‘বই’কে সই করাতে ব্যস্ত বনগাঁর মধুসূদন : দেখুন ভিডিও

0
138
অর্পিতা বনিক , দেশের সময়

বনগাঁ : গল্পের বই নিয়ে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কর্মজীবনে যত বেশি জড়িয়ে পড়েছি আমরা, যত বেড়েছে ব্যস্ততা, ততই বইপড়ার অভ্যাসে ছেদ পড়েছে। আর এই রকম সময়ে বই’কে সই করাতে ব্যস্ত বনগাঁর মধুসূদন শর্মা বাবু ।

উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁর গান্ধীপল্লিতে শর্ম্মা লেদার্স নামে দোকানটিতে প্রায় পনেরো বছর ধরে জুতো, বেল্ট, ব্যাগ ইত্যাদি নানান চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করা হয়। সেই দোকানের মধ্যেই গড়ে উঠেছে আস্ত একটা লাইব্রেরি। দোকানে বসে বই পড়লেই কেনাকাটার উপরে ছাড় পাচ্ছেন ক্রেতারা। এক ঘণ্টা বই পড়লে কেনাকাটায় মেলে কুড়ি শতাংশ ছাড়। আবার ২ ঘন্টা বই পড়লে মিলবে ৪০ শতাংশ ছাড় । এমনকি কেউ যদি পাঁচ ঘণ্টা বই পড়েন, তাহলে মিলবে একশো শতাংশ ছাড় অর্থাৎ তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই কিনতে পারবেন যেকোনও সামগ্রী। এহেন অভিনব উদ্যোগের স্রষ্টা হলেন শর্ম্মা লেদার্সের কর্ণধার মধুসূদন শর্মা।  দেখুন ভিডিও

মধুসূদন বাবুর কথায়,“আমি কিছুই করিনি, আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে। আমার অধিকাংশ ক্রেতা ‘সেলস’-র পেশায় নিযুক্ত… মার্কেটিং পেশায় যাঁরা থাকেন আরকি বিভিন্ন কোম্পানির সেলসম্যান, এমআর। তাঁরাই আমার সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্রেতা। ওঁরা আমার থেকে জুতোই বেশি কেনে। ওঁরা আমার দোকান থেকে জুতো নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট। আর কোথাও যান না। আমার দোকান থেকে জুতো কিনলে এক বছর ‘সার্ভিস’ ফ্রি থাকে। কেনাকাটা ছাড়াও ওঁরা মাঝেমধ্যে আমার দোকানে এসে বসে। গল্প করে। লক্ষ্য করে দেখেছি, মাসের শেষ দিকে পঁচিশ তারিখ বা তারপরে, এই রকম সময়টায় ওনারা আসেন। বসে গল্প করেন। আমিই এক দিন জিজ্ঞাসা করলাম, কী ব্যাপার এমন সময়, প্রত্যেক মাসের শেষের দিকে এমন বসে থাকার কারণ কী? ওঁরা বলল, ‘আর বলবেন না! মাসের শেষ, এ মাসের ‘টার্গেট’ এখনও পূরণ হয়নি। ‘বস’ গালমন্দ করছে। অফিসেও থাকতে পারছি না। বাড়িও যেতে পারছি না। আপনার এখানে এসে একটু বসি।”

এই বসাটাকেই তিনি কাজে লাগিয়েছেন। শুধু বসতে দেন না। একটা বই পড়তেই হবে। মধুসূদনবাবুর বাড়িতে যে বইগুলো ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল, সেগুলো কিছু কিছু এনে দোকানে রাখতে শুরু করেন, পড়তে দেন। বই পড়লে যদি মানসিক শান্তি আসে, হতাশা কাটে। আসুক না। সেই ভাবনা থেকেই দোকানে একটা ছোট্ট লাইব্রেরি করলেন। আরও কিছু বই আনলেন। দেখলেন, সবাই পড়ছে না। মাঝেমধ্যে এক-দুজন পড়ছে। হঠাৎ করেই মাথায় বুদ্ধি এল এর উপরে একটা অফার যদি দেওযাযায় কেমন হয় !তাতে ক্রেতারাও হয়ত আগ্রহী হবে বই পড়তে। তারপর ২০২৪ সালের ১৫ অগাস্ট থেকে শুরু করলেন এমন ভাবনা।

