‘গল্প’

দেবন্বীতা চক্রবর্তী:

সেদিন আমার মনটা খুব খুশি খুশি ছিল , কি কারনে তা অতটা মনে নেই, মানুষের মন খারাপের যেমন কোনো কারন থাকে না তেমনই মন হঠাৎ ই যেন ভাল হয়ে গেছিল ৷ হয়তো প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ড সায়রার সাথে প্রেম প্রেম খেলাটা ফের একবার জমে যাবে এই আনন্দে, বা অনেকদিন বাদে বাড়ি এসে মায়ের হাতের রান্না করা রুটি ও মাংস দিয়ে জব্বর করে ডিনার টা সাটানোর জন্য বা ফিজিক্সের সেরা পেপারটা জমা দিয়ে এস এন স্যারের মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার জন্য মনটা বেজায় ফুরফুরে হয়ে আছে ।

এই তিনটে কারণ ছাড়া আর খুশি হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না হঠাৎ করে , তাও খুশি যখন হয়েছি তখন সেটা বজায় রাখাই কাজের মতো কাজ , কারণ বজায় রাখাটাই খুব চাপের আমার পক্ষে । হুট করে মাথা গরম হয়ে যায় আমার , আজ এখনও ঠিক আছে মাথাটা , ট্রেনেও আসার সময় বেকায়দা ভিড় হলেও আজ বেশি গন্ডোগোল করিনি ৷ অন্যদিন আমিই মারামারি করে সিট নেওয়ার সিংহভাগ দায়িত্বে থাকি ,মেইন লাইনের লোকাল ট্রেন বলে কথা ,ওটা ছাড়া কেমন যেন অসম্পূর্ণ ,আর কাউকে বেশি বাড়াবাড়ি করতে দেখলে কৌশলে কষিয়ে থাপ্পর, ঘুষিও চালিয়েছি কয়েকদিন ৷ তাই আমার বন্ধু রূপী ডেইলি প্যাসেঞ্জার রা আমাকে রগচটা বলে একটু সমীহ করেই চলে নয়তো এখনকার দিনে তো ওটা পাওয়া খুব দুষ্কর ৷

দোতলায় চলে এলাম ,শরীর টা টায়ার্ড থাকলেও এখনই ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছা হল না , জানালা দিয়ে দেখলাম দারুন একটা চাঁদ উঠেছে , ফুল মুন যাকে বলে , দেখেই সোজা ছাদে চলে এলাম । এসেই সায়রার কথা মনে পড়ে গেল ৷ মেয়েটার সাথে কয়েকদিন ছুটি কাটিয়ে এসেছিলাম দীঘা থেকে ,ওদের বাড়ি থেকে কোনো সমস্যা থাকে না এসব ব্যাপারে, মেয়ে সোজা বাবা মা কে বলে যায় অমুকের সাথে ডেটিং আছে , আমাদের মফঃস্বলের মেয়েদের মতো এত ভিতু নয় যে ভাল মানুষের মুখোশটা রেখে দিতে হবে ভেবে সত্যিকারের ইচ্ছেটা বলতে পারে না ৷ দেখতে বা চালচলনে ওই শহুরে মেয়েরা যেমন হয়, মাত্রাতিরিক্ত সুন্দরি আর ফটাফট ইংরাজীতে কথা বলে সাবলীল ভাবে ৷ হয় কে নয়, নয় কে হয় করা মেয়ে , টামইপাসের জন্য এর চেয়ে ভাল অপশন আর নেই , প্রথমে মনে করেছিলাম এর সাথে প্রেম করব তার পর দেখলাম সে ওতে আদৌ বিশ্বাসী নয় , সৌন্দর্যে বশ করে মাথা চিবিয়ে খেতে চায় ৷

আমি আগে বুঝতাম না এখন এসব মেয়েদের হাড়েহাড়ে চিনি৷ আর আমার মতো আপাত হ্যান্ডসাম ও স্কলার ছেলে হলে তো পোয়া বারো ,তাই আমিও ল্যাজে খেলানো শুরু করে দিলাম , প্রথমে বেশি পাত্তা দিতাম না , খুব একটা ঘাটাতাম ও না,বিনা যুদ্ধেই যে গোটা মেদিনী দিতে রাজি তাকে বেশি বোঝাতে যাওয়া বৃথা, আপনি ই অাসবে সুড়সুড় করে , হলও তাই।সে একটা নাম ও বলেছিল এই সম্পর্কের ….কি যেন একটা গালভরা নাম……হ্যাঁ মনে পড়েছে …..মিউচুয়াল অন্ডারস্ট্যানডিং……। মাঝে ওর সাথে কি নিয়ে যে ঝগড়া করেছিলাম চট করে মনে পড়ল না , তা ও শরীরের চাহিদাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল দেখে আজ একবার কল করতেই দেখলাম সেই ছিপে মাছ এখনও আটকে আছে ,এক বারেই ধরে ভাল মুখেই কথা বলল ৷ বুঝলাম মেয়েরা বোধহয় অ্যাটিটিউড্ ওয়ালা ছেলেদের বেশি পছন্দ করে , মিনমিনে স্বভাবের চিঠিতে প্রেম নিবেদন করা ছেলেদের মিনি বেড়ালের মতোই পা দিয়ে সড়িয়ে দেয় ৷ তাই সেও মিস করছিল তার মিউচুয়াল রিলেশনটা….হুঃ ….যত্তসব নটোঙ্কি, সব শালা শরীরই বোঝে , মেয়েরাও কম যায় না এখন ৷আমি জানি তার অনেক গুনমুগ্ধ ভক্ত ফ্যা ফ্যা করে তাকে ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে ফলো করে কিন্তু সে তাকেই মিস করে যে তাকে fb থেকে ব্লক করে দেওয়াক ক্ষমতা রাখে ৷ তাই আজ একবারেই ফোন ধরে কথা বলল ৷ বেচারি… এখনও চেনেনি আমাকে…….

