সঙ্গীতা চৌধূরী কলকাতা

বাঙালি জীবনে ফলহারিণী কালী পুজোর তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে। রামকৃষ্ণ এই দিনেই স্ত্রী সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তি সগুণরূপের পুজো করেছিলেন। তিনি ফলহারিণী কালী পুজোর দিন শ্রীমা সারদাকে ষোড়শীরূপে পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণমঠ ও আশ্রমে এই পুজো ‘ষোড়শী’ পুজো নামে পরিচিত। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য এই নিয়মে পুজো করলেও এই দিনটিতে হিন্দু ধর্মাবলাম্বী মানুষ নানাবিধ ফল দিয়ে কালীর পুজো করে থাকেন।

টালিগঞ্জের করুণাময়ী কালী মন্দিরে ফলহারিণী কালীপুজো

হিন্দু ধর্মে  মা কালীর (Goddess Kali) আরাধনা সর্বজনবিদিত। বিভিন্ন তিথিতে বিভিন্ন রূপের পুজো করা হয় দেবীর। যার মধ্যে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে ফলহারিণী কালী পুজো হয়। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলি পৌরাণিক গল্প। মানুষ সারা জীবন কর্ম করে যান। কিন্তু মনে করা হয়, এই কর্মসমূহের ফল দান করেন দেবী কালিকা। তিনি সমস্ত কিছু শক্তি, জ্ঞান, ইচ্ছা ও কর্মশক্তিরূপে বিরাজিতা। আর ফলহারিণী কালী পুজো প্রত্যেকের বিদ্যা, কর্ম ও সেই সঙ্গে অর্থভাগ্যের উন্নতি ঘটে। প্রেম-প্রণয়ে সমস্ত বাধা দূর হয়। দাম্পত্য সাংসারিক জীবনেও সুখশান্তি লাভ হয়।

কেন করা হয় ফলহারিণী কালীপুজো?
মা কালী জীবের কর্মফল অনুসারে ফল প্রদান করছেন। তিনিই নিজের মধ্যে সমস্ত কর্মফলকে ধারণ করেন। এই মাতৃরূপা মহাশক্তি প্রসন্না হলে জীবের দুঃখ ও দুর্দশা থেকে মুক্তি মেলে। সেই সঙ্গে শারীরিক,মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ হয়।

রামকৃষ্ণদেবের স্ত্রী- সারদা দেবীকে পুজো 
কথিত আছে, রামকৃষ্ণদেব ফলহারিণী কালী পুজোর দিনই স্ত্রী -সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগৎ কল্যাণের জন্য। এদিন শ্রীমা সারদাকে ষোড়শীরূপে পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণমঠ ও আশ্রমে এই পুজো ‘ষোড়শী’ পুজো নামে পরিচিত। 

টালিগঞ্জের করুণাময়ী কালী মন্দিরে ফলহারিণী কালীপুজো

এছাড়া ১২৮০ বঙ্গাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে, তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তি সগুণরূপের পুজো করেছিলেন। সেজন্যে এইদিনটি অত্যন্ত শুভ ও তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মোক্ষপ্রাপ্তির জন্য বিশেষ নিয়মে পুজো করলেও, এই দিনটিতে হিন্দু ধর্মাবলাম্বীরা নানাবিধ মরসুমী ফল দিয়ে কালীর পুজো করে থাকেন।

ফলহারিণী কালীপুজোয় গাছের ফল উৎসর্গ করা রীতি?
আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি রকমারি ফল জ্যৈষ্ঠ মাসে সহজে পাওয়া যায়। ভক্তেরা তাদের ইষ্টদেবীকে বিভিন্ন ফল দিয়ে প্রসাদ নিবেদন করে থাকেন। শাস্ত্রে বলা আছে,’জীবনেয সর্বস্ব’। যার অর্থাৎ একদিকে ফলহারিণী,সাধকের কর্মফল হরণ করেন। 

টালিগঞ্জের করুণাময়ী কালী মন্দিরে ফলহারিণী কালীপুজো

জ্যৈষ্ঠমাসে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল ইত্যাদি নানারকম ফলের মরসুমি ফল পাওয়া যায়। সাধক তাঁর ইষ্টদেবীকে বিভিন্ন ফল দিয়ে প্রসাদ নিবেদন করে থাকেন। শাস্ত্রে বলা হয়, জীবনেয সর্বস্ব। অর্থাৎ একদিকে ফলহারিণী যা সাধকের কর্মফল হরণ করেন। অপর দিকে কর্মফল হরণ করে সাধককে তাঁর অভীষ্টফল, মোক্ষফল প্রদান করেন। মহামারী, অনাবৃষ্টি বা বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেতে মানুষ রক্ষাকালী পুজো করে। কার্তিক মাসে দক্ষিণাকালীর পুজোয় সকলের সার্বিক কল্যাণ হয়। আর ফলহারিণী কালীপুজো করলে আমাদের প্রত্যেকের বিদ্যা, কর্ম ও অর্থভাগ্যের উন্নতি ঘটে। প্রেম-প্রণয়ে বাধা দূর হয়। দাম্পত্য সাংসারিক জীবনেও সুখশান্তি লাভ হয়।

