

যে মাঠে একদিন স্বপ্ন ভেঙেছিল, যে মাঠ একদিন ছিল বেদনার, রবি-রাতে সেই মাঠই হয়ে উঠল প্রায়শ্চিত্তের পবিত্র ভূমি। হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন যেন ফিরে এল করতালির শব্দে। বিশালাকায় নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম তিন বছর আগে হৃদয় ভাঙার সাক্ষী ছিল। দেশের স্পন্দন থামিয়ে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া।

একই মাঠ, একই গ্যালারি, একই বাতাস—তবু গল্পটা এবার অন্য। আহমেদাবাদেই সূর্যোদয় হল। নিউজিল্যান্ডকে মাটি ধরিয়ে টানা দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নিল ভারত।
২০২৬-এ এসে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হল। একই সঙ্গে ইতিহাসকেও পরাস্ত করল ভারত। কোনও দেশ এখনও পর্যন্ত তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কোনও দলই বিশ্বকাপ ডিফেন্ড করতে পারেনি। কোনও আয়োজক দেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘরে তুলতে পারেনি। একই সঙ্গে তিনটি রেকর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল সূর্যর ভারত।

আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ানে ইতিহাস লিখল টিম ইন্ডিয়া । ফাইনালে ২৫৫ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও শেষ পর্যন্ত জসপ্রীত বুমরার আগুনে স্পেল ও ভারতের শৃঙ্খলাবদ্ধ বোলিংয়ের সামনে ভেঙে পড়ল নিউজিল্যান্ড। পরপর ইয়র্কারে কিউইদের ব্যাটিং লাইন-আপ ধসিয়ে দিয়ে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেন বুমরাহ। আর তাই হর্ষে আনন্দে আন্দোলিত করে তুলল আহমেদাবাদের স্টেডিয়াম। আরও একবার বিশ্বজয়ের মুকুট পরল টিম ইন্ডিয়া।
ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দেন ব্যাট হাতে সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা। শুরু থেকেই কিউই বোলারদের ওপর ঝড় তোলেন তাঁরা। পাওয়ারপ্লেতেই রেকর্ড ৯২ রান তুলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন দুই ওপেনার। স্যামসনের ৮৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস এবং ঈশান কিশনের দ্রুত অর্ধশতকে ভর করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ২৫৫ রান তোলে ভারত। পরে বল হাতে অক্ষর প্যাটেল, বুমরাহ ও অন্য বোলাররা ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচকে ভারতের নাগালের মধ্যেই রেখে দেন এবং শেষ পর্যন্ত কিউইদের প্রতিরোধ ভেঙে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেন টিম ইন্ডিয়ার হাতে।

শেষ পর্যন্ত সবকিছু থামল ভারতের উৎসবে। নিউজিল্যান্ডকে ৯৬ রানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার টি-২০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। শেষ উইকেটটি তুলে নেন অভিষেক শর্মা, আর লং-অন বাউন্ডারিতে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন তিলক বর্মা। মুহূর্তেই স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় উদ্যাপন। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ জয়ের এই স্মরণীয় রাতে ভারতীয় দল প্রমাণ করে দিল—এই দলটিই হয়তো টি-২০ ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল।

এদিন কিউইদের সামনে লক্ষ্যটা এতটাই বড় হয়ে দাঁড়ায় যে ম্যাচ কার্যত একতরফাই হয়ে যায়। বিশাল রান তাড়া করতে নেমে প্রথম পাঁচ ওভারেই ফিন অ্যালেন, রাচিন রবীন্দ্র এবং গ্লেন ফিলিপসকে হারিয়ে চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। পরে মার্ক চ্যাপম্যানকে ফেরান হার্দিক পান্ডিয়া। টিম সাইফার্ট অবশ্য লড়াই চালিয়ে গিয়ে অর্ধশতরান করেন, কিন্তু তিনি আউট হতেই ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায় কিউইরা। এরপর ধারাবাহিকভাবে উইকেট পড়তে থাকে—ড্যারিল মিচেলও অক্ষর প্যাটেলের শিকার হন। শেষ পর্যন্ত জসপ্রীত বুমরাহ চারটি উইকেট এবং অক্ষর প্যাটেল তিনটি উইকেট তুলে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন।
এর আগে ব্যাট হাতে ভারতীয় ব্যাটাররা যেন ঝড় তুলেছিলেন আহমেদাবাদের আকাশে। অভিষেক শর্মার ২১ বলে ঝোড়ো ৫২ এবং সঞ্জু স্যামসনের দুরন্ত ৮৯ রানের ইনিংসে কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে নিউজিল্যান্ডের বোলিং আক্রমণ। শক্তি আর শৈলীর মিশেলে স্যামসনের ব্যাট থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক বিশাল ছক্কা—লং-অন, স্কয়ার লেগ, সোজা মাঠের উপর দিয়ে উড়ে যায় বল। তাঁর সঙ্গে সমান তালে তাণ্ডব চালান ঈশান কিশন, মাত্র ২৫ বলে ৫৪ রান করে দলের স্কোরকে আরও উঁচুতে তুলে দেন। তিন ব্যাটারের বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে নির্ধারিত ২০ ওভারে ২৫৫ রানের পাহাড় গড়ে ফেলে ভারত।

অভিষেক ও স্যামসনের ৪৩ বলে ৯৮ রানের উদ্বোধনী জুটি ম্যাচের শুরুতেই ভারতের আধিপত্য স্পষ্ট করে দেয়। পরে ঈশান কিশনের সঙ্গে ৪৮ বলে ১০৫ রানের জুটিতে ভারতের রান দুইশো পার হয়ে যায়। যদিও জিমি নিশামের এক ওভারে স্যামসন, কিশন ও সূর্যকুমার যাদব আউট হয়ে খানিকটা ধাক্কা খায় ভারত, ততক্ষণে ম্যাচের রাশ পুরোপুরি ভারতের হাতে চলে এসেছে। শেষদিকে শিবম দুবের ঝোড়ো ক্যামিও ভারতের স্কোরকে ২৫০–এর অনেক ওপরে পৌঁছে দেয় এবং সেই রানই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের মঞ্চ তৈরি করে দেয় ভারতের জন্য।