চাঁদ টা যেন হাজার পাওয়ারের সাদা আলোর বাল্ব হয়ে বসে আছে আজ, আর রাতের নীল আকাশে পেঁজা পেঁজা মেঘ এসে জমাট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন ওদের কেউ আলাদা করে দেবে বলে ভয় দেখাচ্ছে ,এখনকার সমাজের মতো অবস্থা , যে যা ভাল কাজ করতে যাবে তাকেই ভয় আর লোভ দেখিয়ে কাটিয়ে দাও ,আর কেউ বেশি গিড়িম্বারি করলে সোজা উড়িয়ে দাও ।আমিও ভাবলাম মেঘ গুলোকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই ।

সিগারেট টা মায়ের চোখের আড়াল বলে ধরিয়ে মাত্র দুটো সুখটান দিয়েছি এমন সময় রাতের নিস্তব্ধতা বিদির্ণ করে আমার রোমান্টিসিজমের বারোটা বাজিয়ে কোথা থেকে কে যেন বিটকেল সুরে ভৈরব রাগ গাইতে শুরু করল ,প্যাঁ প্যাঁ করে হারমোনিয়াম বাজিয়ে ৷ এত বিশ্রি ষাড়ের মতো গলা নিয়ে কেন লোকে গান করে ,আর দুঃসাহস বলি হারি ,রাত ১২ টায় নাকি ভৈরব? ভাবতে ভাবতে মাথাটা হঠাৎ ধরে গেল ,ওদিকে পুরুষ কন্ঠ বিস্তার ছেড়ে স্থায়ীতে মন দিয়েছে ৷ এতো দেখছি মহা আপদ!!!! রাগে গড়গড় করতে করতে নীচে গিয়ে দেখি মা শুয়েপড়ার তোড়জোড় করছে ,জিজ্ঞাসা করে জানলাম পাশের বাড়ি এই একমাস হল এক বুড়ো ভাড়া এসেছে ,তার সারা দিন কি কাজ থাকে জানা যায় নি ,কিন্তু রাতে সে মিঞা তান সেন হয়ে পাড়ার লোকের ঘুম নষ্ট করে,ফের আবার সকাল বেলা বসে ,আর কোনো কোনো দিন গানের গুঁতো অত্যাধিক পরিমান বেড়ে গেলে দুপুরেও ওস্তাদ আলাউদ্দিন হয়ে যায় বইকি৷ মোট কথা বিগত একমাস আমাদের , গলুদের আর মনিপিসি দের এই তিনটি বাড়ির ঘুম উড়ে যাওয়ার একমাত্র কারন এই বেসুরো বেতালা আলাপ ৷

আমি প্রমাদ গুনলাম , আমার মাথা যে ধীরে ধীরে গরম হচ্ছে সেটা আমি মুখে কিছু না বললেও বাবা মা আমার মুখের ভাবভঙ্গি দেখেই বুঝে নিল ৷ আমাকে কোনো মতে ঠান্ডা করে ঘুমতে পাঠিয়ে দিল আমার ঘরে, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না ,ঘর যেন হারমোনিয়ামের শব্দে গম গম করছে ,আমার দোতলার ঘরের জানালা আর পাশের ভাড়া বাড়ির দোতলার জালানা প্রায় লাগোয়া ,আর ব্যাটা জানালা খুলে দিয়ে তারস্বরে উদারা মুদারা তারা বাজিয়ে চিৎকার করছে ৷ রাগ তো হলই সাথে অবাক ও লাগল ,এতক্ষন ধরে শুনছি ব্যাটা ভাল করে “সা” টাই লাগাতে পারল না ,আবার ভৈরবের বন্দিশ ..”জাগো মোহন প্যারে …..”গাইছে ৷

মাথাটা ভাল মতোই ধরে গেল ,ভাবলাম কাল মালটাকে দেখে নেব , শুয়ে পড়লাম কানে হেডফোন গুঁজে , কিন্তু হেডফোন ছাপিয়ে সেই বিক্রিত বিকট আ…আ..চিৎকার আসতে লাগল..। রাতে আর সায়রাকে মেসেজ করা হল না আমার ।

পরদিন রবিবার , সুন্দর ফুরফুরে ফাগুনের বাতাস, ঝলমলে রোদ আর সাথে জানলার পাশের ঝাপসা পিপুল গাছটার পাতা ঝরা দেখছিলাম , কোকিলের কুহুতান শুনছি চোখ মেলে ৷ কাল রাতে বিভিষিকা কাটিয়ে যখন ঘুমালাম তখন মোবাইলে দেখি রাত ২ টো ৷ উঠব উঠব করেও উঠছিলাম না সকালে দেখলাম সায়রা গুড মর্নিং পাঠিয়েছে ,দারুন একটা আমেজ ছিল, প্রেমের পক্ষে আইডিয়াল সকাল । তবে মনে মনে ভাবলাম আমার তো গুড আর এই সস্তার তানসেন ব্যাটার ভেরি ব্যাড ডে করে তবেই ছাড়ব ৷

কিন্তু কোথায় কি ?আমি শুয়ে শুয়েই শুনলাম তবলার ঠংঠং সহযোগে ব্যাটা আবার গান বাজনা শুরু করে দিল বিপুল বিক্রমে ৷ খোলা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম বিরাট বড় এক পশ্দদ্দেশ নিয়ে এক তবলা বাদক যা খুশি তাই চাঁটি মেরে চলেছে বায়াতে, আর গায়ক মাল টার শুধু সাদা রঙের শার্ট দেখা যাচ্ছে ৷ এ কি বিপদ এসে পড়ল কে জানে!!!জান একেবারে কয়লা করে ছেড়ে দিচ্ছে ৷ ফাল্গুন মাসের পাতাঝরা সকালে মেঘমল্লার কোন লোক গাইতে পারে ভেবে পেলাম না ,সাথে আবার সুগ্রীব দোসর তবলা বাদক ৷ অমানুষের বাচ্চারা কি যে বিষম জ্বালায় ফেলল সে বলে বলে বোঝানো যাবে না , এক ঝটকায় খাট থেকে উঠে ঝটপট রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম , মনি পিসিদের বাড়ি থেকে শানুকে জবরদস্তি ঘুম থেকে তুলতে হল কারন বেচারা আমার পরে ঘুমিয়েছে ,আর গলুকে বাইকে তুলে নিয়ে তিন মক্কেল জরুরি মিটিং এ বসলাম ভটাদার চায়ের দোকানে, কি করে মাল টার সংগীত প্রীতি কমানো যায় ৷

