেটা সকাল ১১টায় দেওয়ার কথা ছিল, এখনও দেয়নি।’
ঝাড়খণ্ড থেকে হেলিকপ্টার আনার প্রসঙ্গও এদিন উল্লেখ করেন। বলেন, ‘দু’ঘণ্টা দেরি হয়েছে। কিন্তু বিজেপির যা জেদ, বাংলা বিরোধিদের যা জেদ, তার দশগুণ জেদ আমার। আমি যদি কথা দিই, আমি কথা রাখি।’
বিজেপি নেতার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ইস্যুতে বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গ এদিন ফের উল্লেখ করেন অভিষেক। এর আগেও তিনি ওই ভিডিও শেয়ার করেছিলেন, এদিন ওই বক্তব্যের রেকর্ডিং শোনান।

এদিন বীরভূমে দাঁড়িয়েই, সেই জেলার বিজেপি নেতাদের একহাত নেন অভিষেক। একেবারে নাম ধরে বলেন, ‘বিজেপির যে নেতারা রয়েছেন, বিশেষত বীরভূমে, ধ্রুব সাহা। চিটফান্ড কেসে অভিযুক্ত। সুনীল সোরেন। এসটি সেলের সভাপতি ছিলেন। তিনি এক মহিলাকে বিয়ের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণ করে জেলে বন্দি ছিলেন। আগের জেলা সভাপতি সন্ন্যাসী চরণ মণ্ডলের বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ বিজেপির কর্মীরা তুলেছেন। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লিখিত ভাবে বিজেপি কর্মীরা সর্বভারতীয় সভাপতিকে বলছে, তিনি সিউড়িতে প্রচুর সম্পত্তি করেছেন। রাজারহাটে ফ্ল্যাট করেছেন।’
অভিষেকের দাবি, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে ভোটার তালিকা থেকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তাঁর কটাক্ষ, “এরা ভেবেছে ভয় দেখিয়ে, নোটিস দিয়ে মানুষকে সরিয়ে দেবে। কিন্তু বাংলার মানুষ সব দেখছে।”
টেনে এনেছেন পরিযায়ী শ্রমিক সোনালি বিবির প্রসঙ্গও, যাঁকে বাংলাদেশি বলে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক চরমে। অভিষেক বলেন, “এই মাটির একজন মেয়ে সোনালি খাতুন। জোর জবরদস্তি তাঁকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল কেন্দ্র। হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্টে লড়াই করে তৃণমূলের সৈনিকরা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে। গতকাল ও একটা ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। আজ আমি রামপুরহাটে দেখতে যাব।”
মঙ্গলবার দুপুরে বেহালা ফ্লাইং ক্লাব থেকে কপ্টারে রওনা হওয়ার কথা ছিল অভিষেকের। অভিযোগ, প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে উড়ানের অনুমতি আটকে দেয় ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ)। ফলে ফ্লাইং ক্লাবেই প্রায় ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় আটকে থাকেন তিনি।
তৃণমূলের একাংশের অভিযোগ, ঘটনা নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং বিজেপির ‘পরিকল্পিত বাধা’। নির্বাচনের আগে বিরোধী শিবিরকে মাঠে নামতে না-দেওয়ার ‘কৌশল’ বলেই দাবি তাঁদের। বিজেপি অবশ্য সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।
রামপুরহাটের সভামঞ্চ থেকে অভিষেকের হুঁশিয়ারি, “চক্রান্ত যত বাড়বে, মানুষের লড়াই তত দৃঢ় হবে। বাংলার মানুষ জবাব দেবে ভোটবাক্সে। গতবারের চেয়ে এবারে তৃণমূলের আসন সংখ্যা এবং ভোট শতাংশ দুটোই বাড়বে।”
মানুষকে আশ্বস্ত করে অভিষেক বলেন, ৩১ তারিখ দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলাম। আমাদের নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন ছিল, ওরা সদুত্তর দিতে পারেনি। যাঁদের নাম বাদ গেছে তাঁরা ফর্ম ৬ পূরণ করে জমা দিন। ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। তৃণমূল আপনাদের সঙ্গে আছে। কমিশনের চক্রান্ত আমরা রুখবই।

এসআইআর আবহেও মাঠে-ময়দানে বিজেপিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করে অভিষেক বলেন, মাঠে ময়দানে বিজেপি কোথায়? কারও কোনও অসুবিধা হলে বিজেপি কর্মীদের পাশে পান? ওদেরকে তো অনুবীক্ষণ যন্ত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, আগে যাঁরা সিপিএম করতো, তাঁরাই এখন বিজেপি করে। শুধু জার্সিটা বদলেছে। কোনও ভদ্রলোককে বিজেপিতে পাবেন না।
বাংলাদেশি ইস্যুতে এদিন অভিষেক বলেন, ‘যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের বাংলাদেশী বলে গত ৬ বছর ধরে অত্যাচার চালিয়ে গিয়েছে। বিজেপির সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তাদের নিযুক্ত করা রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতি, সেই বিজেপির সাংসদ বলছে বাংলাদেশী। সাংসদ অনন্ত মহারাজ বলছেন বাংলাদেশী। এই লড়াই বাংলার ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই।’ বাংলার জন্য কেন এই লড়াই গুরুত্বপূর্ণ তাও বলেন তৃণমূল সাংসদ। বলেন, ‘এই লড়াই কেন আমাদের কাছে, বাংলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ? এই লড়াই বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই। মমতা ব্যানার্জি জিতলে বাংলার ১০ কোটি মানুষ শান্তিতে থাকবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ থাকবে। তৃণমূল জিতলে দু’মুঠো ভাত আর বিরোধীরা কুপোকাত। আর বিজেপিত থাকলে ধর্মে ধর্মে আঘাত আর বিভাজন করে, অন্তর্ঘাত।’

একই সঙ্গে কর্মীদের সতর্ক করেছেন, তা বলে ভোটের ময়দানে এক ছটাক জমিও ছাড়বেন না। যে বুথে গতবারে ৫০ লিড ছিল, সেখানে ৫১ করতে হবে।
এদিন অভিষেকের সভায় ছিলেন তৃণমূলের বীরভূমের নেতা অনুব্রত মণ্ডল। তাঁর প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, “কেষ্টদা গতকাল মায়ের (তারপীঠ) কাছে বলে এসেছে ২৩০টা আসন দিতে হবে। আমি তো আরও ২০টা বাড়িয়ে বলব মা, এবারে ২৫০টা আসন দিতে। যে দল গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে একজন চিকেন প্যাটিস বিক্রেতাকে মারধর করে তাদের ভোটবাস্কে যোগ্য জবাব দিতেই হবে।”



