পার্থ সারথি নন্দী

বনগাঁ :সোমবার পঞ্চম দফার ভোটে মতুয়া গড়েই কড়া নজর মোদী-মমতার। কারণ, আর সব ইস্যুকে ছাপিয়ে এই কেন্দ্রে সবার উপরে উঠে এসেছে সিএএ (CAA)। এবারের লোকসভা ভোটের মুখে দেশে লাগু হয়েছে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন। আর তারপরই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।

কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির দাবি, দেশবাসীকে নাগরিকত্ব দিতেই এই আইন আনা হয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের মতো কেন্দ্রের বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, সিএএ (CAA)বিজেপির চাল। যারাই এই আইনে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করবে, তাঁদেরকেই বিদেশি বলে চিহ্নিত করে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ছক কষেছে বিজেপি।

সিএএ আসলে এনআরসি’র প্রাথমিক ধাপ। ফলে সিএএ-র উপরই নির্ভর করছে মতুয়াদের ভবিষ্যৎ। স্বাভাবিকভাবেই মতুয়া গড় হিসেবে পরিচিত ঠাকুরনগরকে কেন্দ্র করে বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে সিএএ কতটা প্রভাব ফেলল, তার উপরই নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল।

ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়ির অন্যতম প্রধান সদস্য শান্তনু ঠাকুর নিজে বিজেপির প্রার্থী হওয়ায় সিএএ ইস্যু বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রে আরও বেশি চর্চার হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সিএএ-কে কেন্দ্র করে আড়াআড়িভাবে দু’ভাগ হয়ে গিয়েছেন মতুয়ারা। কারণ, ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়ির আর এক অন্যতম সদস্যা মমতাবালা ঠাকুর তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ। সিএএ-র বিরোধিতায় সরব হয়ে লাগাতার প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। ফলে মতুয়ারা মমতাবালা নাকি শান্তনু ঠাকুর কার দিকে থাকবেন, সেটাই এখন দেখার।

দু’পক্ষই একে-অপরের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে ছাড়ছে না। সবমিলিয়ে রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্র গোটা দেশের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ঘেঁষা লোকসভা কেন্দ্র বনগাঁ। ২০০৯ সালে এই কেন্দ্রটি আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত। উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়ার সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে রয়েছে এই লোকসভা কেন্দ্রটি। এর মধ্যে যেমন রয়েছে বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, বাগদা, গাইঘাটা, স্বরূপনগর বিধানসভা, তেমনই রয়েছে কল্যাণী ও হরিণঘাটা।

২০১৯ সালের তথ্য বলছে, এই লোকসভা কেন্দ্রের মোট ভোটদাতা ছিল ১৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৭১৩ জন। শান্তনু ঠাকুর ভোটে জিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন। এই কেন্দ্রের ভোটের হার-জিতের নির্ণায়ক শক্তি যেহেতু মতুয়ারা, ফলে তাঁরা কোনদিকে ঝুঁকছেন, তার উপরই নজর থাকে রাজনৈতিক দলগুলির। গতবার লোকসভায় মতুয়ারা বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি তেমন নয়। মতুয়ারা দুই শিবিরেই ভাগ হয়ে গিয়েছেন।

মতুয়াদের একাংশ যেমন সিএএ-তে আবেদন করবেন কি না তা নিয়ে রীতিমতো সন্দিহান, তেমনই অপর একটি অংশ শান্তনু ঠাকুরের কথায় ভরসা রেখে সিএএ-তে আবেদন করতে শুরু করেছেন। রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর অবশ্য বলছেন, মতুয়ারা নিঃশর্ত নাগরিকত্ব চান। তাঁরা কেউ সিএএ-তে নাম লেখাবেন না। এটা মতুয়াদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার একটা কৌশল। বিজেপির চক্রান্ত।

নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও বারবার বলেছেন, তৃণমূল থাকতে বাংলায় কখনও সিএএ, এনআরসি করতে দেব না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমনও হুমকি দিয়েছেন, একজন মতুয়ার গায়েও যদি বিজেপি হাত দেয়, তাহলে তিনি ছেড়ে কথা বলবেন না।

অন্যদিকে, বিজেপি নেতারা সিএএ-র পক্ষে গলা ফাটিয়েছেন গোটা প্রচারপর্বে। সেই তালিকায় যেমন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মতো হেভিওয়েট নেতারা ছিলেন, তেমনই ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের নেতারা। তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সিএএ-র বিরোধিতা করা মানেই সেই সরকারের পতন। ফলে তৃণমূলের পতন আসন্ন।  