মধুসূদনবাবু জানানন,
“পাঁচ ঘণ্টার অফারের জন্য কত যে বইপ্রেমী-গ্রাহক এসেছেন, সে তুলনার বাইরে। এই অফারটা হঠাৎ করে তখন দিয়ে ফেলেছিলাম। দেখলাম দোকানে বসার জায়গা নেই। এত জন আসছে, বসতে দেব কোথায়! আমারই বসার চেয়ার নেই। তখন ঠিক করলাম পাঁচ ঘণ্টার অফারটা এক মাস থাক। নভেম্বরে ওই অফারটা দিয়েছিলাম। এখন সেই অফারটি আপাতত বন্ধ। আবার কিছুদিন পরে ওই পাঁচ ঘণ্টার অফারটা দেব। এখন এক ঘণ্টার আর দুঘণ্টার অফারটা আছে। এটা বারো মাস থাকবে। বন্ধ করব না। পাঁচ ঘণ্টার অফার বছরে দুবার দেওয়া হবে।”

মধুসূদন বাবুর এই অভিনব ভাবনায় গ্রাহকেরা খুবই খুশি। পাশাপাশি তাঁর সতীর্থ ব্যবসায়ীরাও অত্যন্ত আনন্দিত। প্রতিদিন বইপ্রেমী-ক্রেতারা আসছেন। বই পড়ছেন এবং সেই সুবাদে তাঁরা ছাড়ও পাচ্ছেন। ছাড় পাওয়ার এই তাগিদ নতুন পাঠকের জন্ম দিচ্ছে। মধুসূদনবাবুর দোকানের লাইব্রেরিতে নানাবিধ বই রয়েছে। গীতা, উপনিষদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জীবনী সমগ্র, গল্পগুচ্ছ, শরৎ রচনাবলী ইত্যাদি বই রয়েছে। নিত্যদিন শর্ম্মা লেদার্স-র লাইব্রেরি ঋদ্ধ হচ্ছে। অন্যান্য বিভিন্ন লাইব্রেরি থেকে বই দেওয়া হচ্ছে। স্কুল শিক্ষকেরাও বই দিচ্ছেন। মধুসূদনবাবু নিজেও বই পড়তে ভালোবাসেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রিয় লেখক।

মধুসূদন বাবু বই পড়ার নেশা ধরানোর পাশাপাশি সবুজায়নের চেষ্টাও করছেন । তাঁর দোকানে আসা ক্রেতাদের জন্মদিনে, তিনি গাছ উপহার দেন। অর্থাৎ ক্রেতারা তাঁদের নিজেদের জন্মদিনের দিনে যদি  জুতো, ব্যাগ বা কোনও পণ্য কিনতে শর্ম্মা লেদার্স-এ যান, সংশ্লিষ্ট ক্রেতাকে উপহার হিসাবে গাছ দেওয়া হয়। দোকানে ক্লান্ত, তৃষ্ণার্থ গ্রাহক, পথিকদের জন্য জলপানের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জুতো পালিশ করার ‘সেলফ সার্ভিস’ ব্যবস্থাও। জুতোর কালি, ব্রাশ রাখা থাকে, কেউ ইচ্ছে করলে নিজে নিজের জুতো পালিশ করে নিতে পারেন।

শর্ম্মা লেদার্স ছয় ফুট চার ইঞ্চি -র বিশাল এক জুতো বানিয়ে নজির গড়েছেন আগেই। দোকানের মালিক মধুসূদন শর্মা ও পাঁচ কর্মী মিলে এই জুতো বানিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে হইচই শুরু হয়ে গিয়েছে পুরো এলাকায়।

মানুষ ছুটে চলেছে, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে মুঠোফোন। তাতেই বন্দি হয়ে পড়েছে গোটা পৃথিবী। অভিযোগ ওঠে, মানুষ বই বিমুখ হয়ে পড়েছে। এখন আর কেউ বই পড়ে না। এমন একটা সময়ে বই পড়ানোর জন্য অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন মধুসূদন শর্মা। তাঁর বুদ্ধির জোরেই মানুষ হাতের স্মার্ট ফোনটি সরিয়ে রেখে তুলে নিচ্ছেন বই। খানিকক্ষণের জন্য হলেও তাঁরা ফোন থেকে দূরে থাকছেন। নিমগ্ন হচ্ছে পাঠে। তৈরি হচ্ছে পাঠ্যাভাস। মধুসূদনবাবুর এই বইয়ের নেশা ধরানোর কাজটি সমাজ মাধ্যমেও সাড়া ফেলেছে। নিছক ছাড় পাওয়াই উদ্দেশ্য হোক না কেনো, মানুষ বইকে তো সই বানাচ্ছেন।

Previous articleBrigade Parade Ground: এবার ব্রিগেডে লক্ষ কণ্ঠে হরিনাম কর্মসূচি ঘোষণা   মমতাবালাপন্থী মতুয়াদের
Next articleকলকাতায় মেসি, মধ্য রাতে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপচে পড়া ভিড়, উন্মাদনা ভক্তদের

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here