একটা নাম ও দিয়ে দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে ..ভীষ্মলোচন ৷আওয়াজটা দিল্লি থেকে বর্মা যাওয়ার পথ পরিবর্তন করে আমাদের তিন জনের বাড়ির উপরে কালো ছায়ার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে ৷

প্ল্যান অনুযায়ী , বিকেলে যখন সে আবার গান নিয়ে বসল তখন আমি আমার ঘরের মিউজিক সিস্টেমটা ফুল ভল্যুমে ছেড়ে দিলাম । নানা রকম বিকট ঝ্যাকানেকা গান শুরু হয়ে গেল । ইদানিং কালের যন্ত্রিক রিমেক, হাই বিটের গান ,হিন্দি ইংলিশ জগাখিচুরি,পাঞ্জাবী ভাংরা কিছুই বাদ দিলাম না ৷ ফলস্বরূপভাড়া বাড়ির জানালা গুলো পটাপট সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল ৷ সপ্তপদী সিনেমার উত্তম কুমারের কথা মনে পড়ে গেল ,যুদ্ধজয়ের আনন্দে মায়ের কাছে গিয়ে ব্যাপারটা জানাতেই মা তো রেগে লাল ৷ গান গুলোর জন্য মালটার যতটা না হ্যারাসমেন্ট হয়েছে তার দ্বিগুন পরিমান কর্নযন্ত্রনায় কষ্ট হয়েছে মায়ের ৷

মা সন্ধ্যাদিতে গিয়ে জপে মন দিতে পারেনি ৷ মায়ের বক্তব্য তার চেয়ে ওই রামদিন ধোপার গাধার ডাক অনেক ভাল । আমি মুষঢ়ে পড়লাম ,ব্যাটার কানের গোড়ায় জম্পেশ করে বাজিয়ে দিতে ইচ্ছা হল ৷ ২ থেকে ৩ বছর আগে হলেও বাপের নাম খগেন করে ছাড়তাম ,কিন্তু পি এইচ ডি করতে করতে কবে যেন সম্মানের দিকটা নিয়েও একটু কনসার্ন হয়ে পড়েছি ,এখন অনেকটা নিজেকে বশ করতে পারি, এতক্ষণ যে ওর বাড়ি গিয়ে তান্ডব শুরু করিনি এই ওর চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য ,একটা মানুষের গানের কোনো টাইমিং সেন্স থাকবেনা ? আমিও ছোট থেকে গান বাজনার মধ্যেই বড় হয়েছি , স্কুলে তবলা বাজাতাম , এটুকু তো জানি কখন কি রাগ বা রাগিনী গাইতে হয় ৷

রাগের পরিচয় বই বা খাতায় লেখা থাকে পরিষ্কার করে সেটা কি লোকটা দেখে না নাকি ইচ্ছা করে এসব করছে মানুষকে অতিষ্ট করার জন্য? নাহলে ভর সন্ধ্যায় জৈনপুরি গাওয়ার সময়? সেটা গাইতে হয় দিবা দ্বিতীয় প্রহর ৷ এই সব কি গান গাওয়া হচ্ছে নাকি আমার শ্রাদ্ধের পিন্ডি হচ্ছে !!!!! রাত বাড়লেই ওই লোকের গাওয়া ভৈবর কালোয়াতির তানের মতো লাগে । মা ছেলের তর্কের মধ্যেই আড়চোখে দেখি ব্যাটা জানালা খুলে দিয়েছে , আর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আমাদের কথা শুনছে আর মজা নিচ্ছে৷ চরিত্রটাও বাঁধিয়ে রাখার মতো, ব্যাটা বেল্লিক , ছিঁচকে অশান্তিবাজ লোক ।

পায়ের জুতো খুলে ছুঁড়ে মেরে দিলাম মালটার জানালা লক্ষ্য করে ,মা- রে রে করে উঠল , জুতোটা ঠং করে ওদের জানলার গ্রিলে ধাক্কা খেয়ে আমাদের উঠোনে গিয়ে পড়ল ,তৎক্ষণাৎ চোখে পড়ল একটা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে । হয়তে সেটা মাত্র২ সেকেন্ড কিন্তু সেই দৃৃষ্টিতে ঘৃণা অবজ্ঞা আর পৈশাচিকতা যেন থিকথিক করছে যা আমার শিঁড়দাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে নিয়ে গেল ৷ কিছুক্ষণের জন্য মনে হল আমি হয়ত জ্বলন্ত সিগারেট হাতে কোনো মরা মানুষকে দেখলাম ।

এতদিন এত কান্ড করেছি, যখন ই রাগ সপ্তমে চড়েছে কারও উপর , তাকে আমার মনের মতো উপযুক্ত ব্যাবস্থাও করে দিয়েছি , কোনোদিন পরিনামের ভয় করিনি, কিন্তু আজ যেন কেমন বুক দুরু দুরু করতে লাগল ওই দৃষ্টিটা দেখে

৷মনে হল খুব চেনে চেনা এই মুখটা ,খুবই চেনা…কিন্তু কোথায় দেখেছি এমন বিভৎস দৃষ্টি?মনে করতে পারলাম না কিছুতেই ….
এদিকে ৩ ঘন্টা ধরে এত হাই ভল্যুমে গান শোনা অভ্যাস নেই তাই মাথাটা ধরে গেল , চোখ ফেটে জল আসছে । মা মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করল , কিন্তু আমার মাথায় তখন বার্নার জ্বলছে , জল রাখলেও ফুটে যাবে ৷ হারতে আমি শিখিনি কখনও, আর সেই ব্যাটা আমাকেও ঘোল খাইয়ে