ফলহারিণী কালী কথাটি এসেছে যিনি আমাদের কর্মফল হরণ করেন এবং মোক্ষ দান করেন। কর্মফল হরণ করে তিনি আমাদের মুক্তি দেন। আমাদের জীবনের সমস্ত বিপদ, দুঃখ, দৈন্য, ব্যাধি ও সর্ব অশুভ শক্তির বিনাশ করেন তিনি। ঐশ্বর্য্য, আরোগ্য, বল, পুষ্টি, কীর্তি, বংশগৌরব মুখ্য সবই প্রদান করেন। এক কথায় পরম প্রাপ্তি ও পরমাত্মা দুটোই লাভ করা যায়। এই ফলহারিণী কালী পুজোয় সাধকের মনে আধ্যাত্ম্য চেতনার দ্রুত বিকাশ ঘটে। ১৮৭৩ সালে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ মা সারদা দেবীকে ষোড়শী রূপে পূজা করেন। রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন শাখায় এই দিনটি ধুমধাম করে পালন করা হয়। দশমহাবিদ্যার যে দশটি রূপ কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলা, ধূমাবতী, মাতঙ্গী, কমলা – ষোড়শীর রূপটি সেই আদিশক্তি মহামায়ার রূপ। এই দিন রামকৃষ্ণদেব সারদাদেবীকে বিদ্যা এবং শ্রীবিদ্যাদাতৃরূপে পূজা করেন।

মায়ের কাছে শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রেম বিবেক বৈরাগ্য প্রার্থনা করতে হয়। এই এই দেবী কালিকার বিভিন্ন নাম। কোথাও নিত্যকালী, কোথাও মহাকালী, কোথাও ভদ্রকালী, কোথাও শ্যামাকালী, কোথাও রক্ষাকালী, কোথাও সিদ্ধেশ্বরী কালী, কোথাও শ্মশানকালী, কোথাও রটন্তীকালী, আবার কোথাও ফলহারিনী কালী। বিভিন্ন নামে তিনি পূজিতা হন। জৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ফলহারিনী কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ব্রহ্মময়ী কালী একদিকে যেমন সৃষ্টি স্থিতি বিনাশ করছেন, সমস্ত কিছু শক্তি, জ্ঞান, ইচ্ছা ও কর্ম শক্তিরূপে বিরাজিতা।

কালকে যিনি হরণ করেন তিনি কালী। কালের কবলে পড়ে বিনাশ হয়নি এমন বস্তু এই জগতে নেই। তাই কালের সঙ্গে কালীর সম্পর্ক চিরন্তন চিরসত্য এবং চির মাধুর্যময়। এই কালকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করেন যিনি সেই কালিকা দেখতে ভয়ঙ্কর হলেও তিনি আমাদের কাছে অত্যন্ত কাছের, অতি আপন, আমাদের ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার জগতের মঙ্গলময়ী মা। দশমহাবিদ্যার প্রথম রূপ কালী স্বয়ং ব্রহ্মশক্তি। স্বয়ং মহাকাল শিব মায়ের পদতলে বিরাজ করছেন। তিনি সব রূপে নির্গুণ। পরমসত্তা তাঁর উপর দণ্ডায়মান। জগতের স্থিতি সৃষ্টি প্রলয়ের কর্তৃ চৈতন্য রূপী কালী। এই কালী আবার জীবের কর্মফল দানকারী। কর্মফল অনুযায়ী ভালো-মন্দ ফল দান করেন। মহাকালী একধারে ভয়ংকরী, অন্যদিকে অপার করুণাময়ী।

সন্তানদের অশুভ ফলও হরণ করেন মা কালী
অন্য দিকে কর্মফল হরণ করে ভক্তদের, তাঁদের অভীষ্টফল, মোক্ষফল প্রদান করেন। ফলহারিণী কালী পুজোর দিন মা কালী স্বয়ং, তার সন্তানদের শুভ ফল প্রদান করেন এবং সেই সঙ্গে তাঁদের অশুভ ফলও হরণ করে থাকেন। 

ফলহারিণী কালী পুজো ২০২৪-র তারিখ 
আগামী ৫ জুন (বাংলায় ২২ জ্যৈষ্ঠ), বুধবার, এবারের ফলহারিণী কালী পুজোর দিন পড়েছে। 

ফলহারিণী কালী পুজো ২০২৪-র অমাবস্যা শুরু ও শেষ কখন? 
৪ জুন, রা ৭/১৩/২৮ মিনিট থেকে ৫ জুন, অপঃ ৪/৫৩/২৮ মিনিট পর্যন্ত থাকবে অমাবস্যা তিথি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here