এই অবস্থায় রাজনৈতিক মহলের এখন নজর একটাই, পঞ্চম দফার ভোটে বিজেপির শান্তনু ঠাকুর নাকি তৃণমূল প্রার্থী বিশ্বজিৎ দাস—কে শেষ পর্যন্ত মতুয়া ভোট নিজের ঝুলিতে ভরতে সক্ষম হলেন? বিশ্বজিৎ দাস সরাসরি ঠাকুরবাড়ির সদস্য নন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করার সুবাদে মতুয়া সংগঠনের সঙ্গে তাঁর ভালোই সখ্যতা। এবার লোকসভা ভোটে প্রার্থী হয়ে প্রথম থেকেই তিনি মতুয়াদের মন জয়ের চেষ্টার কসুর করেননি। নিজেকে মতুয়া বলেই পরিচয় দিয়েছেন।

বিশ্বজিতের দাবি, পঞ্চায়েত স্তর থেকে রাজনীতি করছি। ফলে বনগাঁর মানুষের কাছে আলাদা করে নিজেকে পরিচিত করতে হয়নি। সারাবছর মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষের জন্য কাজ করি। তাছাড়া আমি যে দলের প্রার্থী, সেই তৃণমূলের কর্মীরা সারাবছর মাঠে-ময়দানে থাকেন। আমাদের দলের সুপ্রিমো তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মানুষের জন্য প্রচুর জনমুখী প্রকল্প চালু করেছেন। বাংলার মানুষ সেসব প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন।

অন্যদিকে, বিজেপি মোদিবাবুর গ্যারান্টি বলে যা প্রচার করছে, তা আসলে যে ৪২০ সেটাও মানুষ বুঝেছেন। সিএএ করে মতুয়াদের দেশ থেকে তাড়ানোর ছক কষা হয়েছে। এটা মতুয়ারা বুঝতে পারছেন। তাই তাঁরা কোনওমতেই বিজেপিকে ভোট দেবেন না বলে আমার বিশ্বাস।

তবে বিশ্বজিৎ দাস একথা বললেও গত কয়েক বছর আগে তাঁর বিজেপিতে যোগদান এবং পদ্ম শিবিরের টিকিটে তাঁর বাগদার বিধায়ক হওয়া, পরে আবার তৃণমূলে ফেরা, এটা মানতে পারেননি তৃণমূলেরই একাংশ। বিশেষ করে বাগদার মানুষের একাংশের মধ্যে বিশ্বজিৎকে নিয়ে কিছুটা হলেও ক্ষোভ থেকে গিয়েছে। যদিও সেই ক্ষত মেরামতের আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন বিশ্বজিৎ। তাঁর দাবি, কোথাও মানুষের মধ্যে কোনও ক্ষোভ বিক্ষোভ নেই। আমরা জিতছি, এটা একশো শতাংশ নিশ্চিত করে বলতে পারি। বিজেপি মতুয়াদের ভুল বুঝিয়ে আর টাকা ছড়িয়ে ভোটে জেতার চেষ্টা করছে, এটা পারবে না ওরা।

দাঁড়িয়ে ব্যাপক জনসমর্থন পান ঠাকুরবাড়ির সদস্য শান্তনু ঠাকুর। তিনি জয়ী হন ১ লক্ষ ১১ হাজার ৫৯৪ ভোটে। হারিয়ে দেন মমতাবালা ঠাকুরকে। এর রেশ এসে পড়ে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটেও।

গোটা রাজ্যে তৃণমূলের জয়জয়কার হলেও বনগাঁর দু’টি বিধানসভার পাশাপাশি মহকুমার চারটি বিধানসভা কেন্দ্রেই জয়ী হয় বিজেপি। সীমান্ত শহরে এসে থমকে যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয় রথ। আর শুধু বনগাঁ মহকুমা নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে কল্যাণী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির অম্বিকা রায় জয়ী হন ২২০৬ ভোটে। হরিণঘাটাতেও একই ফল। সেখানে বিজেপির অসীম সরকার জয়ী হন ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে। বনগাঁ লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র স্বরূপনগর বিধানসভায় টিমটিম করে জ্বলে থাকে তৃণমূল। সেখানে জোড়াফুলের প্রার্থী বীণা মণ্ডল জয়ী হন ৩৪ হাজার ৮০০ ভোটে।  এরপর অবশ্য হারানো জমি ফেরত পেতে গত পাঁচ বছরে বনগাঁ মহকুমায় অনেকটাই পরিশ্রম করেছে তৃণমূল। তার সাফল্য মিলেছে পঞ্চায়েত ভোটে। এবার লোকসভায় কী হয়, সেটাই দেখার।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here