ছাড়ছে? হঠাৎ লোডশেডিং, কলকাতায় থাকার জন্য লোডশেডিং বলে যে একটা জিনিস এখনও হয় সেটা ভুলে গিয়েছিলাম ৷তবে আমাদের তো ইনভার্টার আছে , সেটা কি তবে কাজ করছে না? মা মনে করিয়ে দিল গত বছর গরমে ঝড়ের সময় বাজ পড়ে ওটার পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়েছে , এখনও সাড়ানো হয়নি ৷ অগত্যা এই অন্ধকারে কিছু করার নেই বুঝলাম অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছি ৷

মা ফের ঠাকুর ঘরে চলে যেতেই শুনলাম সেই বাড়ির জালাটা ঘটাং করে খুলে গেল , আর প্রায় সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল সেই বিকট চিৎকারের সাথে বন্দিশের কথা …..উফ্ উফ্… মহা শয়তান ……মহা ধড়িবাজ এই লোক…. জানে যে আমি এখন আর চাইলেও মিউজিক সিস্টেম চালাতে পারব না তাই আমাকে শোনানোর জন্য সে সময়ের আগেই গান ধরে নিল । আমি হাত দিয়ে কান
চেপে ধরলাম , সে অন্ধকারেই গান গেয়েই চলেছে বিপুল বিক্রমে ৷

আমার মনে হল ছুটে গিয়ে উন্মত্ত বাঘের মতো ওই লোকটার উপরে ঝাপিয়ে পড়ি আর আমার ধারলো শান দেওয়া দাঁত আর নখের ফলায় ক্ষত বিক্ষত করি ওকে, ওর মরন দেখে লোকে শিউরে উঠুক । সাথে সাথেই মনে উদয় হল লোকটা কি রাগ সংগীত ছাড়া আর কিছুই গাইতে পারে না? কেন শাস্ত্রীয় সংগীত বাছল সে?..বুড়ো বয়সে গান যদি ভাল টাইম পাস হয় তাহলে শাস্ত্রীয় সংগীতের পেছন ছোটার কি দরকার? রবীন্দ্রনাথ এত হাজারে হাজারে গান লিখেছেন সেগুলো ট্রাই করো …নিদেন পক্ষে ..মমচিত্তে বা ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে বা দু একটা ছড়ার গান গাও….কিন্তু লোকের কানের উপর অত্যাচার কেন? আমরা মুখ, চোখ,নাক এমনকি শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলো না নেড়েচেড়ে থাকতে পারি ,সেই সব কিছুর উপরই আমাদের নিয়ন্ত্রন আছে ,কিন্তু কান?

কানের উপর আমাদের কোনো হাত নেই, তাই চাইলেও আমরা কানের উপর কোনো জোড় খাটাতে পারিনা যতক্ষন না আমরা সম্পূর্ণ সেন্সলেস হয়ে যাচ্ছি, আর সেই জঘন্য বুদ্ধিটাই লোকটা কাজে লাগিয়েছে আমাদের যন্ত্রনা দেবে বলে ৷ উফ ….ওই কুটিল চোখ যেন ভোলার নয় ৷ সাথে কিছু একটা যেন মিল পেলাম । কি মিল? কিসের সাথে মিল মনে করতে পারছি না কিছুতেই , কিছু মনে না পড়লে যেমন দম আটকানো কষ্ট হয় সেটা হচ্ছে আমার । মনে মনে ঠিক করলাম,কাল এর বিহিত করতেই হবে , ভেবেছিলাম ব্যাটাকে ভড়কে দেব , কিন্তু বড়সড় কিছু একটা না করলে মনে শান্তি আসবে না ৷

আন্ধকারে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবতে লাগলাম । ওদিকে গানের দাপট এই সুন্দর চাঁদের আলোমাখা রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে চুড়ে দিয়ে আকাশ ফাঁটিয়ে দিচ্ছে ,ফের যেন অসহ্যতার সীমানা আজই লঙ্ঘন করবে ৷ আমি মন দিয়ে গানটা শোনার চেষ্টা করছি …অসময়ে বেসুরো ভৈরবী ….কথা গুলোও যেন স্পস্ট নয় , কথায় কোনো ডিফেক্ট আছে মনে হল । এসব লোকেদের গান করার সখ ঘুচিয়ে দিতে হয় জন্মের মতো , তার পর তার এত বড় সাহস আমার মুখের সামনে দরজা খুলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে গান শোনাতে আসে .৷ এদিকে সায়রা ভিডিও কলিং করছে বার বার ৷ কিন্তু এখন এসব মুড নেই , এখন এই সেক্সি মেয়েটার নগ্ন বুক, পিঠ দেখার চেয়ে ওই গান নিয়ে আদিখ্যেতা করা অমানুষটার শেষ দৃশ্যটা দেখার জন্য আমি বেশি আগ্রহী । তার পর এসব ফুর্তি তো আছেই আমার জন্য ৷

আরো দুদিন কেটে গেল ৷ আমার নিজেকে বড় অসহায় লাগছে , বার বার মনে হচ্ছে হেরে গেলাম আমি , কিছু করতে পারলাম না…..কিচ্ছু না । চোখ ফুলে লাল , চুল উশখো খুশকো, মাথা টলছে সব সময়, বমি বমি পাচ্ছে কিছু খেতে গেলেই ,উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকু নেই , পরশু থেকে আজ অবধি দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি । ফাটা বাঁশের গানের তোড় এখন আকাশ ছোঁয়া , আমার নিজের গলা টিপে মেরে ফেলতে ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে ।কি কুক্ষণে ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম ….হে ভগবান , আমাকে তুমি বধির করে কেন জন্ম দিলে না…. তাহলে এই কুৎসিত চিৎকার রোজ শুনতে হত না ৷

