‘‘মমতাজি, আপনার লজ্জা হওয়া উচিত!’’ আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ড নিয়ে মমতাকে তোপ শাহের

0
29

উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরে বিজেপির কর্মী সম্মেলনের মঞ্চ থেকে রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু নয়, প্রশাসক মমতাকেও কাঠগড়ায় তুললেন অমিত শাহ। শনিবার রাজ্য সফরে আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ড নিয়ে আক্রমণের সুর তুঙ্গে তুলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ।

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে আনন্দপুরে ডেকরেটরের গুদামে এবং ‘ওয়াও মোমো’ কারখানার গুদামে যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, তাতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন শাহ। প্রশ্ন তুলেছেন, কার সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠতার’ কারণে ওই মোমো কারখানা তথা গুদামের মালিক এখনও গ্রেফতার হননি? শাহের তোপ, ‘‘মমতাজি, আপনার লজ্জা হওয়া উচিত!’’

মমতার উদ্দেশে শাহের প্রশ্ন, ‘‘আমি মমতাজিকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, এই ঘটনা যদি অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ঘটত, তা হলেও আপনার প্রতিক্রিয়া কি এ রকমই হত?’’ শাহের তোপ, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে! এতেও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করছেন! আপনার লজ্জা হওয়া উচিত!’’

অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিশদে খোঁজখবর নিয়েই যে তিনি মুখ খুলেছেন, তা শাহের ভাষণে স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘‘অগ্নিকাণ্ডের ৩২ ঘণ্টা পরে কোনও এক মন্ত্রী সেখানে গেলেন। পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র ছিল না। জলাভূমিতে গুদাম তৈরি করা হয়েছে। গুদামের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল? নাকি খোলা ছিল? যদি বন্ধ থেকে থাকে, তা হলে কেন?’’ শাহের কথায়, ‘‘ভিতরে মানুষ পুড়তে থাকলেন, চিৎকার করতে থাকলেন, কিন্তু বাইরে আসতে পারলেন না।’’ এর পরেই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘‘আমি মমতাজিকে বলতে চাই, ধামাচাপা দিতে চাইলে দিন! কিন্তু এপ্রিলের পরে বিজেপি সরকার আসবে আর এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী, তাদের খুঁজে খুঁজে জেলে পাঠানো হবে।’’ পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসন শেষ হয়ে গিয়েছে বলেও শাহ মন্তব্য করেছেন।

ব্যারাকপুরে শাহের কর্মসূচি মিটতেই পাল্টা আক্রমণে নামে তৃণমূল। দলের সমাজমাধ্যমে লেখা হয়, ‘‘গুজরাতে ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার চলছে। রাজ্যে বিজেপি। কেন্দ্রে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়েই গুজরাতের। এবং তার পরেও সেতু ভেঙে পড়া এবং পরিকাঠামোগত বিপর্যয় রুটিন হয়ে উঠেছে, যাতে শ’য়ে শ’য়ে নিরীহ প্রাণ যাচ্ছে। এখন সেই অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। সম্ভবত তিনি ব্যাখ্যা দিতে পারবেন যে, গুজরাতের ওই সব বিপর্যয়ের নেপথ্যে ঈশ্বরের হাত রয়েছে নাকি জালিয়াতি রয়েছে।’’

শাহ ব্যারাকপুরের কর্মী সম্মেলনে নিজের ভাষণ শুরুই করেন আনন্দপুরের ঘটনায় ‘মৃত শ্রমিকদের’ প্রতি ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ জানিয়ে। আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড কোনও ‘দুর্ঘটনা’ নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ‘দুর্নীতির ফল’ বলে তখনই মন্তব্য করেন তিনি। প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েও কিছু পরেই ফিরে আসেন আনন্দপুর প্রসঙ্গে। গত কয়েক দিন ধরে দফায় দফায় সাংবাদিক বৈঠক, বিক্ষোভ, ভাষণ ইত্যাদির মাধ্যমে শমীক ভট্টাচার্য-শুভেন্দু অধিকারীরা আনন্দপুর কাণ্ড নিয়ে দলের স্বর যেখানে তুলেছিলেন, এক ধাক্কায় শাহ তাকে আরও কয়েক পর্দা উপরে তুলে দিয়েছেন।

