

জগন্নাথের রথের দড়িতে টান পড়লেই বাঙালির শুরু হয়ে যায় পুজোর প্রস্তুতি; কারণ রথের দিন দুর্গার কাঠামো পুজো দিয়েই শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজো। আর পুজো মানেই ঘোরা, দেদার খাওয়া দাওয়া, বেড়ানো। অনেকেই পুজোর কটা দিন শহরের ভিড় এড়িয়ে চলে যেতে চান প্রকৃতির কোলে নির্জনতায়। কাছেপিঠের মধ্যে যেতে হলে হাতের কাছেই রয়েছে সুন্দরবন। তাই এবার পুজোয় কয়েকদিনের জন্য ঘুরে আসা যেতেই দক্ষিণরায়ের ডেরায়।

পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ব-দ্বীপ এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হল এই সুন্দরবন। ইউনেস্কো এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে। দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে তাই দক্ষিণবঙ্গের এই পর্যটন স্থানটি বেশ জনপ্রিয়। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবথেকে বড় প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ছোট বড় দ্বীপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। যেখানে গঙ্গার বিভিন্ন নদী উপনদী শাখা নদী এখানে একসঙ্গে মিলিত হয়ে সাগরে পড়েছে।

জলপথে লঞ্চ, যাত্রীবাহী নৌকাই এখানকার মানুষের একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। তবে টুরিস্টের জন্য রয়েছে বিশেষ ধরণের লঞ্চের ব্যবস্থা। এই লঞ্চে করেই বিভিন্ন দ্বীপে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। আর লঞ্চের এই যাত্রাপথটিও বেশ মনোরম। খোলা আকাশের নীচে লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁজে পাবেন প্রকৃতির ক্যানভাসে। মাথার উপর পরতে পরতে সাজানো মেঘের ভেলা, দুপাশে ঘন সবুজে ঘেরা ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। দেখুন ভিডিও

গঙ্গার বুক চিরে লঞ্চ এগিয়ে চলে তার গন্তব্যের দিকে। নদীর এই যাত্রাপথে আপনার কখনও চোখে পড়বে নদীর ঘাটে নৌকার অপেক্ষায় মানুষের ভিড়। কোথাও জেলে নৌকা জঙ্গলের পাড়ে বাঁধা। এক হাঁটু জলে নেমে জেলেরা নদীতে জাল ছুঁড়ে মাছ ধরতে ব্যাস্ত; আবার কোথাও নৌকার ভিতরেই চলছে দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি। নদী কখনও চওড়া আবার কখনও হঠাৎ বাঁক নিয়ে সরু খাঁড়িতে প্রবেশ করেছে। লঞ্চের এই যাত্রাপথে বাইনোকুলারে চোখ রাখলে দেখা মিলতেই পারে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, হরিণ, কুমীর কপাল ভালো থাকলে দেখা মিলতেই পারে দক্ষিনরায়ের। তবে বাঘের ডেরাগুলি মূলত জাল দিয়ে ঘেরা থাকে।

অনেক সময়ে লঞ্চের মধ্যেই থাকে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা। সেইক্ষেত্রে প্রকৃতির এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে করতেই হয়ে যায় একপ্রকার ভুরিভোজ। তবে এই লঞ্চেই সুন্দরবনের অ্যাডভেঞ্চার শেষ নয়।

এখানকার বেশকিছু দ্বীপে স্থানীয় মানুষের উন্নয়ন এবং জীবিকার স্বার্থে পর্যটনশিল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তারমধ্যে গোসাবা ব্লক অন্যতম। তাছাড়াও রয়েছে পাথরপ্রতিমার বিভিন্ন দ্বীপ।

সুন্দরবনের মূল আকর্ষণ ম্যানগ্রোভ। এই ম্যানগ্রোভই বাঁচিয়ে রেখেছে সুন্দরবনকে। ম্যানগ্রোভ বাঁচলে প্রকৃতির রোষ থেকে বাঁচবে সুন্দরবন, বাঁচবে শহর কলকাতাও। তাই সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ রক্ষার জন্যে দীর্ঘদিন ধরে বহু সংস্থা এখানে কাজ করছে। তারমধ্যে রয়েছে টেগোর সোসাইটি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট। এই টেগোর সোসাইটির উদ্যোগে সুন্দরবনের দয়াপুরে গোমর নদীর তীরে প্রায় ২ একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ মডেল ইন্টারপ্রিটেশান সেন্টার। সেন্টারে ঢুকে কাঠের সাঁকোর উপর দিয়ে হেঁটে গেলেই দেখা মিলবে জানা অজানা প্রায় ৩৬ প্রজাতির ম্যানগ্রোভের।

সুন্দরবনের এটি একটি অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। এই বিষয়ে আই লীডের চেয়ারম্যান প্রদীপ চোপড়া দেশের সময়কে জানালেন, “ম্যানগ্রোভ সবরকম সাইক্লোন, বন্যা, নদীর ভাঙ্গন, জোয়ার থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করে। সুন্দরবনের মত ম্যানগ্রোভ আর কোথাও পাওয়া যায় না। এখানে প্রায় ৬৫টি প্রজাতির ম্যানগ্রোভ নিয়ে রিসার্চ করছে তাদের ছাত্র ছাত্রীরা। এখানকার ইকোলজিকে বাঁচাতেই এই ম্যানগ্রোভ সেন্টারটি গড়ে তোলা হয়েছে। এটি মূলত একটি রিসার্চ সেন্টার, সেইসঙ্গে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠেছে”।

সুন্দরবনের অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গেই জুড়ে আছে সেখানকার ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস জানতে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণভাবে জানতে হলে একবার ঘুরে আসতেই টেগোর সোসাইটি এবং আই লীড ফাউন্ডেশানের উদ্যোগে তৈরি সুন্দরবন এক্সিবিশান সেন্টার। “মৌমাছির চাকের আকারে তৈরি এক্সসিবিশান সেন্টারটিতে গেলে জানা যাবে সুন্দরবনের ইতিহাস, সেখানকার প্রাকৃতিক এবং বন্যসম্পদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য। যেটি আর কয়েকমাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে যাবে এবং পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।” জানালেন টেগোর সোসাইটির সুন্দরবন রুরাল ডেভেলপমেন্ট সেক্রেটারি শ্রী প্রবীর মহাপাত্র।

সুন্দরবনের অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন করতে হলে রাত্রিযাপন করতে পারেন রাঙ্গাবেলিয়া গ্রামেরই আর এক প্রান্তে নদীর ধারে অবস্থিত ‘অনেকান্ত’ রিসোর্টে। এখানে থাকলে তারাই থাকা, খাওয়া দাওয়া এবং ঘোরার সবরকম ব্যবস্থা করে দেবেন।