বাবা মা কি কিছুই টের পাচ্ছে না…ওরা কি করে সহ্য করছেন আমি তো আর এক বিন্দু ও পারছি না ৷ নিজের ঘরে জড়বৎ পড়ে আছি ৷ মা নিজের হাতে খাবার খাইয়ে দেওয়ার পর ওষুধটাও খাইয়ে দিয়ে গেছে , ঘুমের ওষুধ ৷ দু দিন না ঘুমানোর জন্য শরীরে মনে হচ্ছে গরম প্রদাহ হচ্ছে , আর কি এক পূর্বের স্মৃতি তার মধ্যে তারা করে ফিরছে আমাকে , কিছুতেই মনে করতে পারলাম না কোথায় দেখেছি ওই জ্বলন্ত চোখ ৷ আর ওই ঠান্ডা চাহনি ..কেউ কি পুরোনো কোনো ঘটনার কথা আমাকে নিঃশব্দে বলতে চাইছে আমাকে? দুদিন আগে যে রাগ বিদ্বেষ ছিল এখন তাই শঙ্কায় পরিবর্তিত হয়েছে, তার কারণও আছে ৷

যেদিন রাতে আমি ওই দ্শ্য দেখলাম তার পরের দিন সকালে উঠতেই দেখি গলুর মা কাকিমা আমাদের বাড়ি এসে বলছেন গলু কাল রাত থেকে বাড়ি ফেরেনি ৷কারণ কেউ জানে না , সে কোথায় গেছে বলে যায় নি সর্বোপরি সে গেছে আমার সাথে ৷ আমি আকাশ থেকে পড়লাম , আমি????? কাল রাতে আমি গলুদের বাড়ি কেন ,রাস্তাতেই পা দিই নি ৷কাকিমা মানলেন না৷ তার বক্তব্য আমি নাকি বাইকে করে ওদের বাড়ির নীচে গিয়ে গলুর নাম ধরে ডাকি আর গলু সেই লোডশেডিং এর মাঝেই বেড়িয়ে আমার গাড়িতে চেপে বসে ও আমরা হাওয়া হয়ে যাই ৷ মা বললেন কাল রাতে আমি বাড়িই ছিলাম কোথাও বেড়ইনি , কাকিমা উল্টে আমাকে ঝাঁঝের সাথে চারটে বাজে কথা শুনিয়ে বাড়ি চলে গেল।

আমি বাড়িতে আসলে অবশ্য মোনালিসা বার কাম রেস্টুরেন্টে গিয়ে সমস্ত ম-কারান্ত জিনিসের যথোপযুক্ত সদ্ব্যবহার করি ,তবে বাইরে কখনও রাত কাটাই না , কিন্ত কাল তো আমরা সেরকম কিছুই করিনি ৷ মাথা আবার গরম হয়ে গেল, শানুকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গলুকে খুঁজতে ,ব্যাটার ফোন স্যুইচ অফ , সন্ধ্যে অবধি আমাদের পরিচিত আড্ডাস্থল আর বন্ধু বান্ধবের বাড়ি হানা দিয়ে
হয়রান হয়ে ,তাকে গরু খোঁজা খুঁজেও যখন পাওয়া গেল না তখন আমরা থানায় গিয়ে মিসিং ডায়েরি করলাম । থানার পুলিশ গুলো অবশ্য গলুর হুলিয়া দেখেই চিনে ফেলে ছিল , কারন রোজ ই কিছু না কিছু কমপ্লেন তার নামে জমা পড়ে ৷ রুলিং পার্টির সদস্য হওয়ায় সে ধরাকে সরা জ্ঞান করে, আজ কোনো মেয়েকে উত্যক্ত করে তো কাল কোনো দোকানে গিয়ে হল্লা করে দোকানির মাথা ফাটিয়ে দেয় , পরশু ফ্লেক্স লাগানো নিয়ে হুজুত্তি ,কিছু একটা লেগেই থাকে পুলিশের অভিমত এই শত্রুপক্ষ ই একত্রিত হয়ে শিশুচোর সন্দেহেতাকে গনধোলাই দিয়ে কোথাও ফেলে দিয়ে এসেছে , গনপ্রহার এখন পুলিশ ডিপার্টমেন্টের প্রধান চিন্তার বিষয় । আমরা দুজন বিষন্ন মনে থানা থেকে বেড়িয়ে বাড়ির পথ ধরলাম ৷

এদিকে গলুদের বাড়ি কান্নার রোল পড়েছে ৷আমার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকি মেরে লুকিয়ে পড়ছে ৷ সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম, শানু বলল গলুর সাথে সে নিয়মিত থাকে সে যে পার্টির একজন বেস্ট মেম্বার সেটা সবাই জানে আর আন্ডারগ্রাউন্ড হওয়ার মতো কোনো বড়সড় অপরাধ সে করেনি ৷বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম, নানা রকমের চিন্তায় আর বদহজমের জন্য বমি করে দিলাম, খেতে পারলাম না, এমন হেল্পলেস কখনও লাগেনি নিজেকে, বড্ড অসহায় বোধ হল । ঘরে ফিরে দেখি সেই মাঝরাতে জৈনপুরি চলছে আর হারমোনিয়ামের সুরের সাথে সেই বিকট হেড়ে গলার চিৎকার মিলেমিশে অসহ্যকরে তুলেছে আমার ঘরের বাতাস কে , শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল আমার ।

বাবা মা কে বললাম…. আজ তোমাদের ঘরে শোবো ,আমার ঘরে গানের আওয়াজে কান পাতা দায় ৷ মা বাবার মাঝখানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম , কেমন যেন একটা অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে আমাকে, কিছু একটা মনে না করার জ্বালায় সর্বাঙ্গ জ্বলছে আমার । কেন মরতে ছুটিতে বাড়ি এসেছিলাম ৷ সায়রাকে নিয়ে আউটিং এ চলে গেলেই ভাল হতো ৷কাল সকালেই কলকাতা ফিরব …ওই গান পাগল লোকটা যতদিন ওই বাড়ি থেকে বিদায় হচ্ছে ততদিন আর বাড়ি মুখো নয় ৷ সারা রাত এই সব ভাবতে ভাবতে ভোরেরে দিকে একটা তন্দ্রা মতো এসেছিল হঠাৎ মায়ের চিৎকারে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম ৷ সব শুনে আমার বুকের ওঠানামা বন্ধ হয়ে গেল , শানুও কাল রাত থেকে বেপাত্তা ৷ আর আশ্চর্যের বিষয় কাল সে আমার ডাকেই বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিল ।

