Desher Samay
প্রচ্ছদকলকাতাজেলাপশ্চিমবঙ্গউত্তরবঙ্গদেশবাংলাদেশআন্তর্জাতিকই-পেপারফটো গ্যালারিসম্পাদকের পছন্দসরাসরিইউটিউব

Uttar Kolkata উত্তরের সিনেমা পাড়ার টুকরো ছায়াচিত্র

deshersamay

Share article:
অর্পিতা দে , দেশের সময়

উত্তর কলকাতার কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট বর্তমানের বিধানসরণী এক সময়ে সিনেমাপাড়া  নামেই খ্যাত ছিল। শ্রী, উত্তরা , রুপবানী, শুশ্রী,  মিত্রা, রাধা, দর্পণা, টকিশোহাউস, স্টার, মিনার এই সব প্রেক্ষাগৃহকে একসময় দর্শকের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হতো। রাত বারোটার নাইটশো’ও তখন বিধানসরনীর ট্রাম লাইনে সন্ধের ভিড় নামাতো। সেই রাতের অন্ধকারেই আজ হারিয়ে গেছে এই সিনেমাপাড়ার চিরাচরিত জৌলুস। একে একে বন্ধ হল রুপবানী, শ্রী, স্টার, উত্তরা, মিত্রা, রাধা, দর্পনা।

ষাট সত্তরের দশক যেন স্বর্ণযুগ ছিল উত্তর কলকাতার এই সিনেমাপাড়া। উত্তম সুচিত্রা জুটি থেকে শুরু করে অমিতাভ রেখা, সিনেমাপাড়ার গল্পই ছিল নস্টালজিক বিভিন্ন ছবির চরিত্রের মতন। এইসব বিখ্যাত  সিনেমাহলগুলির নামের সাথেই জড়িয়ে আছে নানান গল্প। ‘কলকাতার সিনেমা হল’ নামক একটি বই- এর তথ্য অনুযায়ী শোভাবাজার রাজবাড়ির দেব-দে’র জমি লিজ নিয়ে তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রূপবাণী’।

‘স্ক্রিন কর্পোরেশন লিমিটেড’-এর নির্মিত ‘রূপবাণী’ প্রেক্ষাগৃহের নামকরণ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৩২ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিশ্বকবির পৌরহিত্যে ‘রূপবাণী’ প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন হয়েছিল।এই রূপবাণীতেই ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘শশীনাথ’ দেখে, উক্ত ছবির অভিনেতা কানু বন্দোপাধ্যায়কে কবি বলেছিলেন – ‘তোমার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার স্ত্রীর অভিনয়ও আমি উপভোগ করেছিলাম।‘ এরপর ১৯৩৭ সালেরই শেষদিকে পরিচালক নরেশ মিত্র গোরার নাট্যরূপ গুরুদেবকে পড়ে শোনাবার জন্য শান্তিনিকেতন যান এবং তাঁর পূর্বপঠিত একটি ছোটগল্প ‘কঙ্কাল’-এর চলচ্চিত্রায়ণের ইচ্ছে প্রকাশ করেন কবির কাছে।

তিনি তাঁকে সিনেমার জন্য কাহিনি তৈরি করতে উৎসাহ দেন। জীবিতকালে রবীন্দ্রনাথের সাথে সিনেমাজগতের এটাই সম্ভবত শেষ আলাপ। কিন্তু উদ্বোধনের দিন ‘রূপবাণী’ সম্পূর্ণভাবে চিত্র প্রদর্শনীর জন্য উপোযোগী হয়ে ওঠেনি। ২৬ ডিসেম্বর বড়ুয়া পিকচার্সের ‘বাংলা ১৯৮৩’ ছবিটির প্রদর্শনীর মাধ্যমে সর্বসাধারণের জন্য ‘রূপবাণী’র দ্বার উন্মুক্ত করা হয়।

চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম দিকপাল বি এন সরকারের নিউ থিয়েটার্সও অচিরেই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করেন। শ্যামবাজার অঞ্চলে তাঁরা একটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করে নাম দেন ‘চিত্রা’; এই প্রেক্ষাগৃহের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। শর্ত ছিল তাঁর নিরাপত্তার জন্য কোন ব্রিটিশ পুলিশ মোতায়েন করা চলবে না। নেতাজির শর্ত রক্ষার্থে ঐ দিন তাঁকে দেখার ভিড় সামলাতে খেলার মাঠে হেডওয়ার্ড কোম্পানির লাইন ম্যানেজকারী ময়দানের দুধর্ষ জব্বর আলিকে নিযুক্ত করা হয়েছিল। ঐদিন সুভাষচন্দ্র নিউ থিয়েটার্সের সকলের কাছে আবেদন রেখেছিলেন- বিদেশি ভাষাকে প্রাধান্য না দিতে এবং বাংলা ছবি তৈরি করতে। নেতাজির উপদেশ অনুযায়ী সেইসময় থেকেই চিত্রা’র টিকিট বাংলায় ছাপা হয়। দ্বারোদঘাটনের দিন ‘চিত্রা’ প্রদর্শিত প্রথম ছবি শরৎচন্দ্রের কাহিনি অবলম্বনে ‘রাধা ফিল্মস’-এর ১০ রীলের ছবি ‘শ্রীকান্ত’।

‘চিত্রা’র ঠিক উল্টোদিকে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মিত হয়েছিল, ১৯৪২ সালের ২ মে এই প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা পায়। ‘মিনার’ প্রেক্ষাগৃহের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের ভূতপূর্ব কমিশনার জে সি মুখার্জি এবং পর্দা উত্তোলন করেছিলেন তাঁর স্ত্রী। এখানে প্রদর্শিত প্রথম ছবি নিউ টকিজ লিমিটেডের ‘নারী’।

১৯৫৪ সালের ১০ জুন নাগাদ বারিক এস্টেট-এর বারিক স্ক্রিন কর্পোরেশন শ্যামবাজারে ‘চিত্রা’র পাশে নিজেদের সাত কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করেন, নাম দেন ‘দর্পণা’। কে সি প্রোডাকসন্সের ‘লেডিজ সিট’ ছবিটি প্রদর্শিত হয় ‘দর্পণা’র দ্বারোদ্ঘাটনের দিন। ঐ বছরই হাতিবাগানের বিশ্বাসদের এক বিঘা জমির ওপর প্রাসাদোপম বাড়ির একতলা ও দোতলা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘রাধা’ সিনেমা। ‘রাধা’ সিনেমাহলে পর্দা উত্তোলন হয় এস বি পিকচার্সের ‘মা অন্নপুর্ণা’ ছবিটির প্রদর্শনের মাধ্যমে।

উত্তর কলকাতা জুড়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে বিভিন্ন নাট্যশালাগুলিতেও। বেশকিছু নাট্যশালায় নাটকের মাঝে মাঝে খন্ড খন্ড দৃশ্যে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হত। এরপর বেশকিছু নাট্যশালা পরবর্তীকালে পূর্ণপ্রেক্ষাগৃহে রূপান্তরিত হয়। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘জুপিটার থিয়েটার’ পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাগৃহে রূপান্তরিত হয় পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫১ সালের ২৭ শে অক্টোবর এর নাম পরিবর্তন করে হয় ‘লিবার্টি’ সিনেমা হল।

‘চিত্রা’ সিনেমাহলের নাম পরবর্তীকালে বদলে রাখা হয় ‘মিত্রা’। এই নাম বদলেরও গল্প আছে। শোনা যায় একবার মিত্র বাড়ির মহিলারা ঠিক করেন তাঁরা ‘চিত্রা’র ল্যান্ড লর্ড বক্সে বায়োস্কোপ দেখবেন। সেইমত তাঁরা ‘চিত্রা’র পিছনেই থাকা তাঁদের বাড়ির গাড়িতেই বের হন এবং গলিতে এক চক্কর কেটে ‘চিত্রা’য় গিয়ে হাজির হন; কিন্তু হলে গিয়ে জানতে পারেন ল্যান্ড লর্ড  বক্সের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। তখন ‘চিত্রা’য় উদয়ের পথে প্রদর্শিত হচ্ছিল। এমন ঘটনায় অপমানিত হয়ে নরেন্দ্রকৃষ্ণ ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর পরিবারের কেউ আর কখনও ‘চিত্রা’য় পা রাখবে না। বাবার প্রতিজ্ঞা রক্ষার্থে হেমন্তকৃষ্ণ ‘চিত্রা’র নাম বদলে, তাঁদের পদবি অনুসারে ‘মিত্রা’ রাখলেন।

