‘বাংলাদেশি ইলিশ’ বলে ভিন রাজ্যের মাছ বিক্রির অভিযোগ, বনগাঁ বাজারে হানা খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের
deshersamay

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেদার বিজ্ঞাপন—পদ্মার ইলিশ, বরিশালের ইলিশ, আরও কত কী! কেউ দর হাকছেন ২২০০ টাকা, কেউ ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। ভিডিয়ো, রিলস, ভ্লগিং এর দৌলতে বনগাঁর বাজারেও বহু দূরদূরান্ত ক্রেতা আসছেন। অনলাইনেও চলছে কেনা বেচা। যোগাযোগের বিস্তারিতও দেওয়া থাকছে। ইলিশের লোভে লোভে লোকজন তা কিনতেও চলে যাচ্ছেন। চড়া দামে ইলিশ ঘরে আনছেন ঠিকই, কিন্তু তা পদ্মার নয়, একেবারে দেশীয়! এমনই অভিযোগ ঘিরে সরগরম বনগাঁর একাধিক বাজার। হিলশা ফিশ অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের কর্মীরাও। মজদুর সঙ্ঘের তরফে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বনগাঁ থানায় ডেপুটেশনও জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলাশাসক, বনগাঁর এসডিও-সহ ক্রেতা সুরক্ষা দপ্তরেও ডেপুটেশনের কপি দিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশের খাঁটি ‘ ইলিশ’ বলে ভিন রাজ্যের মাছ বিক্রির বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগের পর । অবশেষে রবিবার বনগাঁর নিউ মার্কেটের একটি মাছের দোকানে যৌথ তল্লাশি চালালেন বনগাঁ পুরসভা ওখাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। তবে ইলিশগুলো সত্যিই ‘পদ্মার’ নাকি ভিন রাজ্যের, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তাদের নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
ভোজনরসিক বাঙালির কাছে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ মানেই বাড়তি উৎসাহ। বাংলাদেশের ইলিশের জন্য বিশেষ করে বর্ষার সময়ে প্রতীক্ষা করে বসে থাকেন অনেকেই। পদ্মার ইলিশের জন্য গাঁটের বাড়তি কড়িও খরচ করতে পিছুপা হন না তাঁরা। আর বাংলাদেশি ইলিশের প্রতি ভোজন রসিকদের অমোঘ টানের কথা মাথায় রেখেই লোক ঠকানোর ব্যবসা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

গত কয়েক দিন ধরেই বনগাঁ নিউ মার্কেটের ওই মাছের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় যেন উপচে পড়ছিল। সবাই খাঁটি পদ্মার ইলিশ কিনতে চান। কিন্তু সেই মন ভালো করে দেওয়া স্বাদ যেন মিলছিল না বলেই অভিযোগ। সেই নিয়ে মাছের দোকানের বিরুদ্ধে পরপর অভিযোগ জমা পড়ে। তার পরেই বিষয়টা খতিয়ে দেখতে এদিন দোকানে পৌঁছন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকরা।

দোকানের মজুত ইলিশ খুঁটিয়ে দেখেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর ও পুরসভার আধিকারিকরা। মাছগুলি কোথা থেকে কেনা হয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র রয়েছে কি না, খতিয়ে দেখা হয়। বিশেষ করে মাছগুলি সত্যিই বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে, নাকি অন্য কোনও রাজ্য থেকে কিনে নিয়ে এসে পদ্মার ইলিশ বলে বিক্রি করা হচ্ছে, সেই নিয়েই মূলত তদন্ত করেন তাঁরা।

বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের চাহিদা বিপুল। দামও তুলনামূলক ভাবে বেশি। সেই সুযোগে অনেক ব্যবসায়ীই ভিনরাজ্য থেকে মাছ কিনে এনে ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ। তবে বনগাঁর ওই দোকানের ইলিশ সত্যিই বাংলাদেশের নাকি ভিন রাজ্য থেকে আমদানি করা, সেই ব্যাপারে চূড়ান্ত কিছু জানায়নি প্রশাসন। তাঁরা ইলিশের নমুনার পাশাপাশি নথিপত্রও নিয়ে গিয়েছেন। তদন্তের পরেই গোটা বিষয়টা স্পষ্ট হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর।
তবে বাংলাদেশি ইলিশ বলে ভিন রাজ্যের মাছ বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দোকান মালিক যাদব হালদার। তিনি বলেন, ‘বারাসতের একটি স্টোর থেকে বাংলাদেশি ইলিশ কিনে নিয়ে এসে বিক্রি করি।’ এখন সেই স্টোর থেকে তিনি বাংলাদেশের নথিপত্র নিয়ে আসবেন বলে জানিয়েছেন। তার পরে জমা দেবেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরে। তখনই জানা যাবে ইলিশের আসল ‘বংশ পরিচয়’।

প্রসঙ্গত,প্রতি বছর বনগাঁর পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে পদ্মার ইলিশ এসে পৌঁছয় ভারতে। দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের ইলিশ ঢুকতে শুরু করে। তার পরে সেগুলি কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে যায়। তবে এ বছর অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে ইলিশ না এলেও বনগাঁর বাজারে পদ্মার ইলিশের নাম করে কুইন্টাল কুইন্টাল ইলিশ বিক্রি করে চলেছেন ব্যবসায়ীদের একাংশ। কখনও চাঁদপুর, কখনও বরিশাল, কখনও চট্টগ্রামের ইলিশের নাম করে তাঁরা ইলিশ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ ইলিশগুলি সবই এখানকার।
এই প্রসঙ্গে হিলশা ফিশ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য গৌতম সাহা বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে এ রাজ্যে ইলিশ আসে ঠিকই। কিন্তু এ বছর এখনও পর্যন্ত সেই রকম কোনও সম্ভবনা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের ইলিশ বলে বনগাঁর একাধিক বাজারে দেদার দেশীয় ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। বনগাঁর ব্যবসায়ীদের বলব, আপনারা এটা করবেন না। লোক ঠকানোর ব্যবসা করবেন না। সঠিক মাছ সঠিক দামে বিক্রি করুন। ক্রেতাদের প্রতারিত করবেন না।’
এ প্রসঙ্গে বনগাঁ বাজারের রাধাগোবিন্দ ফিশ সেন্টারের মাছ বিক্রেতা রঞ্জিত বিশ্বাস বলেন, ‘এই ইলিশ মাছগুলি বাংলাদেশের নয়। তবে খুব সুস্বাদু। কিন্তু সত্যি কথা বললে বিক্রি হবে না। কেউ কিনবেন না। তাই মিথ্যের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।’

এ দিকে ভারতীয় মজদুর সংঙ্ঘের নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইলিশের নাম করে দেশীয় ইলিশ চড়া দামে বিক্রি করার বিরুদ্ধে বনগাঁ থানায় ডেপুটেশন দিয়েছেন গত বুধবার। এ প্রসঙ্গে ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘের বনগাঁর নগর কমিটির সম্পাদক রাজীব গোস্বামীর বক্তব্য, ‘দেশীয় ইলিশ মাছকে বাংলাদেশের বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে এক শ্রেণির মাছ ব্যবসায়ী চড়া দামে বিক্রি করছেন। এর ফলে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। আমরা চাই আইন মোতাবেক অভিযুক্ত মাছ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করুক পুলিশ। অবিলম্বে এ সব বন্ধ করতে হবে।’
