

কলকাতা : পাশাপাশি এই প্রদর্শনীতে রয়েছে লুপ্তপ্রায় বায়োস্কোপ , প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো হারিয়ে যাওয়া কাঠের ক্যামেরা , ‘হীরক রাজার দেশে়’ ছবিতে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রও বইমেলায় বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে৷

কলকাতা বইমেলা এখন আর শুধু বইয়ের মেলা নয় এ মেলায় এখন নতুন প্রজন্মদের জন্য হারিয়ে যাওয়া জিনিস তাকেও আবিষ্কার করার এবং তার স্বাদ গ্রহণ করার জন্য সুযোগ রয়েছে। বই তো পাওয়া যায় সারা বছর, কিন্তু এমন কিছু অমূল্য জিনিস এবছর বইমেলায় হাজির যাদের এক সঙ্গে পাওয়া খুবই দুষ্কর।যেমন ধরুন প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো হারিয়ে যাওয়া কাঠের ক্যামেরা যা আজও আপনার ছবি তুলে দিচ্ছে ।

আবার লুপ্তপ্রায় সেই বায়োস্কোপ যাতে চোখ রেখে পাড়ি দিতে পারেন আপনার হারিয়ে যাওয়া শৈশবে কিম্বা ভিন্টেজ আট মিলিমিটার প্রোজেক্টের দিয়ে চার্লি চ্যাপলিনের সেই নির্বাক ছবি দেখছেন।

অন্যদিকে বাংলার মহানায়ক ৷ প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপামর বাঙালি তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব আর স্টাইলের প্রেমে পড়েছে । উত্তম কুমারের নাম উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভিন্ন সিনেমায় তাঁর পোশাকের কথা৷ বিশেষ করে ধূসর কোট আর প্যান্ট, ‘নায়ক’ ছবিতে রেলযাত্রার সময় তাঁর সেই লুক আজও বাঙালির স্মৃতিতে অমলিন । এত বছর পরেও মহানায়কের সেই রূপ ভুলতে পারেননি দর্শক । আর ঠিক সেই পোশাককে আরও একবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ।

করুণাময়ী চত্বরে বইমেলা প্রাঙ্গণে ছোট-বড় নানা প্রকাশকের স্টল ঘিরে জমেছে ভিড় । তবে সেই ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে নজর কাড়ছে একটি বিশেষ প্রদর্শনী। একে শুধুই স্টল বলা চলে না, বরং এটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসকে তুলে ধরা এক স্মরণীয় প্রদর্শশালা । বাংলা সিনেমার ১০০ বছরের বেশি এবং মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েই ( E 87)স্টলে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে ।

কোথায় এই প্রদর্শশালা ?
সেন্ট্রাল পার্ক বা বইমেলা প্রাঙ্গণের এক নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই লোকভবন স্টলের ঠিক বিপরীতে চোখে পড়বে এই প্রদর্শনী । প্রদর্শশালায় ঢুকলেই দর্শকদের সামনে খুলে যাচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে উত্তম কুমারের ‘শঙ্খবেলা’ ছবির শুটিং ফ্লোরের আদলে সাজানো অংশটি । রয়েছে মহানায়কের কাটআউট, যার সঙ্গে বিনামূল্যে ছবি তোলার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শকরা ।

‘নায়ক’ সিনেমায় উত্তম কুমারের চরিত্রের নাম ছিল অরিন্দম মুখোপাধ্যায় ৷ ওই সিনেমায় জাতীয় পুরস্কার গ্রহণের জন্য কলকাতা থেকে দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের তৎকালীন ম্যাটিনি আইডল । বিমানের টিকিট না পাওয়ায় সেই দীর্ঘ যাত্রাপথ তিনি অতিক্রম করেছিলেন রেলপথে । তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন সাংবাদিক (শর্মিলা ঠাকুর)-সহ আরও অনেকে । আজ সেই ঘটনার প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গিয়েছে । তবুও অরিন্দম মুখোপাধ্যায় অর্থাৎ মহানায়ক উত্তম কুমার আজও বাঙালির স্মৃতিতে সমান উজ্জ্বল । সেই সব স্মৃতি আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়ার অবকাশও রয়েছে এই প্রদর্শশালাতে ৷

এই গোটা প্রদর্শনীর ভাবনায় রয়েছেন কিউরেটর জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য । আর বইমেলার ভিড় সামলে প্রদর্শনী পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন দেবলীনা ঘোষ । “এই প্রদর্শনীতে বহু দুর্লভ ও আকর্ষণীয় সামগ্রী রাখা হয়েছে । মহানায়কের বাড়ি থেকে আনা হয়েছে ‘নায়ক’ সিনেমায় ব্যবহৃত সেই বিখ্যাত কোট ও প্যান্ট, যা তাঁর পুত্রবধূর সৌজন্যে পাওয়া গিয়েছে এটি । এছাড়াও ‘কলকাতার কতকথা’র সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে ‘হীরক রাজার দেশে়’ ছবিতে অভিনেতা রবীন মজুমদার ‘কতই রঙ্গ দেখিয়ে দুনিয়ায়’ গানটির সময় ব্যবহার করা দোতারা’টি । এমনকি সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘শতরঞ্জ কী খিলাড়ি’ ছবিতে ব্যবহৃত পানের ডাবরও স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে ।”

প্রদর্শশালার বাইরেও রয়েছে একাধিক বিশেষ আকর্ষণ । সেখানে দর্শকদের ভিড় লেগেই থাকছে একটি পুরনো ক্যামেরাকে ঘিরে । প্রায় 60-70 বছর আগে ব্যবহৃত এই ক্যামেরার নাম Twin Reflex । এই ক্যামেরার মাধ্যমে দর্শকরা 100 টাকার বিনিময়ে সত্যজিৎ রায়ের তৈরি ফেলুদা অর্থাৎ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পাচ্ছেন । শুধু তাই নয়, সেই ছবিই ছাপা হয়ে যাচ্ছে তৎকালীন খবরের কাগজের প্রথম পাতার আদলে । পাশাপাশি রয়েছে গ্রামোফোন ও বায়োস্কোপ । 8 এমএম প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে পুরনো রিলের সিনেমা ।

এই প্রদর্শনীকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই ৷ প্রতিদিনই রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে ভিড় জমাচ্ছেন দর্শকরা ৷ বনগাঁ থেকে এসেছেন পর্ণা সেনগুপ্ত ৷ তিনি বলেন, “আমরা জেন জি বলতে পারেন । এখানে আমরা সেকেলের জিনিস একালে পেয়েছি । এগুলো দেখে মনে হচ্ছে আমার অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছি । এটা একটা নস্টালজিয়া । আমাদের এতটা পথ কেমন ছিল সম চোখের সামনে চলে আসছে । পুরো বিষয়টাই আমার খুব ভালো লাগলো ।”

সব মিলিয়ে ৪৯ তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় এই প্রদর্শনী যেন শুধুই স্মৃতিচারণ নয়, বরং বাংলা সিনেমার গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে এক আবেগঘন পুনর্মিলন ।