১৯৬৩ সালের ১৫ এপ্রিল পয়লা বৈশাখের দিন নতুন করে মিত্রা’র দ্বারোদঘাটন করা হয়। অনুষ্ঠানের পৌরহিত্য করেন অতুল্য ঘোষ এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং বীরেন্দ্রনাথ সরকার। ‘মিত্রা’র শুরুর দিনে প্রদর্শিত ছবিটির নাম ‘ডাক্তার’।

এই ‘মিত্রা’ সিনেমার পথ চলা স্তব্ধ হল বছর খানেক আগে। ‘মিত্রা’র শেষ কর্ণধার দ্বীপেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র তাঁর স্মৃতি কথায় জানালেন, ‘আমরা থাকতাম মিত্রার পাশের বাড়িতে। রাত্রের খাওয়া দাওয়ার দেরিতেই হতো। নাইট শো যখন ভাঙ্গত আমরা তখন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতাম। তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার হত; মিনার অ্যাকশান ভাঙ্গছে, দর্পনা অ্যাকশান ভাঙ্গছে, এবং দর্পনা তৈরি হতেও আমি দেখেছি আমার ছেলেবেলায়। ঠগাং ঠগাং করে রিবিড করার আওয়াজ হত, রিবিড করে কন্সট্রাকশান হত তখন অয়েল্ডিং বা ঢালাই আসেনি। সেই ভাল মজা হত। আমার ঠাকুরদাদা বাবাকে বলতেন, বাবা থানায় ফোন করতেন, থানার পুলিশ আসতো, খুব চেঁচাত। আবার চলে গেলেই আওয়াজ শুরু হত। এই হত। এবার সেই সিনেমার যখন নাইট শো ভাঙ্গত, শো শেষ হত, নাইট শো, আমি দেখেছি মিনারের লোক, চিত্রা’র লোক, দর্পনার লোক মোটামুটি একসঙ্গে বেরোচ্ছে। তারপর শ্রী উত্তরার কিছু লোক উত্তরে যারা থাকেন তারা এদিকে আসছেন। রূপবানী থেকে লোক আসছেন। একপ্রকার জনসমুদ্র হয়ে যেত রাস্তাটা তখন। আমাদের গাড়ি বারান্দাটাই স্টপেজ ছিল। তখন ডবল ডেকার বাস ছিল। আমরা বলতাম আমরা বাসের ডাকেই ঘুমিয়ে পড়ি বাসের ডাকেই জাগি। সেই বাস ক্যাঁচ আওয়াজ করে এসে বারান্দার নীচে দাঁড়িয়েই যেত, সে এত ভিড় হত যে উপচে পড়ত।

