

গুঞ্জন ছিলই। তবে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানি চলাকালীন আদালতে দেখা যায়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আজ, বুধবার বাংলার ভোটার লিস্টে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) নিয়ে মমতার দায়ের করা মামলাটির শুনানি নির্ধারিত রয়েছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে। পাশাপাশি কবি জয় গোস্বামীর তরফে ‘সার’ নিয়ে অন্য যে মামলাটি দায়ের হয়েছিল, তারও শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে আজ। ‘সার’ মামলার শুনানিতে আজ শীর্ষ আদালতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হাজির হতে পারেন, এই জল্পনা জোরালো হলো। মমতা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী বা তৃণমূলনেত্রী হিসেবে নন, এক জন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই এই মামলাটি দায়ের করেছেন।

বুধবার শুনানির ১২ ঘণ্টা আগে থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে দিল তৃণমূল । দলের প্রায় সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে একটি গ্রাফিক্স ইমেজ পোস্ট করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, কালো রোব পরে সুপ্রিম কোর্টের সিঁড়ি বেড়ে উঠছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নীচে লেখা, ‘সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর-কে চ্যালেঞ্জ করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’।
বিধানসভা ভোটের আগে গোটা এই ঘটনা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে কী বার্তা দিতে চাইছেন তার উদ্দেশ্য ও বিধেয় অনেকের কাছেই স্পষ্ট। তৃণমূল দেখাতে চাইছে, এসআইআর মাধ্যমে বাংলার বিপুল মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে একটা বড় আঘাত হানতে চাইছে দিল্লি। এই ষড়যন্ত্রে বিজেপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনও সামিল। এবং এই ঘোর সংকটে বাংলার মানুষ যখন বিপন্ন তখন তিনি অভিভাবক ও ত্রাতা হয়ে দিল্লিতে গিয়ে লড়াই করছেন।

রাজনীতিতে নাটকীয়তা বহুদিন ধরেই রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে কালো গাউন পরে সওয়াল করতে যাওয়ার নেপথ্যেও সেই নাটকীয়তা রয়েছে। যাতে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে পর্যন্ত এই ছবি পৌঁছে দেওয়া যায় যে তাঁদের জন্য সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই লড়ছেন দিদি।
এসআইআর প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন এরই মধ্যে পেশ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন প্রশ্ন হল, মমতা নিজেই কি কালো রোব পরে সেখানে সওয়াল পারবেন? আইনের ডিগ্রি থাকলেই তা করা সম্ভব?
সুপ্রিম কোর্টের বার কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী তা তিনি করতে পারেন না। সে জন্যে বারের সদস্য হতে হবে। কিন্তু কপিল সিব্বল ও অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির সঙ্গে তিনি যদি কালো রোব পরে আদালতের বাইরে অবধিও যান, তাহলেও যে ছবি সামনে আসবে, সেটাই জনমানসে অপটিক্স তৈরির জন্য যথেষ্ট। এবং এর পিছনে আইপ্যাকের একটা পরিকল্পনা আছে বলেও আলোচনা চলছে নানা মহলে।

সূত্রের খবর, বুধবার শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য আদালতের অনুমতি চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তবে তিনি যে হেতু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জ়েড প্লাস নিরাপত্তা পান, তাই সুপ্রিম কোর্টে হাজির হতে হলে শীর্ষ আদালতের রেজিস্ট্রির কাছে আলাদা করে আবেদন জানাতে হতো। তৃণমূল সূত্রের খবর, সেই অনুমতি করা হয়েছিল এবং তা মিলে গিয়েছে।‘সার’ মামলায় তিনি নিজে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করবেন কি না, তা মঙ্গলবার দিল্লিতে বঙ্গভবনে সাংবাদিক বৈঠকে মমতা স্পষ্ট করেননি। তবে তাঁর নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমতি মিলে যাওয়ায় আজ সিজেআই সূর্য কান্তের এজলাসে মুখ্যমন্ত্রীর হাজির হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলেই মনে করা হচ্ছে।
এখন দেখার তিনি আদালত কক্ষে দাঁড়িয়ে মহামান্য দুই বিচারপতির অনুমতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাখার চেষ্টা করেন কিনা। তৃণমূলের অনেকের মতে, দিদির জন্য অসাধ্য কিছু নেই। দিদি সব পারেন।
মমতা এর আগে বহু রাজনৈতিক মিটিংয়েই বলেছেন, তিনি আইনজীবী হিসেবে কালো কোট গায়ে দিয়ে বালুরঘাটের একটি মামলায় দাঁড়িয়েছিলেন। আইন পাশ করলেও অবশ্য সে ভাবে আইনজীবীর পেশায় তিনি থাকেননি। ‘সার’ নিয়ে যে ভাবে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে, তার প্রতিবাদে তিনি নিজে সুপ্রিম কোর্টে লড়বেন বলেও জানিয়েছিলেন। তিনি এ–ও বলেছিলেন, ‘দরকার হলে আমিও সুপ্রিম কোর্টে মানুষের হয়ে আবেদন জানাব, মানুষের হয়ে কথা বলব। আমি আইনজীবী। কিন্তু নাগরিক হিসেবে যাব। আমি আমার কথা বলতেই পারি।’ তবে এক জন মুখ্যমন্ত্রী নিজে শীর্ষ আদালতে শুনানিতে হাজির হলে তা ভারতীয় রাজনীতিতে বিরল ঘটনা হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৯৪–এর ১০ ফেব্রুয়ারি বালুরঘাট জেলা আদালতে মমতা কালো কোর্ট গায়ে দিয়ে মামলা করেছিলেন। সেখানে জেলার বিশিষ্ট আইনজীবী শঙ্কর চক্রবর্তী, বিপ্লব মিত্র, সুভাষ চাকিরা উপস্থিত ছিলেন। এই মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সওয়াল করেছিলেন। আইনজ্ঞরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের সদস্য হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টেও কালো কোট গায়ে দিয়ে তাঁর সওয়াল করতে বাধা নেই। তবে শেষমেশ মমতা কী করবেন, তা নিয়ে তীব্র জল্পনা রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে।

যদিও এ নিয়ে কটাক্ষ ছুড়ে দিতে দেরি করেনি রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী । তাঁর কথায়, ‘উনি কোথাকার আইনজীবী আমি জানি না। বুধবার সবাই নতুন ড্রামা দেখবে। নতুন উকিল দেখবে। এ সব করে কোনও লাভ হবে না। উনি চাইছেন, এসআইআর প্রক্রিয়া ঘেঁটে দিয়ে ২০২৪–এর লোকসভা ভোটের সময়কার ভোটার তালিকা দিয়ে এ বারের বিধানসভা ভোট করাতে। যেখানে মৃত ভোটারদের নামও থাকবে।’