আবার গলুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ৷ আমার হাত পা আড়ষ্ঠ হয়েএল ৷ এবার? এবার কি হবে?’সবাই তো আমাকেই কালপ্রিট ভাববে , যা বলব না কেন কেউ ই আমাদের তিনজনের কথা বিশ্বাস করবে না কারন মনি পিসি স্পষ্ট দেখেছিল আমি বাইকে বসে আছি আর শানু বাইকে উঠে গেল , আমার মাথায় অবশ্য হেলমেট ছিল তাই সে আমার মুখ দেখেনি । সারা দিন আমি আবার শানুকে খুঁজে বেড়ালাম, কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছিল ওদের আমি পাব না , এমনকি মনের গভীর থেকে কেউ যেন বলছে আমার দুই বাল্যবন্ধু আর ইহজগতেই নেই ৷ কোনো এক অমোঘ জাদু মন্ত্রবলে তারা ভ্যানিশ হয়ে গেছে…উবে গেছে…একদম হাওয়া হয়ে গেছে , কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না , বললে সবাই মনে করবে আমিই তাদের সেই অজ্ঞাত শত্রু। কিন্তু আমি জানি ওদের থেকে প্রিয় বন্ধু আমার আর কেউ ই নেই , আমার সমস্ত কুকর্মের সাথী ওরা , ওদের আমি গুম করে দেব? টলতে টলতে বাড়ি ফিরলাম আগের দিনের মতো , গায়ের সব শক্তি কে যেন নিংড়ে নিচ্ছে প্রতি ক্ষনে , বারবার কেন শুধু মনে হচ্ছে ওরা গেল এবার আমার পালা ৷

কবে কি অন্যায়ের শাস্তি পাচ্ছি আমি কিছুতেই মনে করতে পারলাম না ৷ এখন মনে করার মতো মানসিক বা শারীরিক শক্তি ও নেই আমার , সেই থেকে শুয়ে আছি , অস্বস্তি হচ্ছে তবু শুয়ে আছি ,মনে হচ্ছে আজ না ঘুমালে যেন বাঁচব না , পায়ের নীচে মনে হচ্ছে আগুন জ্বলছে ..কেন কেন এমন হচ্ছে আমার সাথে ?

ঘুমিয়ে পড়েছি কখন খেয়াল নেই , হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশন হল, দেখলাম ফেসবুকে একটা ছবির ডেট অ্যানিভার্সারি পালিত হচ্ছে যে ছবিতে আবির নিয়ে দাঁড়িয়ে আমি, গলু আর শানু ,তিন জনেই উপস্থিত আর ছবিটা আমাদের ৩বছর আগের বছরের বসন্ত উৎসবে কালচারাল ফাংশনে র সময় । ৩ বছর আগে এই আজকের দিনেই বসন্ত উৎসব পালিত করেছিলাম আমরা বাসন্তি ক্লাবের ছেলেরা। ছবিটা দেখে আমার খেয়াল হল ওরা কোনো কারনে বাসন্তি ক্লাবের এই বিল্ডিং এ লুকিয়ে বসে নেই তো? আমি বিছানা থেকে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম , বেড়োতে হবে আমাকে এখনি , আস্তে করে গেট খুলে বাইরে এলাম ৷

বাইরে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, ঢং করে একটার ঘন্টা বাজল আমাদের দেওয়াল ঘড়িটাতে…এতক্ষন খেয়াল করিনি টিপটিপয়ে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে…সারাদিন ই মেঘলা ছিল ৷ আমাকে যেতে হবে এখনই I আমি জানি ওরা কোথায় আছে ..কে ওদের আটকে রেখেছে ৷ উঠোনে এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ শুনতে পেলাম দারুন সুন্দর মেয়েলি গলায় মালকোশ রাগ …আহা কি সুর …কি ছন্দ… কি বন্দিশ….আমি স্থির হয়ে গেলাম ..মালকোশ শেষ হতে শুরু হল উৎকৃষ্ট মীরার ভজন…মীরাকে কে প্রভু গিরিধর নাগর…উফ্ কি সেক্সি গলা …সব কষ্ট, বন্ধু বেদনা একই নিমেশে ভুলিয়ে দিল মেয়েটা , এটা কি ওই গান পাগল লোকটার মেয়ে না বউ, আর এই রাগ গুলোর জন্য এতো পারফেক্ট টাইমিং ৷ গলাটা যেন শ্রেয়া ঘোষাল ,কৌশিকি দেশিকান কেও হার মানায় , এত দিন ওই আনতাবড়ি গান না গেয়ে এই মেয়েটাকে দিয়ে গান গাওয়ালেই তো পারতিস শালা হারামি … কাল সকাল অবধি আর অপেক্ষা করা যাবে না ৷

বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ছুটে পালালাম তাকে দেখার জন্য ৷ শব্দ টা কোন দিক দিয়ে আসছে শুনে মেয়েটাকে দেখার জন্য ছুটতে লাগলাম , গানটা কানে বেজেই চলল , অন্ধকারে কোথায় ছুটছি খেয়াল নেই , এটা কোন জায়গা? আবার কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে শুনলাম …উফ্ এবার বসন্তবাহার চলছে… কি উচ্চাঙ্গসংগীতের উপর দখল ৷ গুম গুম করে মেঘ গর্জন শোনা যাচ্ছে হঠাৎ করে , এবারই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে ৷ মোবাইলটাও ভুল করে বাড়িতে ফেলে এলাম , ইস্ অন্ধকারের কিছুই দেখতে পারছি না ৷

ওই লোকটার বাড়ি কি এটা? শব্দটা আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে ,জানি অন্ধকারে অনেক দুর চলে গেলেও আলো আসলে বোঝা যায় বেশি দূর যায় নি ৷ আমি চিৎকার করে কাকে যেন ডাকতে গেলাম কিন্তু একি গলা দিয়ে যেন আওয়াজ ই বেরচ্ছে না , শুধু সেই সুরের অভূতপূর্ব মূর্ছনায় আমি যেন বিহ্বল হয়ে ছুটে যাচ্ছি সেদিকে , এই সময়ে আমার তার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পিছুটান থাকতেই পারে না । ঠান্ডায় কাপঁছি কিন্তু তবুও ছুটে চলেছি, চাইলেও থামতে পারছি না ৷