গত বছর ডিসেম্বরে যখন অমিত শাহ  বঙ্গ সফরে এসেছিলেন, তখনই নেতা-কর্মীদের পেপটক দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে কী ভাবে তিনটি বিধানসভা আসন থেকে ৭৭টিতে এবং দু’টি লোকসভা আসন থেকে ১৮টিতে উঠে এসেছিল বিজেপি। শনিবার ব্যারাকপুরের কর্মী সম্মেলন থেকেও তিনি জানিয়ে দিলেন, “এ বার ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে লাফ দেবে বিজেপি।”

এদিনের সভার মেজাজ ছিল একেবারে নির্বাচনী ভাষণের চেনা মোড়ক। এদিন শাহ রাজ্যের অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের  সরকারকে নিশানা করে গেলেন আগাগোড়া।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে রাজ্যে দুর্নীতিকে কার্যত ‘প্রতিষ্ঠান’ করে ফেলা হয়েছে—এই অভিযোগ তুলে শনিবার ফের তীব্র আক্রমণ শানালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এসএসসি, পুরসভা নিয়োগ, গরু পাচার, একশো দিনের কাজ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, “হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু মমতাজির চোখে কিছুই পড়ে না।”

শাহের কটাক্ষ, ভাইপোকে মুখ্যমন্ত্রী করার লক্ষ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর “চোখে ঠুলি পড়েছে”। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “বাংলার মানুষ সেই ছানি কাটার অস্ত্রোপচার করে দেবে। তখন সব স্পষ্ট দেখা যাবে।”

এ বার বাংলায় বিজেপি সরকার গড়া শুধু রাজ্যের প্রয়োজন নয়, গোটা দেশের নিরাপত্তার জন্যও জরুরি— এমন দাবিও করেন শাহ। তাঁর বক্তব্য, যেভাবে অনুপ্রবেশ হচ্ছে, তাতে জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনুপ্রবেশ রুখতে কেন্দ্রের উদ্যোগের পথে রাজ্য সরকারই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টা জবাবে অমিত শাহ বলেন, “মমতাদি বলেন, কেন্দ্র কী করেছে? আমি সংসদে স্পষ্ট বলেছিলাম, সীমান্তে ফেন্সিংয়ের জন্য জায়গা দিচ্ছে না রাজ্য সরকার। তাই সীমানা দেওয়া যাচ্ছে না।” তাঁর আরও অভিযোগ, নদী-নালা দিয়ে যে অনুপ্রবেশ হচ্ছে, রাজ্য পুলিশ তা আটকাচ্ছে না। বরং জাল নথি বানিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদেরা সংসদে তাঁর এই বক্তব্যের বিরোধিতাও করেছেন বলে জানান শাহ।
এই প্রসঙ্গে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের কথাও তুলে ধরেন। শাহের দাবি, আদালত জানিয়েছে, অনুপ্রবেশ রুখতে রাজ্য সরকার সচেষ্ট নয় এবং সীমান্তে জমি দিতে নির্দেশ দিয়েছে। “এটা সরকারের জন্য বড় ধাক্কা,” মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তবু জমি দেওয়া হচ্ছে না, কারণ অনুপ্রবেশকারীরাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক।

বক্তৃতার শেষ পর্বে রাজনৈতিক পরিহাসের জবাবও দেন অমিত শাহ। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে কটাক্ষ করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রামসেতু তৈরির সময় রাবণও পরিহাস করেছিল— ভেবেছিল তাকে কেউ হারাতে পারবে না।” পরিসংখ্যান তুলে ধরে শাহ জানান, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যে ৩৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল ৭৭, এবং শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা। তাঁর দাবি, “এ বার বিজেপির ভোট ৩৮ শতাংশ থেকে লাফ দিয়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছবে।”

Previous articleশিয়ালদা শাখায় নতুন ৪ রেলরুটের ঘোষণা ,তালিকায় রয়েছে চাঁদাবাজার ,বাগদা! রইল বিস্তারিত
Next article‘নায়ক’ সিনেমার পোশাক , মহানায়কের কাটআউট-এর সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ বইমেলায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here