পঞ্চাশ ষাটটা রিকশ দাঁড়িয়ে থাকত, সেই ঠং ঠং ঠং ঠং করে ঘন্টা বাজিয়ে, প্রায় একটা দেখবার মত দৃশ্য। রাত্রিটাই হঠাৎ যেন জেগে উঠত। আমাদের মা বাবা প্রতি শুক্রবার নাইট শোএ সিনেমা দেখতে যেতেন। ওনারা চারজন যেতেন, বাবা, বাবার দুই বন্ধু এবং মা। একজন না যেতে পারলে মা বাড়ি ফিরে বলতেন ওরা নাকি জিজ্ঞেস করেছে যে, ‘আপনারা আজ তিনজন কেন’। নতুন বই রিলিজ হলে ওরা টিকিটও রেখে দিত কারণ ওরা জানত ওনারা আসবেন। আর মা সেই চওড়া পাড় শাড়ি, হাতে এক হাত সোনার চুড়ি, নাকে নাকছাবি, কানে হীরের দুল সেই ঘোমটা দিয়ে, কাঁধে চাবি ঝুলিয়ে যখন রূপবানীর ভিতরে গিয়ে নামতেন তখন আমার খুব আনন্দ হত আমার মা’কে দেখে। রূপবানীর ভিতরে একটা ঐতিহ্য ছিল। ওখানে একটা গ্রান্ড ফাদার ক্লক ছিল, দুটো বড় বড় স্টাচু ছিল, একটা শিব পার্বতিকে কাঁধে নিয়ে আরেকটা আমার ঠিক মনে নেই, আমি ঐগুলো হাঁ করে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখতে থাকতাম। সিনেমা দেখার চল আমাদের ছিল। কারণ মা বাবা আমাদের সিনেমা দেখাতেন। টকিশোহাউসে সমস্ত ইংরেজি সিনেমা চলত। কোনও ইংরেজি সিনেমা এলে বাবা বলতেন এই সিনেমাটা দেখা হয় নি তো কি হয়েছে, আমাদের পাড়ার লাইট হাউসে দেখব, পাড়ার মেট্রোতে দেখব। আমরা বহু সিনেমা দেখেছি টকিশোহাউসে। সেই সময়ে টিকিটের দাম ছিল এক টাকা আশি পয়সা। আমি যখন বসি এখানে তখন আটশো টাকা ক্যাপাসিটি ছিল, তারপর সেটা থাউসেন্ড সিক্সটি হয় পরবর্তি কালে এবং সেটা বহুদিন চলে। একবার হলের এক জায়গায় পাখা খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমি সেই জায়গার টিকিট বেচতে বারণ করেছিলাম, তখন কোনও একটা হিন্দি সিনেমা চলছিল, পাব্লিক বলল ‘ পাঙ্খা নেহি চলেগা তো কেয়া, পিকচার তো চালবে।‘ আমাদের এখানে ভিড় মানে ছিল সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। একবার শালিমার বলে একটা সিনেমা রিলিজ হয়েছিল, তখন সোমবার থেকে লাইন দিয়েছিল লোকেরা, বুধবার থেকে টিকিট দেয়া শুরু হবে। আমি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম হলের এক জায়গায় রক ছিল, সেখানেই তারা শুয়ে বসে ছিল। আমি আমার লোকেদের বলেছিলাম এদের চা বা জল টল চাইলে দিও, বাথ্রুম খুলে দিও, কারণ এরাই আমাদের লক্ষী। আমার যারা কর্মচারী ছিল আমাদের মধ্যে প্রভু ভৃত্য সম্পর্ক ছিল না আমরা সহকর্মী ছিলাম, সহযোদ্ধা ছিলাম।

আমি ছিলাম শুধু ঐ ক্লাসের মনিটর। আমাদের মধ্যে খুনসুটি চলত। আমি কখনও বাণিজ্য করিনি। আমি খুব আনন্দে ব্যাবসা করেছি। পাব্লিকের সুবিধে অসুবিধে সবসময় কেয়ার করেছি।

একবার এক বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে দেখেছিলাম ব্যালকনির সিঁড়ি দিয়ে উঠতে অসুবিধা হচ্ছে। আমি আমার লোকেদের বলে সেই সিঁড়ির পাশে ধরে ওঠার জন্য রেলিং লাগিয়ে দিয়েছিলাম। কারণ দর্শক ছিল আমার লক্ষী সুতরাং তার আতিথেয়টাই আমার মূল মন্ত্র ছিল’; অতীতের স্মৃতিচারণায়  গলার স্বর ভারী হয়ে আসে দ্বীপেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্রের। কালের গভীরে আজ হারিয়ে গেছে সিনেমা পাড়ার ভিড়, ডবল ডেকার বাস, রিকশার ঠুং ঠুং শব্দ, কলকাতার সিনেমাপাড়া আর তার গল্পও। অতীতের সেইসব সিনেমা হলের বেশীর ভাগই আজ বহুজাতিক সংস্থার পণ্যের বাজার। উত্তর কলকাতার সিনেমাপাড়ার সেইসব স্মৃতি বিজড়িত মানুষগুলোর অনেকেই হয়ত আজ নেই; সেই সব স্বর্ণালি দিনের গল্প কোথাও না কোথাও লিপিবদ্ধ হয়ে আছে নাকি চাপা পড়েছে এই আধুনিক কলকাতার বানিজ্যিক আলোতে? যদি থাকে তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব কার?  

Tags: featured

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Home Search Gallery
Menu
© 2026 Desher Samay.