হঠাৎ সামনে একটা আলো দেখে এগিয়ে গেলাম , একি এটা তো আমাদের বাসন্তি ক্লাবের পুরোনো বিল্ডিং এর নীল রঙের দরজাটা , টিমটিমে একটা বাল্ব জ্বলছে দরজার উপরে ৷
এর ভিতর ঢুকবো? কিন্ত কেন এলাম এখানে? প্রবল আক্রোশে দরজা খুলে ফেললাম , তালা দেওয়া নেই দেখে ভিতরে ঢুকে পড়লাম । হঠাৎ তখনই সব নিশ্চুপ, গান থেমে গেছে, কোথাও কোনো আয়াজ নেই , এমনকি মেঘ ও ডাকছে না , বৃষ্টিটাও থেমে গেছে ।

বাদিকে পুরোনো লাইব্রেরি ঘরটাতে ঢুকে পড়লাম , কিন্তু সামনে কে যেন দাঁড়িয়ে ? শাড়ি পড়ে? কে ওটা ? খুব চেনা লাগছে ওকে ! আস্তে আস্তে শাড়ি পড়া মূর্তি পিছনে ঘুরতে থাকে ৷ প্রিয়াঙ্কী???? ভূত দেখার মতো চমকে উঠি আমি। সাথে সাথে মনে পড়ে গেল সব ৷

প্রিয়াঙ্কীরা আমাদের পাড়ায় বছর খানেকের জন্য এসেছিল ভাড়া থাকবে বলে ওর বাবা থাকত না ওদের সাথে , ও থাকত ওর মায়ের সাথে । ইনোসেন্ট ছোটখাটো চেহারার মেয়েটার মুখে মায়াবী একটা ভাব ছিল , কিন্তু ব্যাক্তিত্ব ছিল তারিফ করার মতো, আমরা তখন ভাবতাম
হেব্বি ঘ্যাম মেয়েটার ৷ ইলেভেনে এসে আমাদের কিরনবালা গার্লসে ভর্তি

হয়েছিল, কিন্তু ছোট হলেও আমাদের পাত্তাই দিতনা ৷ আর গানের গলা ছিল অপূর্ব, সাবজেক্ট ছিল শাস্ত্রীয় সংগীত , তাই নতুন হলেও ওকে আমাদের বসন্ত উৎসবে গান গাওয়ার জন্য আমরা বলতে গেছিলাম ওদের বাড়ি ৷ কিন্তু ওর মা স্পষ্ট মুখের উপর বললেন যে ও কোনো ওপেন ফাংশানে গান করে না, কারন ওর গুরুজির বারন আছে , অনেক বোঝানোর পর ও মা মেয়ের সেই এক গোঁ, কিছুতেই গাইবে না , হঠাৎ কি মনে হওয়ায় আমি টাকা অফার করি , ওই কারনের জন্য কিনা জানি না মেয়েটা আমার গালে এসে সজোড়ে একটা চড় কষিয়ে দিয়েছিল ৷

অন্যরা মেনে নিলেও আমার পক্ষে হজম করা কঠিন ছিল, মাথায় রক্ত উঠে গেল । আমার পাল্লায় পড়ে আমার দুই স্যাঙাত্ আমার প্ল্যানে রাজি হয়ে গেল, আমি ছিলাম ওদের অলিখিত বস্ , এছাড়াও এমন সুবর্ন সুযোগ ওরা হারাতে চায়নি । ফল যা হল , বসন্ত উৎসবের দিন অনুষ্ঠান চলাকালিন আমরা ওকে টিউশনে যাওয়ার পথে মুখ বেধে শানুর ভড়া করা গাড়িতে তুললাম , সোজা নিয়ে এলাম আমাদের এই পুরোনো ক্লাব বিল্ডিং এ। কেউ জানতে ও পারল না , আমরা ওকে এই লাইব্রেরী রুমেই নিয়ে এসে ,কাপড় দিয়ে তার মুখ বেধে চড়ে পড়েছিলাম ওই নরম শরীরটার উপর, দাঁত দিয়ে ছিন্নভিন্ন করছিলাম ওর প্রত্যেকটা যত্ন করে সাজিয়ে রাখা নিটোল অঙ্গ গুলো….মনে আছে হালকা একটা শিকাকাই তেলের গন্ধ ও যেন ভেসে আসছিল নাকে , কিন্তু শুরুটা আমিই করেছিলাম …অামিই, কারন চড়টা ও আমাকেই মেরেছিল …..সায়ন বোস কে চড় মারার হিসাব নিতেই হতো ৷ মেয়েটা প্রথম থেকেই খুব লড়ছিল কিন্তু আমার ডাম্বেল ভাজা হাতের কাছে তার সেই ছোটো ছোটো হাত পাত্তা পেল না ৷

মেয়েটা নিস্তজ হয়ে পড়ছিল ক্রমশ, ভয় পেয়ে শানু আর গলু কমের উপর দিয়ে মেটালো ৷ আমি ছাড়তে চাইছিলাম না , রাক্ষসের মতো ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতাম যদি শানরা না আটকাতো , ওই বয়সে কোথা থেকে একটা পিশাচ এসে শরীরে মনে ভর করেছিল ভাবতে অবাক লাগছে । কিছুক্ষন সেন্সলেস ছিল মেয়েটা, জ্ঞান আসতে বলেদিলাম যদি মুখ খোলে তাহলে ওর রেপ্ড ভিডিও টা করা আছে , ফেসবুকে ছেড়ে দেব ৷

মেয়েটাকে গাড়ি করে বাড়ির সামনে ছেড়ে দিয়ে সোজা দীঘা মন্দারমনি ট্যুরে চলে গেছিলাম ৷পাঁচ দিন পর ফিরে শুনেছিলাম সেদিনই রাতে প্রিয়াঙ্কী গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে , আর সেই শোক সামলাতে না পেরে তার মা গায়ে আগুন লাগিয়ে ঘরের মধ্যেই মারা যায় ৷ ওরা দুজন একটু ভয় পেলেও আমি ভাবলাম গেছে আপদ গেছে ৷ ঘমন্ডি লোকেদের এখানে থাকার কোনো দরকার নেই ,দেমাক দেখিয়েছিল যেমন !

বাঁচা গেছে ওরা সব প্রমান লোপাট করেই মরেছে ৷ বিন্দু মাত্র দুঃখ বা সহানুভূতি আসেনি প্রানে , তারপর Msc শেষ করে P.hd শুরু করতেই কলকাতা শিফট করলাম , এদিকটা প্রায় ভুলেই গেছিলাম ৷ আজ হঠাৎ ও কোথা থেকে এল? ও কি তবে মরেনি ?বেঁচে ছিল? এখন রিভেঞ্জ নিতে এল?আমাকে কি ও মেরে ফেলবে ? শাড়ি পড়েছে কেন? ও হ্যাঁ..মা বলেছিল মেয়েটা নাকি সুন্দর করে শাড়ি পরে সেজে গুঁজে গলায় দড়ি দিয়েছিল ,তখন ভেবেছিলাম মেয়েরা কত ঢঙ্ দেখাতে পারে , মরছে তাও নাকি সেজে গুজে !!!! কিন্তু এখন ওকে দেখে আমার ভয় করছে প্রচন্ড , আমার পা দুটো কেউ যেন মাটিতে পেরেক ঠুকে পুঁতে দিয়েছে, আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম, কিন্তু মাটিতে পড়ে গেলাম ৷

ও এগিয়ে এসে আমার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ল , ওর গরম নিঃশ্বাস আমার মুখের উপর পড়ল, ড্রাগনের নাক দিয়ে গরম নিঃশ্বাস ছাড়ার মতো গরম ধোঁয়া যেন আমাকে পুরিয়ে ছাড়খার় করে দেবে ৷আমার কিচ্ছু করার নেই । আমার হাত যেন কে বেঁধে দিয়েছে শক্তকরে ৷ দেখলাম সেই ভাটার মত চোখ আমার দিকে জলন্ত দৃষ্টি দিয়ে আমাকে বিদ্ধ করছে …সেই লোকটার মতো চোখ …তাহলে কি আমাকে এতদিন গান গেয়ে যন্ত্রনা দিয়েছে সে প্রিয়াঙ্কীর বাবা ?… হ্যাঁ তাইতো …আমার মনে পড়ল ওদের বাড়ি গিয়ে ওই লোকটার ছবি দেখেছিলাম।ধোঁয়ার মতো দেখলাম তার সেই মসৃন হাতের আঙুল গুলি কখন যেন লোহার শিকলের মতো আমার গলায় ধীরে ধীরে চেপে বসেছে ৷

চাপ দিচ্ছে , ক্রমশ বাড়ছে সেই চাপ , আরও…. আরও জোড়ে চেপে বসছে সেই শিকল রূপী হাতের আঙুল গুলো , আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে , চোখ ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চাইছে ৷ আমার মুখে তার সেই খোলা চুল যেন আরও নিকষ অন্ধকার ডেকে নিয়ে আসছে আমার চোখে ….আমি নিস্তেজ হতে হতে আরও একটা জিনিস শুনলাম ৷আমার নিজের গলাতেই শুলনাম ,স্পষ্ট আমার ই গলাতে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে ৷

সেই গলা আমারই
কিন্তু আমার গলা দিয়ে তো আওয়াজ ই বেরচ্ছে না…তবে? কে আমার গলা নকল করছে? ওই লোকটা ….হ্যাঁ ওই তো ওই লোকটা ….আমার চোখ ফেটে যাচ্ছে সেই সাঁড়াশি চাপে….আমি বুঝতে পারছি ওরা আমাকে মেরে ফেলতে এসেছে …..আমাকে মেরে ফেলবে ওই সুন্দর ,ইনোসেন্ট ছোটো মেয়েটা …আর ওর বাবা আমাকে মারার জন্য এসেছিল…আমার হাত অবশ হয়ে আসছে….আমার মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে…আমি আর লড়তে পারছি না… এই তবে রিভেঞ্জ!!….আমার চোখ দুটো ঠিকরে বেড়োতে চাইছে…পা ঠান্ডায় জমে গেছে ….হাতটা ধীরে নামতে লাগল…আরও ধীরে ….একসময় সে মাটি ছুঁল…

পরের দিন খবরের কাগজের একটি ছোট্ট কলামে প্রকাশিত একটা খবর…

দুই নিখোঁজ যুবকের মৃতদেহ পাওয়া যায় পরিত্যাক্ত এক ক্লাব বাড়ির ভিতর,যারা মদ্যপ অবস্থায় মারা যান বলে প্রাথমিক ধারনা পুলিশের ,তারা পরস্পর বাল্যবন্ধু ছিলেন ৷ আশ্চর্যজনক ভাবে তৃতীয় বন্ধুও মারা যান তার নিজের বাড়িতে খুব সম্ভবত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘুমের মধ্যেই । কারন এখনও জানতে পারেনি পুলিশ, তিন যুবকের মৃত্যুতে শোকাহত মৃতদের পরিবার । সন্দেহ জনক এক ব্যাক্তির লাশ উদ্ধার হয় ওই পাড়ারই এক ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে ৷ আর তার বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় সংগীতের বিভিন্ন যন্ত্র ও একটি বাইক , মৃতের নাম পিযুষ রায় , পেশা রিটায়ার্ড ব্যাঙ্ক কর্মী, তিনি বিখ্যাত হরবোলা প্রসিদ্ধ ছিলেন , পশুপাখির ডাকের সাথে তিনি মানুষের ডাক ও নকল করতে পারতেন বলে জানা যায় । তার ছোট ভাইকে পুলিশ জেরা করছে এই তিনটি খুনের সাথে তার কোনো যোগাযোগ আছে কিনা , যিনি পেশায় তবলা বাদক৷

আর্ট- মোহিনী বিশ্বাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.